যশোরে গুলি করে দুই হত্যার শুট্যারদের খোঁজে পুলিশ

0
নিহত আলমগীর হোসেন ও রানা প্রতাপ।

মীর মঈন হোসেন মুসা ॥ যশোরে দুই দিনের ব্যবধানে মাথায় গুলিতে দুইজনের নিহত হওয়ার ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। পেশাদার কিলারদের প্রকাশ্য অপরাধ আতঙ্ক বাড়াচ্ছে সাধারণের মনে।

যশোর শহরের শংকরপুরে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন এবং মনিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারে ‘কথিত’ চরমপন্থি রানা প্রতাপ বৈরাগী খুন হয়েছেন অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের গুলিতে। দুই জনই মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। পুলিশ এখনো পর্যন্ত দুই হত্যার ঘটনায় জড়িত কাউকে শনাক্ত এবং আটক করতে না পারায় এ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও জেলা পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দুটি হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

গত ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় যশোর শহরের শংকরপুরে পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র যুগ্ম সম্পাদক আলমগীর হোসেনকে ফিল্মি স্টাইলে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। তার মাথায় অস্ত্র মাথায় ঠেকিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। নিহত আলমগীর হোসেন একজন জমি ব্যবসায়ী ছিলেন।

গ্রিনলান্ড প্রপোইটিজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার আরেক ভাই কামরুল ইসলাম ও তিনি একই সাথে জমির ব্যবসা করতেন। যশোর মেডিকেল কলেজের পাশের নিজেদের অফিস থেকে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফেরার পথে শংকরপুর ইসহাক সড়কে পৌঁছালে তাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

আলমগীর হোসেন হত্যার ঘটনায় নিহতের স্ত্রী শামীমা বেগম তার জামাই বাসেদ আলী পরশ এবং প্রতিবেশী আসাবুল ইসলাম সাগরের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জনকে আসামি করে ৪ জানুয়ারি সকালে কোতয়ালি থানায় মামলা করেন। তবে মামলার আগেই ঘটনার দিন রাতে ডিবি পুলিশ বাসেদ আলী পরশ ও আসাবুল ইসলাম সাগরকে আটক করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একটি সূত্র জানায়, রাতভর আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে হত্যাকান্ডের বিষয়ে তাদের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

অবশ্য পরদিন ৪ জানুয়ারি দুপুরে প্রেস ব্রিফিংকালে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানিয়েছিলেন,আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় পাওয়া যায়নি।

ডিবি পুলিশের ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, আলমগীর হোসেন হত্যা মামলাটি তারা গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছেন। সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত বিভিন্ন ফুটেজ বিশ্লেষণ করে শ্যুটারদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।
বিএনপি নেতা আলমগীর হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই অলক কুমার দে জানান, সরাসরি হত্যা মিশনে অংশ নেওয়া দুর্বৃত্তদের শনাক্ত এবং আটকের জন্য তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।

স্থানীয় লোকজনের দাবি, পুলিশ আলমগীর হোসেন হত্যাকে পূঁজি করে যেনো সাধারণ লোকজনকে হয়রানি না করে। তারাও চান হত্যার সাথে প্রকৃত দোষীদের পুলিশ আটক করুক।

যশোর শহরের শংকরপুরে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন হত্যার দুই দিন পর গত ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মনিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজরে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন ‘কথিত’ চরমপন্থি রানা প্রতাপ বৈরাগী। তাকেও মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে একইভাবে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগী কেশবপুর উপজেলার আড়ুয়া গ্রামের তুষার কান্তি বৈরাগীর ছেলে। মনিরামপুরের কপালিয়া বাজারে তার একটি বরফকল রয়েছে।

কী কারণে রানা প্রতাপ বৈরাগীকে দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করেছে তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। হত্যাকারীদেরও শনাক্ত করতে পারেনি। হত্যার ঘটনায় মঙ্গলবার নিহতের পিতা তুষার কান্তি বৈরাগী অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা করেছেন বলে জানিয়েছেন মনিরামপুর থানার ওসি রজিউল্লাহ খান। তিনি আরো জানান, মামলাটি ডিবি পুলিশ তদন্ত করছে।

জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আবুল বাশার জানান, নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগী একজন চরমপন্থি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে কেশবপুর থানায় ১টি বিস্ফোরক মামলা এবং অভয়নগর থানায় শ্রমিক নেতা মোল্যা অলিয়ার রহমান হত্যা মামলাসহ দুটি মামলা রয়েছে। অপরটি ধর্ষণ মামলা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, কপালিয়া বাজারের এক নারীর সাথে নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগীর গভীর সম্পর্ক ছিলো। ওই নারী রূপচর্চার পেশার সাথে জড়িত। তার স্বামী বর্তমানে ভারতে থাকেন। ওই নারীর সাথে সম্পর্কের কারণে ভারতে থাকা তার স্বামী কিলার ভাড়া করে রানা প্রতাপ বৈরাগীকে খুন করিয়েছেন কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অপর একটি সূত্র জানায়, রানা প্রতাপ বৈরাগী বরফকল ব্যবসার সাথে জড়িত হলেও তিনি একজন চরমপন্থি নেতা হিসেবে পরিচিত। এক সময় তিনি অভয়নগর ও কেশবপুরে মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলেন। ২০১৬ সালে কেশবপুরে মানুষ তৎকালীন পুলিশ সুপারের কাছে তার বিরুদ্ধে দেওয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছিলেন, তারা রানা প্রতাপ বৈরাগীর হাতে জিম্মি।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রতিপক্ষ চরমপন্থিদের হাতে তিনি নিহত হয়েছেন কিনা সেই বিষয়টিও সামনে রেখে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। তবে শ্যুটাররা আটক হলে হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন হবে।

রানা প্রতাপ বৈরাগী হত্যায় জড়িতদের আটক বিষয়ে কাজ করছেন ডিবি পুলিশের এসআই মো. কামরুজ্জামান। তিনি জানান, জড়িতদের শনাক্ত এবং আটকের জন্য অভিযান চলছে।