মোহাম্মদ শরীফ হোসেন : এক বহুমাত্রিক সমাজ সংস্কারকের জীবনগাঁথা

0

শিকদার খালিদ| লোকসমাজ
যশোরের ঐতিহ্যকে স্মরণীয় করেছেন বরণীয় যে কয়জন ব্যক্তিত্ব তাঁদের মধ্যে অন্যতম অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফ হোসেন (১৯৩৪-২০০৭)। তিনি কেবল একজন শিক্ষাবিদই ছিলেন না, ছিলেন এক আত্মত্যাগী সমাজ সংস্কারক।
১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি যশোরের খড়কি গ্রামে জন্মগ্রহণকারী এই কৃতি পুরুষ শৈশব থেকেই ছিলেন মেধাবী। যশোর জিলা স্কুল ও এম.এম কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন।
দেশপ্রেম, গ্রন্থাগার আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, সামাজিক আন্দেলন, কৃষি আন্দোলন প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি রেখেছেন ফলপ্রসূ অবদান। নিজের আদর্শকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন সমাজে। সেই আলোয় উদ্ভাসিত যশোরের মানুষ এখনও তাঁকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করে।
ভাষা আন্দোলন ও রাজনৈতিক পথচলা
ছাত্রাবস্থাতেই তিনি সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং একাধিকবার কারাবরণ করেন। পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও পরবর্তীতে তিনি স্বাধিকার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে যশোরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
শিক্ষক ও শিক্ষানুরাগী
১৯৬২ সালে মাইকেল মধুসূদন কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করে শিক্ষকতা পেশা শুরু করেন। পরবর্তীতে বিএল কলেজ ও পুনরায় এম.এম কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করে ১৯৯১ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষানুরাগী মন কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৬৩ সাল থেকে যশোর পাবলিক লাইব্রেরির সম্পাদক হিসেবে তিনি ১৯৬৭ সালে যশোরে প্রথম বইমেলা প্রবর্তন করেন। বই ব্যাংক ও ভ্রাম্যমাণ পাঠকেন্দ্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বই পড়ার প্রতি উৎসাহিত করেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও জীবনের ঝুঁকি
১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। কিন্তু ৬ ডিসেম্বর যশোর শত্রুমুক্ত হলে তিনি মুক্তি লাভ করেন।
সমাজ সংস্কার ও জনকল্যাণ
শরীফ হোসেনের সমাজ সংস্কারের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো যশোরে প্রথম নৈশবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। এছাড়াও তিনি একাধিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। নিজ ৫ বিঘা জমি দান করে খড়কি এলাকায় ‘আঞ্জুমানে খালেকিয়া ও লিল্লাহ ট্রাস্ট’ নামক এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে ১১০ জন এতিম ছেলে লালনপালন করা হয়।
১৯৯৪ সালে নিজ বাড়ির সামনে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সন্দীপন’। এটি একটি অরাজনৈতিক, সমবায়ী ও অসাম্প্রদায়িক সংস্থা। সন্দীপনের মাধ্যমে ৪৬ জন এতিম মেয়ে আশ্রিত থাকে এবং সেখানে তাদের থাকা-খাওয়া, শিক্ষা, চিকিৎসা সবই বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য ‘নারী উন্নয়ন কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রামের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে পড়ানোর জন্য চালু করেন ৫২টি কোচিং সেন্টার।
কৃষি উন্নয়নে কীটনাশকমুক্ত ফসল উৎপাদনের জন্য সন্দীপন কাজ করে। এছাড়াও ঢাকায় গৃহকর্মী নারীদের সন্তানদের জন্য গড়ে তোলেন দিবাযত্ন কেন্দ্র।
স্বীকৃতি ও প্রয়াণ
তাঁর অসাধারণ কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘একুশে পদক’ প্রদান করে। ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি এই মহান ব্যক্তিত্ব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মোহাম্মদ শরীফ হোসেন ছিলেন এক নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক, দূরদর্শী শিক্ষাবিদ ও মহান সমাজকর্মী। তাঁর জীবনী আমাদের দেশপ্রেম, শিক্ষা ও মানবসেবার অনুপ্রাণিত করে।