সাংবাদিক ততক্ষণ স্বাধীন, যতক্ষণ সে অপরের নির্ভরশীল নয় : কামাল আহমেদ

‘স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনে সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক নীতি সংলাপ

0
ছবি: লোকসমাজ।

তহীদ মনি ॥ স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের পাশাপাশি সংবাদপত্রের প্রকাশনা আইন ও নীতিমালা আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন, যাতে অর্থবিত্ত থাকলেই কেউ সহজে প্রকাশনার অনুমতি না পায় এবং সাংবাদিকদের রাজনৈতিক ও মালিকপক্ষের স্বার্থে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে না পারে।

সাংবাদিকদের যথোপযুক্ত সম্মানি নিশ্চিত করা না গেলে মানসম্মত সাংবাদিক তৈরি হবে না এবং সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি ‘ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা’ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব, মালিকপক্ষের চাপ, চাকরি হারানোর ভয় ও নিরাপত্তার অভাব দূর না হলে স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। সরকারই পারে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রকৃত নিশ্চয়তা দিতে।

যশোরে ‘স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনে সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক নীতি সংলাপে মূল বক্তব্যে দ্য ডেইলি স্টার-এর কনসালটেন্ট এডিটর কামাল আহমেদ এসব কথা বলেন।

সংলাপে স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনে অনৈতিক ও অসম প্রতিযোগিতা থেকে গণমাধ্যমকে বেরিয়ে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি ও দাসত্বমনোভাব ত্যাগ করা, ক্ষমতার তল্পিবাহক না হওয়া, চাটুকারিতা বন্ধ করা এবং সাংবাদিকদের চাকরির নিশ্চয়তা প্রদানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনার উঠে আসে।

ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই), দৈনিক লোকসমাজ, দৈনিক গ্রামের কাগজ এবং ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সাপোর্ট (আইএমএস)-এর যৌথ উদ্যোগে শনিবার সকালে যশোরের একটি স্থানীয় হোটেলে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দৈনিক লোকসমাজ-এর প্রকাশক শান্তনু ইসলাম সুমিত। এ সময় মূল বিষয়বস্তু নিয়ে আমন্ত্রিত অতিথিদের ধারণা দেন এমআরডিআই-এর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান মুকুর।

আলোচনায় ১৫ জন আমন্ত্রিত তাদের নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন, যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, প্রেসক্লাব যশোরের আহ্বায়ক একরাম উদ দ্দৌলা এবং সদস্য সচিব মবিনুল ইসলাম মবিন, প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ফকির শওকত, প্রেসক্লাব যশোরের সাবেক সাধারণ সম্পাক আহসান কবীর বাবু, এস এম তৌহিদুর রহমান, দৈনিক লোকসমাজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আনোয়ারুল কবির নান্টু, দৈনিক সমাজের কথার সম্পাদক আমিনুর রহমান মামুন, সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোরের সভাপতি আকরামুজ্জামান, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সাজেদ রহমান প্রমুখ।

নীতি সংলাপে বক্তারা এক স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের ওপর বিশেষ জোর দেন। এমআরডিআই-এর পক্ষ থেকে গণমাধ্যম সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ও সরকারের নীতিগত অবস্থানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। বক্তারা উল্লেখ করেন, গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করতে সুরক্ষা ও স্বচ্ছ সাংবাদিকতার স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হবে, তবেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

সংলাপে উপস্থাপিত তথ্যে জানানো হয়, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, সুরক্ষা, পেশাদারি মান এবং উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে সম্প্রচার ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলো প্রেস কাউন্সিলের আইনগত এখতিয়ারের বাইরে থাকায় সব মাধ্যমের জন্য একটি অভিন্ন তদারকি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

এছাড়া গণমাধ্যম সংক্রান্ত ২০০ বছরের পুরোনো দণ্ডবিধি, ১০০ বছরের পুরোনো আদালত অবমাননা আইন এবং ১৯৭৪ সালের প্রেস ও প্রকাশনা অধ্যাদেশের মতো প্রাচীন আইনগুলোর সংস্কার এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরির তাগিদ দেওয়া হয়।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর যৌথ জনমত জরিপের বরাতে জানানো হয়, দেশের ৬৭.৬৭ শতাংশ মানুষ গণমাধ্যমকে স্বাধীন দেখতে চান। তবে বাস্তবে মাত্র ১৭.২৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন সংবাদমাধ্যম পুরোপুরি স্বাধীন। এছাড়া ৫৯.৯৪ শতাংশ মানুষ গণমাধ্যমের পূর্ণ নিরপেক্ষতা এবং ৩৭.৩৯ শতাংশ মানুষ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত গণমাধ্যমের পক্ষে মতামত দিয়েছেন।

বক্তারা বলেন, বর্তমান সরকারকে তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মিডিয়া রেগুলেটরি কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ শুরু করতে হবে। এর অংশ হিসেবে গণমাধ্যম মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, শিক্ষক, আইন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ‘পরামর্শক কমিটি’ গঠন করা উচিত, যাতে প্রকৃত অর্থে একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গড়ে তোলা সম্ভব হয়।

সংলাপে প্রস্তাব করা হয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬ (খসড়া)’ সর্বসাধারণের মতামতের জন্য উন্মুক্ত করা উচিত, যাতে সব স্তরের অংশীজনদের মতবিনিময়ের ভিত্তিতে খসড়া চূড়ান্ত করে মন্ত্রিসভা বা জাতীয় সংসদে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা যায়।

সভাপতির বক্তব্যে দৈনিক লোকসমাজ-এর প্রকাশক শান্তনু ইসলাম সুমিত বলেন, “একটি টেকসই ও স্বাধীন মিডিয়া রেগুলেটরি কাঠামো গড়ে উঠলে তা সংবাদমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে, যা সর্বোপরি দেশের গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।”

অনুষ্ঠানে যশোরের বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।