যশোরে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব অবহেলা নিয়ে জেলা প্রশাসকের ক্ষোভ

‘শুধু চাকরি আর বেতন নয়, মানুষের জন্য কাজ করুন’ উন্নয়ন সমন্বয় সভায়

0

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ‘আমরা শুধু লেখাপড়া শিখেছি, চাকরি করছি আর টাকা কামাচ্ছি, কিন্তু মানুষ হয়ে উঠতে পারিনি’ এমন কঠোর মন্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বের অবহেলা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যশোর জেলা প্রশাসক মো. আজাহারুল ইসলাম।

রোববার জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, কৃষি এবং স্বাস্থ্য বিভাগসহ বিভিন্ন দপ্তরের গাফিলতি ও উদাসীনতার তীব্র সমালোচনা করেন।

জেলা কালেক্টরেট ভবনের অমিত্রাক্ষর সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মাসিক সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি জেলা প্রশাসক বলেন, ‘রুটিনমাফিক কাজ করছি, কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে কর্তব্য পালন করছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সামান্য আন্তরিকতা থাকলে পুরো চিত্র পাল্টে যেত।’

জেলা প্রশাসক জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের সমালোচনা করে বলেন, ‘তিন বছর ধরে জনগণের জন্য বরাদ্দ টিউবওয়েল আটকে রাখা হয়েছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি বিধান অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা নেওয়ার কথা থাকলেও ক্ষেত্রবিশেষে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে, অথচ বর্ষা ও জলাবদ্ধতায় মানুষ বিশুদ্ধ খাবার পানি পাচ্ছে না।

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২৫০ শয্যা হাসপাতালে কুকুর ও বিড়ালের কামড়ের প্রতিষেধকের সংকট রয়েছে। প্রতিষেধকের দাম মাত্র ১২৫ টাকা হওয়া সত্ত্বেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বরাদ্দের অভাব দেখিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা বা অনেক দানশীল ব্যক্তিও লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে সহায়তা করতে পারেন। তা সত্ত্বেও কেন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না?’

কৃষি বিভাগের অবহেলা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতার কারণে এখনও আমন রোপণ করা সম্ভব হয়নি। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ দায় এড়ানো তথ্য দিয়ে সভার সময় ও সরকারের অর্থ অপচয় করছে। তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ কয়েকটি ছোট নালা বা পানি অপসারণের ব্যবস্থা করলেই এ সমস্যার সমাধান হতো।

সভায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা এবং ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জেলার স্বাস্থ্যসেবার চিত্র তুলে ধরেন। তারা জানান, সাপে কামড়ানো রোগীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য প্রতি উপজেলা হাসপাতালে দুই ডোজ করে ‘অ্যান্টিভেনম’ ওষুধ দেওয়া হয়েছে। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, অ্যান্টিভেনম দেওয়ার পর রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হতে পারে, যার জন্য আইসিইউ প্রয়োজন। তাই দ্রুত রোগীকে সদর হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। বেশিরভাগ রোগী হাসপাতালে আসার আগে কবিরাজি চিকিৎসা নেওয়ার কারণে তাদের অবস্থা বিপজ্জনক হয়ে যায় বলেও তারা জানান।

তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, গত মাসে ১ হাজার ৯৭৬ জনকে কুকুর ও বিড়ালের কামড়ের প্রতিষেধক দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বেশিরভাগই বিড়ালের কামড়ের শিকার। বর্তমানে হাসপাতালে প্রতিষেধকের সংকট রয়েছে।

এর প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘দানশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জানালে এমন সমস্যার সমাধান হয়। সামান্য আন্তরিকতা থাকলে এই ছোটোখাটো বিষয়গুলো সহজে সমাধান করা সম্ভব।’ তিনি মানুষকে সেবা থেকে বঞ্চিত না করার জন্য সংশিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল হক জানান, সোমবার থেকে জেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। তবে অভয়নগরে ১০টি, কেশবপুরে ৪টি এবং মনিরামপুরে ১০টিসহ মোট ২৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জলাবদ্ধতার কারণে মন্দির ও বাড়িতে পরীক্ষা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পৌরসভার প্রশাসক ও ডিডিএলজি রফিকুল হাসান জানান, অতিরিক্ত বর্ষায় শহরের অনেক রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পৌরসভার ফান্ড থেকে কিছু কাজ করা হবে এবং ৬ কোটি টাকার ড্রেনের কাজ চলছে। ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭টি রাস্তা সংস্কারের কাজও দ্রুত শুরু হবে। তিনি আরও জানান, লালদিঘীর পাড়ের সৌন্দর্যবর্ধন ও সংরক্ষণে আড়াই কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।

সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আছাদুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (জেনারেল) সুজন সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী, গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম এবং প্রেসক্লাব সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন প্রমুখ।