ভারতে ভয়াবহ করোনা, হাসপাতালে ঠাঁই নেই, অক্সিজেনের চাহিদা বেড়েছে ৪ গুন

লোকসমাজ ডেস্ক॥ ভারতে করোনা ভাইরাস ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত গতিতে ৫০ লাখের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বহু রাজ্যে ও শহরে হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য নাভিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। চাহিদা বেড়ে গেছে চারগুনেরও বেশি। পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, অন্ধ্র প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, তামিলনাড়–, দিল্লি ও কেরালার অবস্থা খুবই খারাপ। এমন খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি ও ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস। এতে বলা হয়, ভারতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৪৯ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
গত ২৪ ঘন্টা বা একদিনে সেখানে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৩ হাজার ৮০৯ জন। মারা গেছেন ১০৫৪ জন। আজ ১৫ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ লাখ ৩০ হাজার ২৩৭। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মতে, এ সময়ে মারা গেছেন ৮০ হাজার ৭৭৬ জন। সারাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা যখন ৫০ লাখ ছুঁই ছুঁই তখন কেন্দ্রীয় সরকার এই বলে আত্মপ্রমাদ গুনছে যে, সেখানে তারা কম সংক্রমণ ধরে রাখতে পেরেছেন। এক্ষেত্রে কেস ফ্যাটালিটির হার শতকরা মাত্র ১.৬৪ ভাগ। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, বিশ্বে এই হার শতকরা ৩.২। সে তুলনায় ভারতে এই হার সর্বনি¤œ। কেন্দ্রীয় সরকার আশা প্রকাশ করেছে যে, তারা কেস ফ্যাটালিটির হার (সিএফআর) শতকরা এক ভাগের নিচে নামিয়ে আনতে চায়। সরকার বলছে, অনেক রাজ্য ও ইউনিয়ন টেরিটোরিতে সিএফআরের হার শতকরা এক ভাগেরও কম। কিন্তু করোনার আক্রান্তের বেশির ভাগই উপরে উল্লিখিত রাজ্যগুলোতে। গত ২৪ ঘন্টায় পশ্চিমবঙ্গে আক্রান্ত হয়েছেন ৪০০৩ জন। কর্নাটকে এই সংখ্যা ৮২৪৪। মধ্যপ্রদেশে একদিনে সর্বোচ্চ ২৩৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মহারাষ্ট্রে এই সংখ্যা ১৭০০৬। কেরালায় ২৫৪০। দিল্লিতে ৩২২৯। উত্তর প্রদেশে ৫২০৮। অন্ধ্র প্রদেশে ৭৯৫৬। তামিলনাড়–তে ৫৬৯৩ এবং গুজরাটে ৩২২৯। অন্যদিকে মুম্বইতে আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার ৯৪৯। ২৪ ঘন্টায় সেখানে আক্রান্ত হয়েছেন নতুন ২২৫৬ জন। আসামে আরো ১৩ জন করোনায় মারা গেছেন। এ নিয়ে সেখানে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮২। আসামের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রী হিমান্ত বিশ্বশর্মা বলেছেন, সেখানে নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৪০৩ জন। সব মিলে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ৪৪ হাজার ১৬৬। এমন অবস্থায় বহু হাসপাতালে স্থান সংকুলান হচ্ছে না রোগীদের। ওড়িশায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে তাদের বেড ও আইসিইউগুলো করোনা চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উত্তরাখন্ড রাজ্য সরকার ১০ হাজার অক্সিজেন সিলিন্ডার চেয়েছে। এগুলো দ্রুতগতিতে কোভিড-১৯ চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে স্থাপন করতে হবে। রাজ্যের স্বাস্থ্য সচিব অমিত নেগি এ তথ্য দিয়েছেন। ওদিকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে এই রোগের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে ক্রমবর্ধমান হারে অর্থ দাবি করা হচ্ছে। এমন অর্থদাবি ৩০০০ কোটি রুপি ছাড়িয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তকর্তারা বলেছেন, ইন্সুরেন্সকারী প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার মানুষের কাছ থেকে তারা ৩৩০০ কোটি রুপির আবেদন পেয়েছেন। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নির্ভর হয়ে পড়েছে অনলাইনভিত্তিক। আপনজন বা আত্মীয়দের কেউ মারা গেলেও তারা সেখানে যেতে পারছেন না। তারা শোক প্রকাশ করছেন অনলাইনে। ইন্দোরের বিজেপি এমপি শঙ্কর লালওয়ানি বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বলেছেন, এই শহরের মানুষের সংগঠিত হওয়ার একটি রেওয়াজ আছে। সুখে বা দুঃখে তারা একত্রিত হন। কিন্তু করোনার কারণে মানুষজন এখন নতুন এক বাস্তবতায়। তারা এমন শোক বা আনন্দে মিলিত হচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
সারা বিশ্বে করোনায় আক্রান্তের দিক দিয়ে ভারত এখন দ্বিতীয়। এ যাবত যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৫ লাখ ৫৩ হাজার ৩০৩। ভারতে এ সংখ্যা ৪৮লাখ ৪৬ হাজার ৪২৭। ব্রাজিলে ৪৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬১০।
বিবিসি বলছে, অক্সিজেনের জন্য ভারতে হাহাকার চলছে। ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী বলে পরিচিত মুম্বইয়ে নিজের ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার যোগার করার জন্য ঘুমহীন রাত কাটিয়েছেন শুক্রবার অঙ্কিত শেঠিয়া। ভিবান্দিতে তার এসএস হাসপাতাল এন্ড রিসার্স সেন্টারে চারটি অক্সিজেন ট্যাংকের মধ্যে মাত্র দুটি ছিল অক্সিজেনে পূর্ণ। তার ৫০ শর্যার হাসপাতালের ৪৪টি সিটেই রয়েছেন করোনা রোগী। তাদের অনেকেরই রয়েছে শ্বাসকষ্ট। তাদের প্রয়োজন অক্সিজেন। অক্সিজেন ভর্তি প্রতিটি ছোট সিলিন্ডার ৯ ঘন্টার বদলে মাত্র ৬ ঘন্টায়ই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এমনটা ঘটছে রোগী বৃদ্ধির ফলে। তার ডিলারদেরও অক্সিজেন সরবরাহ শেষ হয়ে গেছে। রাতভর তিনি ১০ জন ডিলার ও চারটি হাসপাতালে ফোনে যোগাযোগ করেছেন অক্সিজেন সরবরাহের জন্য। কিন্তু কোথাও থেকে কোনো সাহায্য পান নি। অবশেষে রাত ২টার দিকে তিনি আরেকটি হাসপাতাল থেকে বড় ২০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার ম্যানেজ করতে সক্ষম হন। তাও ১৮ মাইল দূর থেকে। সেই অক্সিজেন সিলিন্ডার আনার মতো যানও তখন তার ছিল না। ফলে তার এম্বুলেন্স ছুটে যায় সেখানে। ৫ বার আসা যাওয়া করে ওই সিলিন্ডার সংগ্রহ করেন তিনি। শেঠিয়া বলেন, এখন তার কাছে ১২ ঘন্টা চলার মতো অক্সিজেন আছে। এ কথা বলেছেন তিনি রোববার রাতে। তিনি বলেন, আমরা প্রতিটি দিন লড়াই করছি। লড়াই করছি কোথায় একটু অক্সিজেন পাবো।

ভাগ