বৃষ্টিতে উৎপাদনহীনতায় সবজি সংকট সাতমাইল মোকামে

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ টানা বৃষ্টিতে সবজি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যশোরের বাজারে সবজির দাম আকাশছোঁয়া। সবজি কিনতে এসে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের। উৎপাদন কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারগুলোতেও দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট।

এক সময়ের সরগরম সাতমাইল বারীনগর সবজি মোকাম এখন নীরব। কৃষকদের ফসলহানির বোঝা এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির চাপ, উভয়ই শেষ পর্যন্ত ক্রেতার পকেট থেকে কাটা পড়ছে।

কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক মাসের টানা বৃষ্টির কারণে পচে গেছে পটলের গাছ. ক্ষেতে ফুল আসার আগেই মারা যাচ্ছে বেগুন, লাউয়ের ফলন অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে বাজারে সরবরাহ কম, দাম চড়া, আর পথে পথে পরিবহনে খরচ বেড়ে সাধারণ ভোক্তার কাঁধেই পড়ছে সব চাপ।

গত রোববার যশোরের বৃহত্তম সবজির হাট বারীনগরে গিয়ে এই দৃশ্য চোখে পড়েছে।

বারীনগর সবজি ব্যবসায়ীসমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন ভুট্টো জানান, আমরা তিন-চারজন ব্যবসায়ী মিলে শিম, পটল আর লাউয়ের একটি ট্রাক ঢাকায় পাঠাচ্ছি। এছাড়া কয়েকজন মিলে চট্টগ্রামে দুই ট্রাক, বরিশালে তিন ট্রাক এবং আরও ১০-১২ ট্রাক সবজি ঢাকায় পাঠাবে ব্যাপারীরা।

যশোর সদরের রাখালগাছি গ্রামের শফিয়ার রহমান বেগুন নিয়ে এসেছিলেন। সাদা বেগুন বিক্রি করেন ৭৮ টাকা কেজি করে এবং বেগুনি রঙেরটা ৭৫ টাকা কেজি দরে। তিনি বলেন, বর্ষায় বেগুনের ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবার নিয়ে দুইবার হাটে এসেছি। তিনি দুই ধরনের মিলিয়ে প্রায় ৫ মণ বেগুন হাটে আনেন।

নিশ্চিন্তপুরের কৃষক নজরুল ইসলাম কাটু বাজারে ৮৪ কেজি পটল এনেছিলেন। বিক্রি করেছেন ৪২ টাকা কেজি দরে।

তিনি বলেন, এবার শিলাবৃষ্টিতে আমার ৫ বিঘা ধানের বেশিরভাগই বিনষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া লাগাতার বৃষ্টিতে ২ বিঘা জমির পটলের কা- পচে গেছে। বৃষ্টির কারণে এবার আগাম সবজি চাষে বেশ ভাটা পড়েছে। এখন যদি আবহাওয়া শুষ্ক থাকে তাহলে পাতাকপি ও মুলা চাষের ইচ্ছা আছে। বর্তমানে দেড় বিঘা জমিতে পটল, ১০ কাঠায় বেগুন রয়েছে। বেগুনের দু’একটা ফুল আসতে শুরু করেছে। বৃষ্টি ও শিলায় ধান ও সবজি মিলিয়ে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি জানান।

ডহরপাড়া থেকে গোলাম রসুল এক মণ বেগুন আনেন। এই হাটে এবার প্রথম তিনি বেগুন এনেছেন। বিক্রি করেছেন ৯০ টাকা কেজি দরে। নওদাঁগ্রামের এনামুল হক ১২ কাঠা জমিতে মুলা লাগিয়েছিলেন। হাটে মণ চারেক মুলা এনেছেন। চাহিদা থাকায় দ্রুত বিক্রি হয়ে গেছে মুলা। বিক্রি করেছেন ৫২ টাকা দরে।

শাহবাজপুর গ্রামের রুহুল আমিন এবার তিন বিঘা জমিতে পটল লাগিয়েছিলেন। নিয়ে এসেছেন ২ মণ পটল। বিক্রি করেছেন ৪৭ টাকা দরে। গত সপ্তাহে তিন মণ আনেন হাটে, তখন দাম পেয়েছেন ৪২ টাকা করে।

তিনি বলেন, বৃষ্টির আগে এক সপ্তাহে প্রায় ৩০ মণ পটল তুলতে পেরেছিলেন। কিন্তু পরে বৃষ্টির কারণে অনেক গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। এখন ২-৩ মণের বেশি তোলা যাচ্ছে না। আবহাওয়া খুব ভালো হলে প্রতি বিঘায় সপ্তাহে কমপক্ষে ১০ মণ পটল তোলা যায়। তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে এবার আগাম সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

আগামী শীত মৌসুমকে সামনে রেখে জমি প্রস্তুত করছি। ২ বিঘা জমিতে উচ্ছে, এক বিঘায় মুলা লাগাবেন বলে জানান। পটল আর শিম চাষ করেছিলেন ১০ কাঠা করে জমিতে, বৃষ্টিতে পুরোটাই শেষ হয়ে গেছে।

বারীনগর হাটে বেগুন, মুলা, পটল, কাঁকরোল, লাউ, কচুরমুখি আর শিম আনেন কৃষকরা। বেগুন বিক্রি হয়েছে ৯০-১৩০ টাকা, মুলা ৪৫-৫২ টাকা, পটল বিক্রি হয়েছে ৪০-৪২ টাকা দরে, কাঁকরোল ৪০-৪৫ টাকা, শিম ১৫০-১৬০ টাকা, কচুরমুখি ২২-২৫ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৩৫-৪০ টাকা।

বারীনগর হাটে বিভিন্ন পাইকারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন মথুরাপুর গ্রামের আব্দুস সবুর। তিনি বলেন, এই হাট থেকে গন্তব্যে পাঠাতে কেজিপ্রতি সবজির খরচ ৬ থেকে ৮ টাকা। সেক্ষেত্রে লাউয়ের জন্য একটু বেশি খরচ হয়। কেননা লাউ প্যাকেটজাত করতে ভালো ব্যাগ প্রয়োজন হয়।

দৌলতদিহি গ্রামের বাসিন্দা ও সবজির ব্যাপারী আতিয়ার রহমান বলেন, ৫ আগস্টের আগে বেশ কয়েক স্থানে স্থানীয় মাস্তানদের চাঁদা দিতে হতো। এখন অবশ্য সেটি দিতে হয় না। কিন্তু ধরেন যাত্রাবাড়ী নিয়ে যাব। সেখানে গাড়ি পার্কিং বাবদ দিতে হয় ২০০ টাকা, পুলিশকে দেওয়া লাগে ৫০ টাকা, নড়াইল সড়কে ভাটিয়াপাড়ায় পুলিশ থাকলে ১০০ টাকা, বাবুবাজার বাদামতলী ব্রিজের নিচে পুলিশকে ১০০ টাকা দেওয়া লাগে। আগে যখন গাবতলী হয়ে যাওয়া লাগতো, তখন সেখানে দেওয়া লাগতো ৫০ টাকা আর বাবুবাজার ব্রিজের কাছে মাস্তান, মাদকাসক্তরা অস্ত্র ঠেকিয়ে কাছে যা থাকতো নিয়ে যেতো। আবার গাড়ি জ্যামে আটকালে তারা উপরে উঠে হয়তো এক বস্তা নামিয়ে নিলো।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ী) উপ-পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে আগাম সবজি চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবার উৎপাদন কম হয়েছে।

এখন বৃষ্টি কমে গেছে। কৃষকরা শীত মৌসুমকে সামনে রেখে নতুন করে সবজি চাষে নিয়োজিত হয়েছেন। আগামী ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে বাজারে ফুলকপি, বাঁধাকপি, পালংশাক, লালশাক এবং লতাজাতীয় সবজি (শিম, উচ্ছে) আসবে। তখন আবারও পরিস্থিতি স্বাভাবিক আসবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এবার বৃষ্টিতে ৩০৫০ হেক্টর সবজি ক্ষেতের মধ্যে প্রায় ৫৬১ হেক্টর জমির সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।