করোনা পরীক্ষার জন্য যশোরে দ্রুত ল্যাবস্থাপনসহ লকডাউন ঘোষণার দাবি বিশিষ্টজনদের

0

আকরামুজ্জামান ॥ করোনা ভাইরাস সংক্রমন থেকে যশোরবাসীকে রক্ষা করতে যশোরে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে করোনা পরীক্ষার ল্যাব স্থাপনের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক লকডাউন ঘোষণার পক্ষে মত দিয়েছেন যশোরের রাজনীতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাদের অভিমত করোনা পরীক্ষার সু-ব্যবস্থা ও অসহায় দরিদ্রদের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে এখনই যশোরকে আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউন করতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করলে এ জেলার মানুষকে বড় ধরনের মাশুল দিতে হতে পারে তারা আশঙ্কা করেন।
সচেতন মহল জানান, প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমন ইতিমধ্যে রাজধানীসহ সারাদেশের ২১ টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এরমধ্যে নারায়গঞ্জ জেলায় সংক্রমন ব্যাপক ছড়িয়েছে। কিন্তু যশোরে এখনও কোনো করোনা রোগী সনাক্ত না হওয়ায় অনেকটা স্বস্তিতে রয়েছে এ জেলার মানুষ। যদিও এ জেলায় করোনা রোগী শনাক্তের জন্য কোনো ল্যাব বা পরীক্ষাগার নেই। সে ক্ষেত্রে করোনা রোগী শনাক্তের বিষয় নিয়ে সাধারণ মহলে নানা প্রশ্ন্ রয়েছে। যেকারণে জেলায় দ্রুত একটি করোনা পরীক্ষার জন্য ল্যাব স্থাপনের দাবি এখন জোরালো হচ্ছে। সাথে সাথে করোনা সংক্রমন বিস্তার না ঘটে সেজন্য দ্রুত লকডাউনের ঘোষণার দাবিও উঠছে। যশোরের বেশ কয়েকজন রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বললে তারা জানান, লকডাউনের পাশাপাশি এখন জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে যশোরে করোনা পরীক্ষার জন্য ল্যাব স্থাপনের বিষয়টি। সাথে রয়েছে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি।
এ বিষয়ে যশোর জেলা বিএনপির আহবায়ক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক নার্গিস বেগম বলেন, বৈশিক এ পরিস্থিতিতে আমরা যশোরবাসী অনেকটা অনিশ্চয়তায় রয়েছি। এর বড় কারণ হচ্ছে যশোরে এখনও পর্যন্ত করোনা রোগী পরীক্ষার জন্য কোনো ল্যাব স্থাপন করা হয়নি। যতক্ষন না এখানে করোনা রোগী পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে ততক্ষণ আমরা নিরাপদ আছি এ কথা বলা যাবে না। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে পত্রপত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় খবর এসেছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যাধুনিক ল্যাবে করোনা রোগী শনাক্ত করা সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পর্যন্ত এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। সুতরাং এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে এখানে করোনা রোগী পরীক্ষার ব্যবস্থা করলে শুধু যশোর নয়, আশপাশের ১০ জেলার মানুষ সুফল পাবে বলে আমি মনে করি। আশা করছি সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিবে।
লকডাউন প্রসঙ্গে অধ্যাপক নার্গিস বেগম বলেন, যশোর জেলা প্রশাসনের সাথে দেখা করে এ বিষয়ে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দিয়েছি। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু বিধিনিষেধও জারি করা হয়েছে। তবে সেটি কতটা কার্যকর বা বাস্তবায়ন হচ্ছে সেটি দেখার বিষয়। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্ব হয়ে দেখা দিয়েছে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা। এজন্য সমাজের অসহায় দরিদ্রদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে লকডাউন কঠোর করা উচিৎ। বিশেষ করে বাইরের দেশ ও জেলা থেকে কোনো মানুষ যাতে যশোরে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য বিশেষ নজরদারি বাড়াতে হবে। একই ধরনের মতামত তুলে ধরেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্সপার্টি (মার্কসবাদী) সভাপতি কমরেড ইকবাল কবীর জাহিদ। তিনি বলেন, যশোরে করোনা রোগী নেই এটা কতটা বাস্তব তা ভাবার বিষয়। যেহেতু এ জেলায় এখনো কোনো পরীক্ষাগার নেই সেজন্য করোনা রোগী শনাক্তের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তার জন্য প্রশাসন যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা মাঠ পর্যায়ে কার্যকর হচ্ছে না। মানুষ যে যার মতো বের হচ্ছে। এজন্য যশোরকে নিরাপদ রাখতে লকডাউনের প্রয়োজন রয়েছে। তবে লকডাউন দেওয়ার আগে অসহায় দরিদ্রদের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবতে হবে সরকারকে। এ বিষয়ে আমাদের সংগঠনসহ যশোরের বামপন্থীদলগুলো সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কথা হয় যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ মিজানুর রহমান খানের সাথে। তিনি বলেন, করোনা সংক্রমন প্রতিরোধে আমরা শতভাগ সফল একথা বলার এখনও সময় আসেনি। যেহেতু জেলায় এখনও কোনো করোনা পরীক্ষার ল্যাব স্থাপন করা হয়নি। এ জেলায় দেশের বৃহত্তম স্থল বন্দর রয়েছে। প্রতিদিন বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত ফেরত মানুষ যশোরে ঢুকছেন। সেকারণে আমরা ঝুঁকিতে নেই একথা বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, যশোরে এ সংক্রমন প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়া উচিৎ। পাশাপাশি এ পরিস্থিতিতে যেসকল ব্যবসায়ীরা তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে ঘরে বসে আছেন তাদের পূনর্বাসনে সরকারি সহযোগিতার ব্যাপারে সু-স্পষ্ট ঘোষণা আসা উচিৎ। লকডাউন প্রশ্নে কথা হয় যশোরের জেলা প্রশাসকের সাথে। তিনি বলেন, করোনা সংক্রমন প্রতিরোধে সরকার ঘোষিত বিধি নিষেধের যা যা রয়েেেছ তা সবই যশোরে পালন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে আমরা নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহন ছাড়া সকল যানবাহন বন্ধ করে দিয়েছি। ওষুদের দোকান বাদে শুধুমাত্র কাঁচা বাজার, মুদি দোকান সীমিত আকারে খোলা রাখার নির্দেশনা দিয়েছি। জেলায় বাইরের লোকজনের প্রবেশ ও সন্ধ্যা ৬ টার পর মানুষ যাতে ঘর থেকে বাইরে বের হতে না পারেন সে ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ফলে লকডাউনের আর কোনো কিছু বাকি থাকেনি এ জেলায়। তারপরও মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগাতে প্রয়োজনে যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলে তিনি জানান।
যশোর পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু বলেন, যশোরে আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউন ঘোষণা না করা হলেও লকডাউনে যা যা করা হয় তা বিদ্যমান রয়েছে। গত বুধবার থেকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যশোরে বাইরের লোকজন প্রবেশ করলে অবহিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন যেখানে মানুষ জড়ো হতে দেখছেন সেখানেই তড়িৎ ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তিনি বলেন, মানুষকে বাঁচানোর স্বার্থে লকডাউন কেনো যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। সেটি সময় মতো সবাই জানতে পারবেন। তিনি বলেন, যশোর পৌরসভার উদ্যোগে অসহায় দরিদ্রদের খাদ্য নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে যশোর জেলা সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহিনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, করোনা রোগী পরীক্ষার জন্য যশোরে ল্যাব স্থাপনের বিষয়ে আমরাও গুরুত্ব দিয়ে আসছি। ইতিপূর্বে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবটি পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগ্রহ দেখালে আমরা সেখানে সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। তিনি বলেন, আমাদের কাছে এ পর্যন্ত যে সকল রোগী আসছেন, বিশেষ করে যাদের করোনা সংক্রমনের লক্ষন পাওয়া গেছে তাদের নমুনা নিয়ে ঢাকায় পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছি। পরীক্ষার ফলাফলে ইনশাআল্লাহ এখনো পর্যন্ত কারোর শরীরে করোনা শনাক্ত হয়নি। ফলে আমরা অনেকটা স্বস্তিতে রয়েছি।