বাগেরহাট প্রতিনিধি ॥ সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে পরিবেশ সংকটাপণ্য (ইসিএ) এলাকার মধ্যে অবৈধভাবে স্থাপন করা পাঁচটি করাতকল সিলগালা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩১ ডিসেম্বর) সকালে শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সরদার মোস্তফা শাহিন এ অভিযান পরিচালনা করেন। সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. জয়নাল আবেদীন এ তথ্য জানান।
বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা প্রশাসন এবং সুন্দরবন বিভাগ যৌথভাবে এ অভিযান চালিয়ে করাতকলের পাঁচটি করাত এবং বিভিন্ন প্রকার মালামাল জব্দ করে সিলগালা করে দেয়। বন্ধ করে দেওয়া করাতকল মালিকরা হচ্ছেন– শরণখোলার বকুলতলা গ্রামের মো. শামসুল হক মাস্টার, মো. নুরুল হক আড়তদার, মো. গনি হাওলাদার এবং তাফালবাড়ি বাজারের মো. আলাউল ইসলাম সেলিম ও মো. ফারুক হোসেন। তাদের নামে মামলা দায়ের করা হবে বলে সুন্দরবন বিভাগ জানায়। এসিএফ জানান, ইসিএ এলাকার মধ্যে মিল ও কলকারখানা স্থাপনে বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু কতিপয় অসাধু ব্যক্তি বেআইনিভাবে সুন্দরবন সংলগ্ন বকুলতলা ও তাফালবাড়ি বাজার এলাকায় করাতকল স্থাপন করে গাছ চেরাই করে আসছিল। উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় যৌথ অভিযান চালিয়ে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে ২০১২ সালের করাতকল আইনে মামলা দায়ের করা হবে। ইউএনও বলেন, ‘সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সব করাতকল পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়া হবে।’
সুন্দরবনের পরিবেশ সংকটাপণ্য এলাকার ৫ করাতকল সিলগালা
অর্থনীতির দুর্বল সূচকে শুরু হচ্ছে নতুন বছর
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ অর্থনীতির ভালো সূচকগুলো ধিরে ধিরে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ছাড়া অর্থনীতির অন্তত ১৩টি সূচক এখন নিম্নমুখী। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ কারণে অধিকাংশ দুর্বল সূচক দিয়েই নতুন বছর শুরু হচ্ছে। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থনীতির প্রাণসঞ্চার করা সূচকগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান সূচকগুলো রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি এত নাজুক, যে সরকারি একটি ব্যাংক তার কর্মকর্তাদের বেতন দিতে পারছে না। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বেসরকারি খাতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, রাজস্ব আয় কমেছে, কমেছে রফতানি আয়ও, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমেছে। এছাড়া ভেঙে পড়ার অবস্থায় রয়েছে আমদানি বাণিজ্য, কমে গেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি, বেহাল দশায় পড়েছে পুঁজিবাজার, ঋণ পাচ্ছে না বেসরকারি খাত। চাপে পড়েছে ব্যাংক খাত, বন্ধ হচ্ছে গার্মেন্টস, সংকুচিত হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। মানুষের আয় না বাড়লেও মূল্যস্ফীতি তথা জিনিসপত্রের মূল্য বেড়েছে। বেড়েছে সরকারের ব্যাংক ঋণ, বেড়ে গেছে ব্যাংক ঋণের সুদ হার, বেড়েছে খেলাপি ঋণের পরিমাণও। বাড়ছে ঋণ পুনঃতফসিলের ঘটনা। এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন চাপের মধ্যে পড়েছে। অর্থনীতির অধিকাংশ সূচকই এখন দুর্বল। এই দুর্বল সূচক দিয়েই শুরু হচ্ছে নতুন বছর। তিনি উল্লেখ করেন, সত্যিই সংকটের মুখে পড়েছে আমাদের অর্থনীতি। অর্থনীতির স্বাস্থ্য এখন খুবই দুর্বল। দিন যত যাচ্ছে, দুর্বলতা ততই বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চাপে ব্যাংক খাত:
অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে ব্যাংক খাত এখন বেশ চাপে রয়েছে। ভালো ব্যাংকগুলোর অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হচ্ছে। গতিশীল ব্যাংক, খেলাপির কবলে পড়ে গতি হারাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের ঝুঁকিতে পড়েছে ৪০টি ব্যাংক। কোনও কোনও ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪০ থেকে ৮৫ শতাংশ। ব্যাংক খাত কতটা খারাপ হয়েছে, তার প্রমাণ মেলে সরকারি বেসিক ব্যাংকের দিকে তাকালে। ২০০৯ সালের আগে সরকারি খাতে ‘মডেল ব্যাংক’ মনে করা হতো এই ব্যাংকটিকে। তখন প্রতিবছর মুনাফা বেশি করায় ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনও ছিল অন্য ব্যাংকের চেয়ে বেশি। কিন্তু এখন ভয়ানক পরিস্থিতি বিরাজ করছে ব্যাংকটিতে। পরিস্থিতি এত নাজুক, যে ব্যাংকটি তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছে না। এ অবস্থায় ব্যাংকটির সব কর্মকর্তার বেতন কমিয়ে গত ২২ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি জারি করা হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, বিগত সাত বছর লোকসান হওয়ায় আগের মতো বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, শুধু বেসিক ব্যাংকই নয়, এখন সব ব্যাংকের অবস্থা প্রায় একই রকম। তবে বেসিক ব্যাংকের নাজুক অবস্থার জন্য তিনি তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, বেসিক ব্যাংকে এক সময় সুশাসন ছিল। কিন্তু শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকটাকে নষ্ট করা হয়েছে।
বেহাল দশায় পুঁজিবাজার:
ব্যাংক খাতের চেয়ে পুঁজিবাজারের অবস্থা আরও করুণ। ২০১০ সালের ধসের পর নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাজার স্বাভাবিক হচ্ছে না। গত কয়েক মাস ধরে দেশের পুঁজিবাজারে ক্রমাগতভাবে দরপতন চলছে। পতনের কারণে ক্রেতা হারিয়েছে এই বাজার। আর ক্রেতা না থাকায় লেনদেন তলানিতে নেমে এসেছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির এক চতুর্থাংশের দাম অভিহিত মূল্যের (ফেইস ভ্যালু, ১ টাকা) নিচে নেমে এসেছে। বেশ কিছু কোম্পানির দর ৫ টাকার কম।
ঋণ পাচ্ছে না বেসরকারি খাত:
গত কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের হার কমছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণের হার কমেছে প্রায় দশমিক ৬২ শতাংশ। অক্টোবরে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল ব্যাংক ঋণের হার। এই হার গত দশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাস ধরে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। চলতি অর্থবছরের অক্টোবরে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। যা আগের মাস, সেপ্টেম্বরে ছিল ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আগস্টে ছিল ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
বেড়ে গেছে ব্যাংক ঋণের সুদ হার:
উৎপাদন খাতে ৯ শতাংশ সুদ বেঁধে দেওয়া হলেও ঋণের ওপর সুদের হার বেড়েই চলেছে। অনেক ব্যাংক আবার ঘোষণা দিয়েই ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ হারে সুদ আরোপ করছে। ঋণ ও আমানতের গড় সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশনা থাকলেও সেটিও মানছে না ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে অধিকাংশই এখনও দুই অঙ্কের সুদ নিচ্ছে। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সভায় উৎপাদনশীল খাতের ব্যাংক ঋণে এক অঙ্কের সুদ হার অনুমোদন করা হয়েছে। এই সুবিধা পাবে শিল্পখাতের মেয়াদি এবং তলবি ঋণের গ্রাহকরা। দেশের সার্বিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ২৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পর্ষদ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বেড়ে গেছে খেলাপি ঋণ:
বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ। তবে, ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণ আরও অনেক বেশি। কারণ, অনেক ব্যাংক বড় অঙ্কের ঋণ আদায় করতে পারছে না। আবার ওই ঋণগুলোকে খেলাপি হিসেবেও চিহ্নিত করছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত ৯ মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২২ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা (অবলোপন ছাড়া)।
বাড়ছে ঋণ পুনঃতফসিলের ঘটনা:
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বাড়লেও আদায় বাড়ছে না। এ কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ পুনঃতফসিল নীতি গ্রহণ করেছে। এতে কাগজে খেলাপির পরিমাণ কম দেখালেও ব্যাংক খাতে ধীরে ধীরে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে। বছর শেষে তা ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও ২০১৮ সালের পুরো বছরে ২৩ হাজার ২১০ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত হয়েছিল, ২০১৭ সালে যা ছিল ১৯ হাজার ১২০ কোটি টাকা। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এখন প্রতিদিন বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শত শত ফাইল ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য পাঠানো হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা নিজে গিয়ে তদবির করছেন, আবার ওপর মহল থেকেও তদবির করাচ্ছেন। যার তদবির যত শক্তিশালী হচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ তাকে সেভাবেই সুবিধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নীতিমালার বাইরে এসব ঋণ পুনঃতফসিলের দায় কোনও কর্মকর্তা নিতে চাইছেন না, ফলে প্রতিটি ফাইলে গভর্নরের অনুমোদন লাগছে। এর ফলে ব্যাংকিং নীতি বিভাগটি হয়ে পড়েছে পুরোপুরি ঋণ পুনঃতফসিল বিভাগ। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন হয়ে উঠেছে ঋণ পুনঃতফসিল কেন্দ্র।
কমেছে রফতানি আয়:
টানা চার মাস ধরে রফতানি আয় কমেছে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে রফতানি আয় ইতিবাচক হলেও সর্বশেষ মাস নভেম্বরে রফতানি আয় কমেছে ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ। গত বছরের নভেম্বরে রফতানি আয় হয়েছিল ৩৪২ কোটি ১৯ লাখ ডলার। এই বছরের নভেম্বরে রফতানি আয় হয়েছে ৩০৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রথম পাঁচ মাসে রফতানি আয় হয়েছে এক হাজার ৫৭৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ কম।
আগামী দিনগুলোতেও একই পরিস্থিতি থাকতে পারে এমন আশঙ্কা করছেন খোদ বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি রুবানা হক। তিনি পরিস্থিতিকে খুবই খারাপ উল্লেখ করে বলেন, দিন যত যাচ্ছে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। রফতানি খাতে সরকারের পলিসি সাপোর্ট জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
বন্ধ হচ্ছে গার্মেন্টস:
গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা বলছেন, তৈরি পোশাক খাতে চলমান সংকট রফতানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিজিএমএর তথ্যমতে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে আর্থিক সমস্যার কারণে বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ৬০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন ২৯ হাজার ৫৯৪ জন শ্রমিক। এদিকে ইপিবির তথ্য বলছে, গত পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) তৈরি পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে এক হাজার ৩০৮ কোটি ৮৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ কম। এই সময়ে প্রবৃদ্ধি কমেছে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক বলেন, আমাদের সব অর্ডার ভিয়েতনাম-ভারতে চলে যাচ্ছে। এ কারণে এই মুহূর্তে গার্মেন্টস সেক্টরের প্রতি সরকারের নেক নজর জরুরি। এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণে ২৫ শতাংশ স্থানীয় মূল্যসংযোজনের ওপর ডলারপ্রতি পাঁচ টাকা অতিরিক্ত বিনিময় হার আমরা চাই।
রাজস্ব আয় কমেছে:
অর্থনীতির সূচকগুলোর মধ্যে সরকারের আর্থিক জোগানদাতা রাজস্ব খাত অনেকটা স্থবির। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্ট থেকে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি কমছে। ওই মাসে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে নেগেটিভ। শুধু তাই নয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, জুলাই থেকে অক্টোবরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আয়ের প্রধান তিন খাতেই আদায় কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গত আগস্টে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাইনাস ৫ দশমিক ০৮ শতাংশ। ২০১৮ সালের আগস্টে রাজস্ব আয় হয়েছিল ১৪ হাজার ৯৪৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ২০১৯ সালের আগস্টে রাজস্ব আয় হয়েছে ১৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত বছরের আগস্টের চেয়ে এই বছরের আগস্টে রাজস্ব আয় কমেছে ৭৫৮ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আয় হয়েছে ১৭ হাজার ৭৮৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। পরের মাস অক্টোবরে আয় হয়েছে ১৭ হাজার ৬৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের চেয়ে অক্টোবরে রাজস্ব আয় কমেছে প্রায় ১০৯ কোটি টাকা।
কমেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ:
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০১৭ সালে ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। এই বছরের জুনেও ৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে। কিন্তু এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ব্যয় মেটাতে গিয়ে রিজার্ভ বৃদ্ধির গতি থেমে গেছে।
ভেঙে পড়ার অবস্থায় আমদানি বাণিজ্য:
বেশ কিছুদিন ধরে আমদানিতে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত বছরের অক্টোবরের চেয়ে এই বছরের অক্টোবরে আমদানি বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি কমেছে ৪ শতাংশ। আর চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় কমেছে ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ । এর অর্থ হল, দেশের মানুষের ভোগ ব্যয় কমেছে এবং নতুন শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, এই চার মাসে শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। জ্বালানি তেল আমদানি কমেছে ১৫ শতাংশ। আর শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।
কমে গেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি:
গত অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ১৭ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৫২১ কোটি টাকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমতে কমতে চলতি বছরের অক্টোবরে মাত্র ৮২২ কোটি টাকায় ঠেকেছে। একক মাস হিসেবে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির এই হিসাব সবচেয়ে কম। অথচ আগের বছরের (২০১৮) একই মাসে যা ছিল ৪ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে এই ধারাবাহিক ভাটায় অর্থনীতিতে স্থবিরতার আশঙ্কা করেছেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, ‘সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠিন নিয়ম-কানুন জারি করা হয়েছে। এতে যারা সঞ্চয় করার সুযোগ পেতো, তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার সঞ্চয়পত্রে কড়াকড়ির ফলে ব্যাংক খাতেও উন্নতি হচ্ছে না। অবশ্য সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার কথা ২৭ হাজার কোটি টাকা।
ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি:
গত এক বছরে বেড়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২৬০ থেকে ২৭০ টাকায়। অথচ ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। এই হিসাবে গত এক বছরে পেঁয়াজের মূল্য বেড়েছে পাঁচশ ভাগের বেশি। এদিকে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি) নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৬ দশমিক ০৬ শতাংশ। যদিও চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে বেঁধে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। অক্টোবরের ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ থেকে নভেম্বরে মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধির প্রধান কারণ পেঁয়াজ। নভেম্বরে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ। গত বছরের একই মাসে যা ছিল ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ।
বেড়েছে সরকারের ব্যাংক ঋণ:
২০১৯-২০ অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ৪৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা ঋণ নেবে বলে ঠিক করেছে। কিন্তু ছয় মাস না যেতেই সরকার ৪৪ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা ধার হিসেবে নিয়েছে। সাধারণত অর্থবছরের শেষ দিকে সরকারের টাকার টান পড়ে বেশি। কিন্তু এবার অর্থবছরের শুরুতেই টাকার টান পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, বেসরকারি ব্যাংক থেকে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা যে পরিমাণ ঋণ পাচ্ছে, সরকার ঋণ পাচ্ছে তার চেয়েও বেশি। গত ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের কাছে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরকারের কাছে পাবে এক লাখ ১০ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক পাবে ৪১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা।
ইতিবাচক ধারায় রেমিটেন্স প্রবাহ:
অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত গতিশীল রয়েছে রেমিটেন্স প্রবাহ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীরা তাদের উপার্জিত টাকা দেশে পাঠিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছেন। চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রেমিটেন্স এসেছে ৭৭১ কোটি (৭.৭১ বিলিয়ন) ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২২ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি। এই ধারা অব্যাহত থাকলেও অন্য সূচকগুলো নিম্নমুখী হওয়ায় অর্থনীতির জন্য সামনে খারাপ সময় অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকায় আসছেন ম্যারাডোনা
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা প্রথমবারের মতো ঢাকায় আসছেন। আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি কবে আসবেন, সেটা এখনো নির্ধারণ হয়নি। তবে তিনি যে আসছেন, সেটা নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ। তিনি মঙ্গলবার বলেছেন, ‘ম্যারাডোনা আসছে, সেটা নিশ্চিত। কবে আসছে, সেটা আমরা পরে জানাব।’
তার আগে এদিন বাফুফের সভাপতি কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বাংলাদেশে আসছেন ম্যারাডোনা’। ম্যারাডোনা আসার উপলক্ষ্যটা আর কিছু নয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন। এই উপলক্ষকে সামনে রেখেই আর্জেন্টিনার ১৯৮৬ বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তিকে আনা হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সবগুলো ফেডারেশনই বিশেষ কিছু আয়োজনের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বঙ্গবন্ধুর নামে বিপিএল করছে। সামনে এশিয়া একাদশ ও বিশ্ব একাদশের মধ্যে দুটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ আয়োজন করবে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ করবে। পাশাপাশি ম্যারাডোনাকে আনবে। এছাড়া বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন, বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশনসহ অন্য ফেডারেশনগুলো বিশেষ কিছু আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
বেলের হেয়ার স্টাইল নকল করেছেন রোনালদো!
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ আর কয়েক ঘণ্টা পরই বিদায় নেবে ২০১৯ সাল। শুরু হবে নতুন বছর। নতুন বছরের আগে নিজের হেয়ার স্টাইল বদলে ফেলেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। শীতকালীন ছুটি শেষে অনুশীলনে ফিরেছেন জুভেন্টাসের খেলোয়াড়রা। সোমবার সেখানেই নতুন হেয়ার স্টাইলে দেখা গেছে জুভেন্টাসের পর্তুগিজ তারকা রোনালদোকে। তার মাথার ওপরের দিকে চুল ঝুঁটি করা। যেমনটা দেখা যায় তার সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থ গ্যারেথ বেলকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে তাই মজা করতেও ছাড়েননি। রোনালদো বেলের হেয়ার স্টাইল নকল করেছেন বলেও মন্তব্য করেছেন কেউ।
টুইটারে রোনালদোর ছবি পোস্ট করে একজন লিখেছেন, ‘রোনালদোকে দেখতে গ্যারেথ বলের মতো লাগছে।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘রোনালদো গ্যারেথ বেলের স্টাইল নকল করেছেন।’ একজন আবার রোনালদো ও নাপিতের (নরসুন্দর) কল্পিত কথোপকথন তুলে ধরেছেন ঠিক এভাবে-
‘নাপিত: তুমি কী চাও?
রোনালদো: আমি বেলকে মিস করছি এবং ইব্রা (জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ) মিলানে ফিরেছে।
নাপিত: আর কিছু বলতে হবে না।’
ছুটিতে গত বেশ কয়েকদিন দুবাইয়ে ছিলেন রোনালদো। সেখানে গত রোববার তিনি জিতেছেন বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার ‘গ্লোব সকার অ্যাওয়ার্ড’। দুবাই থেকে ফিরে জুভেন্টাসের অনুশীলনে যোগ দেন পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড।
২০২২ পর্যন্ত রিয়ালে বেনজেমা
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে এক বছরের নতুন চুক্তি করতে রাজি হয়েছেন করিম বেনজেমা। এই চুক্তির ফলে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে থাকবেন ফরাসি স্ট্রাইকার। রিয়ালের সঙ্গে বেনজেমার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। নতুন চুক্তির ফলে সেটি আরও এক বছর বাড়ছে। বেনজেমা রিয়ালে যোগ দিয়েছিলেন ২০০৯ সালে। স্প্যানিশ ক্লাবটি থেকেই অবসর নেওয়ার ইচ্ছার কথা একাধিকবার জানিয়েছেন ৩২ বছর বয়সি স্ট্রাইকার। এই মৌসুমে এখন পর্যন্ত ২৩ ম্যাচে তিনি করেছেন ১৬ গোল। রিয়ালের হয়ে তার ১১ মৌসুমে মাত্র তিনবার তিনি ২০ বা এর বেশি গোল করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এখনও আশা-নিরাশায় লিভারপুল ভক্তরা!
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ প্রিমিয়ার লিগ শিরোপার জন্য লিভারপুলের অপেক্ষার প্রহর শেষ হবে এবার? বছরের শেষ দিনে প্রশ্নটা ওঠার কারণ, অলরেডদের অতীতের বিস্ময়কর ব্যর্থতা। বড় ব্যবধানে শীর্ষে থাকলেও কোনও কোনও লিভারপুল ভক্ত জোর গলায় বলতে পারছেন না, ‘আমরাই এবার লিগ জিততে যাচ্ছি’। ১৯ ম্যাচ খেলে লিভারপুলের ৫৫ পয়েন্ট। এক ম্যাচ বেশি খেললেও লেস্টার সিটি (৪২) ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার সিটি (৪১) অনেকটাই পিছিয়ে। ইপিএলে প্রথম শিরোপার সম্ভাবনা তাই উজ্জ্বল লিভারপুলের।
গত রবিবার উলভারহ্যাম্পটনকে ১-০ গোলে হারিয়েছে ইয়ুর্গেন ক্লপের দল। ম্যাচশেষে সাবেক লেস্টার মিডফিল্ডার রবি স্যাভেজ ঘোষণার সুরে বলেছেন, ‘লড়াই শেষ, লিভারপুল শিরোপা জিতেছে।’ সাবেক অলরেড ডিফেন্ডার মার্ক লরেনসন তার সঙ্গে একমত, ‘এমন অবস্থান থেকে তারা লিগ শিরোপা হারাবে না।’ স্যাভেজ-লরেনসন নিশ্চিত হলেও অনেক ভক্তই স্বস্তিতে থাকতে পারছেন না। আসলে অন্ধকার অতীত তাদের স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। ২০১৩-১৪ মৌসুমে চেলসির বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর আগে লিভারপুলের সমর্থকরা গাইছিল, ‘আমরা লিগ জিততে যাচ্ছি।’ কিন্তু স্টিভেন জেরার্ডের মারাত্মক ভুলের মাশুল দিয়ে হেরে যায় অলরেডরা, হাতছাড়া হয়ে যায় শিরোপাও।
গত মৌসুমে মাত্র এক পয়েন্টের জন্য পেপ গার্দিওলার ম্যানসিটির পেছনে থেকে রানার্সআপ হয়েছিল তারা। পুরো লিগে মাত্র একটি ম্যাচ হেরেছিল, এক সময় এগিয়ে ছিল ৭ পয়েন্টের ব্যবধানে। কিন্তু শিরোপা ধরা দেয়নি। একটি তথ্য ভয় ধরিয়ে দিতে পারে লিভারপুল ভক্তদের মনে। গত ১১ মৌসুমের আটটি বড়দিনে শীর্ষে থাকা দলই শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। কিন্তু একটি দলের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হয়েছে। তাও একবার নয়, তিনবার। আর সেই দলটি লিভারপুল!
অবশ্য নতুন প্রজন্মের ভক্তরা দারুণ আশাবাদী। ভার্জিল ফন ডাইকের নেতৃত্বে দুরন্ত রক্ষণভাগ তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। ডাগআউটে প্রাণবন্ত ইয়ুর্গেন ক্লপের উপস্থিতি সমর্থকদের আরেকটি ভরসার জায়গা। লিভারপুল অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসন এ বছর তিনটি ট্রফি হাতে নিয়েছেন। ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ইউরোপিয়ান সুপার কাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপ জিতেছে তারা। প্রিমিয়ার লিগ শুরু হওয়ার তিন বছর আগে সর্বশেষ লিগ (তখন নাম ছিল প্রথম বিভাগ) জিতেছিল লিভারপুল। ২৭ বছরের রিসের তখন জন্মও হয়নি। এবার তিনি ভীষণ আশাবাদী, ‘আমার জীবনে দলকে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জিততে দেখিনি। আমার এই অভিজ্ঞতাই হয়নি। (শিরোপা জয়ের) দিনটির জন্য আর অপেক্ষা করতে পারছি না। আশা করি এটাই সেই বছর। কেউ কেউ হয়তো নৈরাশবাদী। তবে আমি মনে করি, আমাদের দলটাই সেরা। আর এটা আমি জোর গলায় বলছি।’
৮ বছরের ছোট্ট ড্যানিয়েলের দৃঢ় বিশ্বাস, তার প্রিয় দলের ধারেকাছে কেউ নেই, ‘শিরোপা তো আমাদেরই পকেটে। ম্যানসিটি অনেক ম্যাচ হেরেছে, আর আমরা লেস্টারকে দুবার হারিয়েছি। শিরোপার দৌড়ে আমাদের ধারে-কাছে কেউ নেই।’ এমন ভক্তদেরই পাশে চাইছেন লিভারপুলের সাফল্যের নেপথ্য নায়ক ক্লপ, ‘ভক্তরা ঠিক আমাদের দলটির মতো। তারা এখনই শিরোপা উদযাপন করতে চায় না। আমরা এখন দারুণ ঐক্যবদ্ধ। তবে শিরোপা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে একথা বলার সময় আসেনি। এখনও কিছুই হয়নি।’ কোচের হুঁশিয়ারি মেনে নিতে চাইবেন অনেক ভক্তই। এখন শুধু একটাই প্রার্থনা লিভারপুলের, বড়দিনে শীর্ষে থাকা যেন সার্থক হয়।
ফিরে দেখা কাশ্মীর ২০১৯
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে বছরজুড়েই উত্তপ্ত ছিল দক্ষিণ এশিয়ার চির বৈরী দুই প্রতিবেশী ভারত-পাকিস্তান। ১৪ ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামায় স্থানীয় এক যুবক ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর ওপর বোমা হামলা চালায়। এতে ৪০ জওয়ান নিহত হন। প্রতিশোধে মরিয়া হয়ে ওঠে ভারত। দেশটির হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ৫ আগস্ট জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা তুলে নেয়া হয়। সেখানে পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয় বিপুল সংখ্যক সেনা সদস্য।
স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতায় ২০১৯ সালে ৮০ জন বেসামরিক কাশ্মীরি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৯ জনই নিহত হন ৫ আগস্টের পরবর্তী ঘটনায়। এদিকে ভারতীয় সরকার চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছে আগস্ট মাসের পর কাশ্মীরে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে জম্মু-কাশ্মীর কোয়ালিশন অফ সিভিল সোসাইটির (জেকেসিসিএস) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগস্টের পর ৬৯ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩ জনই বেসামরিক।
এছাড়া নিহতদের মধ্যে ২০জন বিদ্রোহী ও ১৬ জন নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মী রয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু অক্টোবরে ১৭ বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরে জেকেসিসিএসের প্রকাশিত মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বার্ষিক পর্যালোচনাতে উল্লেখ করা হয়েছে এ বছরে ৮০ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১২ জন নারীও রয়েছেন। এছাড়া বছরটিতে ১৫৯ জন বিদ্রোহী নিহত হওয়ার পাশাপাশি ১২৯ জন ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মীও মারা গিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক ১৯ জন নিহত হয়েছেন, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে গোলাগুলিতে ১৭ জন ও অজ্ঞাত বন্দুকধারীর গুলিতে ২৮জন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন সংঘর্ষে ৮টি শিশুর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া বিচারবহির্ভূত আটক, নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে শিশুরা। এতে আরও বলা হয়েছে, শিশুরা সামরিক বাহিনীর হাতে আটক ও প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে। ২০১৯ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে ৮৭টি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। আগস্টে বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্য তথ্য কমিশন, জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্য মানবাধিকার কমিশন এবং ভোক্তা কমিশনের মতো রাষ্ট্র পরিচালিত বিভিন্ন নজরদারিও বাতিল করা হয়েছে। এ বছরটিতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদকর্মীরা লাঞ্ছিত ও প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন।
সূত্র: ইয়েনি শাফাক।
ভারতীয় শিক্ষার্থীদের বের করে দিল কানাডা
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ কানাডার অন্যতম শহর টরন্টো থেকে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় শিক্ষার্থী বের করে দেয়া হয়েছে। এসব শিক্ষার্থীর প্রায় সবাই ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের বাসিন্দা। গত রোববার টরন্টো পিয়ারসন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে (ওয়াই ওয়াই জেড বিমানবন্দর) এ ঘটনা ঘটে। ভারত থেকে আসা এসব শিক্ষার্থীদের কানাডায় আর ফিরতেই দেয়নি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে ইতিমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশকিছু ছবি প্রকাশ হয়েছে। যেখানে দেখা গেছে, এক ঝাঁক শিক্ষার্থী বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বিক্ষিপ্ত ও ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে নিজেদের ব্যাগ ও লাগেজের ওপর বসে আছে। তাদের অধিকাংশের পরনে পাঞ্জাবীয় সংস্কৃতির পোশাক ও পাগড়ি।
এদিকে স্থানীয় গণমাধ্যমকে টরন্টো বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নকল আইইএলটিএস (IELTS) সার্টিফিকেট নিয়ে আসায়া এসব ভারতীয় শিক্ষার্থীদের টরন্টোতে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। এসব শিক্ষার্থীরা এজেন্সির মাধ্যমে আইইএলটিএস জালিয়াতি করে টরন্টোর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিল। পরে তদন্তের মাধম্যে আইইএলটিএসের এই ভূয়া সার্টিফিকেট ধরা পরে। গত কয়েক বছর ধরে ভারত তথা বিশেষকরে দেশটির পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে অগণিত শিক্ষার্থীরা কানাডায় আসছে। তাদের অনেকেরই ভিসা, আইইএলটিএস সার্টিফিকেট বা অন্যান্য কাগজপত্রে নানা জটিলতা দেখা গেছে। উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগে পিয়ারসন বিমান বন্দরেই কানাডার নকল ভিসায় আগত এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন: ভারতে বর্ষবরণেও প্রতিবাদ
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ খ্রিস্টীয় বর্ষবরণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আনন্দ-উৎসবে মেতেছে ভারতও। তবে দেশটির বিভিন্ন স্থানে এই আমেজ একটু ভিন্নরকম। মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকেই স্লোগানে স্লোগানে প্রতিবাদ জানিয়ে বর্ষবরণ শুরু করে ছাত্র-জনতা। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিক তালিকা (এনআরসি) বাতিলের দাবিতে এ প্রতিবাদ। ভারতের রাজধানী দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে বর্ষবরণেও এই প্রতিবাদ সরকারকে বার্তা দিয়ে রাখল তিন সপ্তাহ পেরোনো এই আন্দোলন নতুন বছরেও অব্যাহত থাকবে। এদিকে মঙ্গলবার কেরালা রাজ্যের বিধানসভায় সিএএ বাতিলের প্রস্তাব পাস হয়েছে।
রয়টার্স বলছে, দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের বর্ষবরণে ছিল না আতশবাজি-ডিজে; ছিল স্লোগান। সিএএ ও এনআরসির বিরোধিতায় দিল্লিজুড়ে সারা রাত মিছিল-সমাবেশ করেন আন্দোলনকারীরা। ইন্ডিয়া গেটে মিছিলের ডাক দেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। শাহীনবাগে লাগাতার ধরনা চলছে। সেখানেও রাতভর বর্ষবরণ কর্মসূচি আয়োজন করেন বিক্ষোভকারীরা। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার ক্যাম্পাসে বিশাল সভায় বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়। জামিয়ার ছাত্র নাসির আখতার বলেন, ২০১৯ সাল আমরা কখনও ভুলব না। নতুন বছরে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে আমাদের। বর্ষবরণের রাতে উত্তেজনা ঠেকাতে কিছু এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে পুলিশ। এতে পিছু হটেনি আন্দোলনকারীরা। তাদের ভাষ্য- এতদিন পুলিশ দিয়ে আন্দোলন নস্যাৎ করতে পারেনি সরকার, এবারও পারবে না। শুধু ছাত্র-জনতাই নয়, বিক্ষোভে শামিল হন রাজনীতিকরাও। ভারতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যথারীতি বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন বছরে আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধী নেতারা।
আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, বিতর্কিত সিএএ বাতিলের প্রস্তাব পাস হয়েছে কেরালার বিধানসভায়। এক দিনের বিশেষ অধিবেশনে মঙ্গলবার রাজ্য সরকারের আনা প্রস্তাবে সম্মতি দেন বিরোধীরাও। তবে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন বিজেপির বিধায়ক রাজাগোপাল। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নসহ অন্যান্য নেতাদের অভিমত, সংবিধানের আদর্শের সঙ্গে এই আইনটি সরাসরি সংঘাতপূর্ণ। সংবিধানের ১৩, ১৪ ও ১৫নং ধারাকে ক্ষুণ্ন করছে এই আইন। টাইমস অব ইন্ডিয়া ও এনডিটিভি বলছে, উত্তর প্রদেশের বিজনৌরে বিক্ষোভ চলাকালীন গত ২০ ডিসেম্বর পুলিশের গুলিতে নিহত হন সুলেমান নামে এক যুবক। এ ঘটনায় সুলেমানের ভাই থানায় অভিযোগ করেছেন। এতে অভিযুক্ত করা হয়েছে অপসারিত পুলিশ আধিকারিক আশিস তোমার, রাজেশ সোলাঙ্কিসহ ছয়জনকে। বিজনৌর পুলিশ সুপার বিশ্বজিৎ শ্রীবাস্তব জানান, সুলেমানের ভাই ছয় পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও আইনি জটিলতার কারণে আলাদা এফআইআর সম্ভব নয়। এর আগে থানায় দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে করা মামলার রিপোর্ট জমা পড়েছে, এর সঙ্গে অভিযোগকে মিলিয়ে তদন্ত করা হবে। পুলিশের দাবি, ছিনিয়ে নেয়া পিস্তল উদ্ধারে গেলে সুলেমান এক পুলিশ কর্মীকে গুলি করেন। আত্মরক্ষার্থে চালানো পাল্টা গুলিতে নিহত হন তিনি।
অপরদিকে সুলেমানের পরিবারের দাবি, জুমার নামাজ পড়ে বাড়ি ফেরার পথে তোমারসহ কয়েক পুলিশ কর্মী তাকে পাশের একটি গলিতে নিয়ে গুলি করে। পরে বিজনৌর পুলিশ ওই ঘটনার কথা স্বীকারও করে। বিক্ষোভকারীদের গুলি করে মারার হুমকি দিয়ে বিতর্কে জড়ানো দিল্লি পুলিশের সাবেক কনস্টেবল রাকেশ ত্যাগী একটি ভিডিওতে বলেছেন, যে কারণে আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, একই কারণে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে কেন গ্রেফতার করা হবে না?
রাজ্যটির মুজাফফরনগরে বিক্ষোভকালে বিনা প্ররোচনায় এক মাদ্রসার ৩৯ শিক্ষার্থী ও মৌলভী আসাদ রাজা হুসানিতে তুলে নিয়ে প্রচণ্ড মারধর করে পুলিশ। এদিকে যোগীর মতোই বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের হুমকি দিয়েছে রেল বিভাগ। আনন্দবাজার বলছে, রেল বোর্ডের চেয়ারম্যান ভি কে যাদব বলেন, সিএএ বিরোধী বিক্ষোভের জেরে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে রেলের ৮০ কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সম্পত্তি যারা নষ্ট করেছে, তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে।
কাপড় ও সুতা শিল্প গভীর সংকটে
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ দেশে গড়ে ওঠা সুতা-কাপড়ের মিলের দিকে সরকারের বিন্দুমাত্র নজর নেই। মাত্র ৫-১০ কোটি টাকা খরচ করে যারা গার্মেন্টস নামে ‘দর্জির দোকান’ খুলে বসেছেন তাদের জন্য সুবিধার সব দুয়ার খোলা। কিন্তু হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে যারা সুতা-কাপড়ের মিল স্থাপন করেছেন তাদের জন্য সরকার কিছুই করছে না। অথচ তৈরি পোশাক খাতের শিল্পে মূল্য সংযোজনের পরিমাণ বাড়াতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা পশ্চাৎপদ এ দুটি শিল্পকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ প্রতিযোগী দেশগুলো সুতা-কাপড়ের শিল্পে অলআউট সাপোর্ট দিয়ে বিশ্বে বড় বাজারের সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে। সেখানে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। সরকার শুধু ব্যস্ত ‘দর্জিগিরি’ নিয়ে। অথচ দর্জিগিরি ছাড়া এই সেক্টরের প্রায় সবকিছু আমদানি করতে হয়। কিন্তু রফতানি আয় থেকে আমদানি ব্যয় বাদ দেয়া হয় না। ভুক্তভোগীদের অনেকে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, কাপড় ও সুতার মিল স্থাপন করে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের নানা প্রতিকূলতার মাঝে ব্যবসা করতে হচ্ছে। মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। শুধু মাটি-পানি আর শ্রম ছাড়া নিজেদের কিছুই নেই।
এত প্রতিকূলতার পরও দেশে টেক্সটাইল শিল্প গড়ে উঠেছে উদ্যোক্তাদের অসীম সাহস আর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। কিন্তু ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্য ও বন্দরের চার্জ বেশি হওয়ার কারণে এখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাজার প্রতিযোগিতায় যেখানে অবস্থান শক্তিশালী করতে চীন ও ভারত বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, সেখানে দেশে গড়ে ওঠা বস্ত্রশিল্প প্রয়োজনীয় নীতি-সহায়তার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। তারা মনে করেন, বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সুতা-কাপড়ের মতো ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পকে সহায়তা দেয়া সময়ের দাবি। এতে একদিকে অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বাড়বে।
বিশ্লেষকদের কয়েকজন বলেন, মূলত ওভেন খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে না পারলে ব্যবসা অন্য দেশে চলে যাবে। কারণ বিদেশি ক্রেতারা এখন লিড টাইমকে গুরুত্ব দেন, কম সময়ে পণ্য ডেলিভারি চান। তাদের মতে, সরকারের নীতিনির্ধারক মহল দেশে অর্থনীতি ও বেকারত্বের চাপ কমাতে চাইলে এই সেক্টরকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। এক্ষেত্রে তৈরি পোশাকের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প হিসেবে কাপড় ও সুতার মিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে। এছাড়া এই সংকট নিয়ে শুধু ভুক্তভোগী শিল্প উদ্যোক্তারা ভাবলে হবে না, সরকারের নীতিনির্ধারক মহল থেকে শুরু করে আমলাতন্ত্রকেও অর্থবহ ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে ওভেন খাতে ৬০-৭০ শতাংশ ও সোয়েটারে ৮০-৮৫ শতাংশ কাপড় বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশীয় শিল্পের স্বার্থে সরকারকে নেতিবাচক এ পথ বন্ধ করতে হবে। বিপরীতে গার্মেন্টগুলো যাতে দেশীয় বস্ত্রকল থেকে কাপড় কেনে সেজন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা প্রদানসহ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সামগ্রিকভাবে সুতা ও কাপড়ের মিলের উন্নয়নে সরকারকে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করতে হবে। যার কাজ হবে- বন্ডের অপব্যবহার রোধ এবং টেক্সটাইল খাতে উন্নয়ন রোডম্যাপ প্রণয়ন করা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি মঙ্গলবার বলেন, সুতা ও টেক্সটাইল শিল্পে প্রণোদনা দেয়ার বিষয়টি সরকার ভেবে দেখবে। এ খাতে কোনো প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে না। নতুন বছরে বিষয়টি ভেবে দেখব।
দর্জি দোকানের মতো স্থাপন করা তৈরি পোশাক শিল্পে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। অথচ হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে যারা সুতা শিল্প ও টেক্সটাইল শিল্প গড়ে তুলেছেন তাদের কোনো সুবিধা দেয়া হচ্ছে না, এমন বাস্তব অবস্থা তুলে ধরা হলে মন্ত্রী বলেন, এখন তৈরি পোশাক শিল্পকে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এরপরও তৈরি পোশাক শিল্পের অবস্থা ভালো নয়। এটি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এজন্য টেক্সটাইল ও সুতা শিল্পে প্রণোদনা দেয়ার বিষয়টি ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এছাড়া বন্ডের সুবিধা নিয়ে যারা আমদানিকৃত সুতা খোলাবাজারে বিক্রি করছে তাদের বিরুদ্ধে আরও শক্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে সূত্র জানায়, রফতানি আয়ের তথ্যে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। প্রতি বছর রফতানি আয়ের যে তথ্য দেখানো হয় তা পুরোপুরি সঠিক নয়। ওভেন গার্মেন্টস রফতানির বড় অংশ ফ্যাব্রিক্স আমদানিতে ব্যয় হয়। সেই অঙ্ক রফতানি আয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হয় না। সরকার রফতানি আয়ের ভুয়া তথ্যে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে। গার্মেন্টস মালিকরা রফতানি আদেশ পাওয়ার পর ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে ভারত-চীন থেকে ফ্যাব্রিক্স আমদানি করে। এই কাপড় দেশে এনে শুধু সেলাই করে পুনরায় রফতানি করা হয়।
এক্ষেত্রে মোট রফতানির প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ মাত্র ৩০ ভাগ অর্থ দেশে আসছে। এছাড়া রফতানিমুখী সেক্টর হিসেবে গার্মেন্ট মালিকদের অনেকে কাঁচামাল আমদানির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইডিএফ সুবিধায় কম সুদে ঋণ সুবিধাও পেয়ে থাকে। কিন্তু তাদের আমদানিকৃত কাঁচামালের একটি বড় অংশ যখন খোলাবাজারে বিক্রি হয়, তখন সরকার এবং দেশীয় বস্ত্রশিল্প চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এভাবে দীর্ঘদিন থেকে গার্মেন্ট ব্যবসার সাইনবোর্ড লাগিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের অনেকে এভাবে চোরাকারবারি করে শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। অথচ দেশে উৎপাদিত উন্নত মানের সুতা ও কাপড় সেভাবে বিক্রি হচ্ছে না। তাদের চীন ও ভারতের সঙ্গে অসম এক প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। শুধু পশ্চাৎপদ শিল্প যেমন স্পিনিং ও টেক্সটাইল শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে রফতানিতে মূল্য সংযোজনের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হলেও সেদিকে সরকারের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। এ খাতের উন্নয়নে নেই কোনো রোডম্যাপ। এ অবস্থায় দেশীয় সুতা ও কাপড়ের বস্ত্রশিল্প এখন প্রায় ধ্বংসের পথে। বন্ড সুবিধায় আনা বিদেশি সুতা-কাপড়ের কালোবাজারি বন্ধ না হওয়ায় স্থানীয় মিলের উৎপাদিত পণ্যের বিক্রি প্রায় শূন্যের কোঠায়। ছোট-বড় চার শতাধিক স্পিনিং মিলে অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে ৮ লাখ টনের বেশি সুতা।
কাপড়ের মিলগুলোর অবস্থাও একই রকম। এ কারণে বেশির ভাগ মিল মালিক ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। অনেকে খেলাপি হতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু সব জেনেও সরকারের দায়িত্বশীল মহল নীরব ভূমিকা পালন করছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার শুধু গার্মেন্ট নামের দর্জিগিরি নিয়ে ব্যস্ত। অথচ সরকারের উচিত ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সঠিক নীতি প্রণয়ন ও প্রণোদনা দেয়া। তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের মধ্যে নানা বৈষম্য রয়েছে। এগুলো সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ পোশাক শিল্পের কর্পোরেট কর সাড়ে ১২ শতাংশ। পক্ষান্তরে টেক্সটাইল শিল্পের ১৫ শতাংশ এবং এক্সেসরিজ শিল্পের ৩৫ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে আরও বৈষম্য রয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) সভাপতি আবদুল কাদের খান বলেন, এক্সেসরিজ শিল্প বৈষম্যের শিকার। তৈরি পোশাক শিল্পের চেয়ে এক্সেসরিজ শিল্পকে ট্যাক্স বেশি দিতে হয়।
অন্যদিকে নতুন বাজেটে পোশাক শিল্পকে ১ শতাংশ অতিরিক্ত প্রণোদনা দেয়া হলেও এক্সেসরিজ শিল্প সেটি পাচ্ছে না। অথচ দুই শিল্পেরই শ্রমিকদের বেতন ও পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, সরকারের সহযোগিতা ছাড়া ওভেন খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এজন্য উদ্যোক্তাদের প্রকৃতপক্ষে সিঙ্গেল ডিজিটে ব্যাংক ঋণ দিতে হবে।
পাশাপাশি ওভেন ফ্যাব্রিক্সে প্রযোজ্য হারে প্রণোদনা বাড়ানোসহ গার্মেন্টগুলোকে স্থানীয় কাপড় ব্যবহারে বাধ্য করতে হবে। তাহলে এ খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএফসি (ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশন) থেকে কম সুদে ঋণ নিতে সরকার ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করতে পারে। পাশাপাশি ঘন ঘন পরিবর্তন না করে দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন করে এই খাতে বিশেষ প্রণোদনা চালু করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সরকার নিট খাতে প্রণোদনা দেয়ায় এখন এই খাত কিছুটা এগিয়েছে। এজন্য ওভেন ফ্যাব্রিক্স উৎপাদনে প্রণোদনা দেয়া খুবই জরুরি।
সরকার ৫-১০ বছরের জন্য ওভেন খাতে আর্থিক প্রণোদনা দিলে বড় বড় অনেক শিল্প গড়ে উঠবে। এতে একদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে রফতানিতে মূল্য সংযোজনের পরিমাণও বাড়বে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে ওভেন খাতে রফতানি আয়ের বড় একটি অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে। এ অর্থ দেশে রাখতে তৈরি পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তুলতে সরকারকে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত। সিনথেটিক ফাইবার, পলিয়েস্টার ফাইবার, ম্যানমেইড ফাইবার উৎপাদনে প্রণোদনা দিলে দেশীয় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। তার আগে সরকারকে বন্ডের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তা না হলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না। এজন্য এনবিআরকে আরও তৎপর হতে হবে।










