পেকিন হাঁস পালন করে স্বাবলম্বী চুয়াডাঙ্গার গ্রামীণ খামারীরা

0
ছবি: সংগৃহীত।

চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা ॥ দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন মাটির বুকে বিছিয়ে আছে এক টুকরো সাদা মেঘের ভেলা। চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার গ্রামগুলোতে এখন আর সাধারণ হাঁস নয়, দেখা মিলছে সাদা ধবধবে একঝাঁক পেকিন জাতের হাঁসের।

বিশ্বব্যাপী দ্রুত বর্ধনশীল এবং মাংস উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত এই জাতের হাঁস পালন করে চুয়াডাঙ্গার প্রান্তিক নারী ও পুরুষ খামারীরা অভাব জয় করেছেন। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং ওয়েভ ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে গ্রামীণ অর্থনীতিতে যোগ হয়েছে এক নতুন মাত্রা।

উপজেলার বিষ্ণুপুর ও গোবিন্দহুদা গ্রামের অন্তত ১৫ জন প্রান্তিক খামারী পেকিন হাঁস পালন করে আয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। পিকেএসএফ-এর ‘স্পেশাল প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় এবং ওয়েভ ফাউন্ডেশনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় গড়ে উঠেছে এসব খামার। এক সময় যারা কেবল গৃহস্থালির কাজেই সীমাবদ্ধ ছিলেন, সেই গ্রামীণ নারীরা আজ একেকজন সফল উদ্যোক্তা।

গোবিন্দহুদা স্কুলপাড়ার লতিফা খাতুন জানান, তিনি মাত্র ১৮ হাজার টাকা ব্যয় করে ৫২টি হাঁস নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। ইতিমধ্যে তিনি ৫০ হাজার টাকার হাঁস বিক্রি করেছেন। ঘরে থাকা বাকি হাঁসগুলো বিক্রি করে আরও ভালো লভ্যাংশ পাবেন বলে আশা করছেন। আগামীতে আরও বড় পরিসরে খামার করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

একই এলাকার কলুপাড়ার ডলি খাতুন বলেন, “ওয়েভ ফাউন্ডেশন থেকে আমি ৫০টি হাঁস পেয়েছিলাম। এর মধ্যে ২০টি হাঁস ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। বাকি ৩০টিও বিক্রির উপযোগী। আমাদের এলাকায় যে ৭ জন হাঁস পালন করেছেন, তারা সবাই লাভবান হয়ে সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন।”

ছবি: সংগৃহীত।

পেকিন হাঁসের এই সাফল্য শুধু গৃহিণীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, অনুপ্রাণিত করছে স্থানীয় তরুণ ও শিক্ষার্থীদেরও। বিষ্ণুপুর গ্রামের কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী জিহাদ পড়াশোনার পাশাপাশি এখন একজন সফল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা।

এছাড়া চিৎলা কবরস্থানপাড়ার তারা মনি ও আদুরী খাতুনের মতো অনেকেই এখন সফল খামারী। তারা জানান, মাত্র ৮০ থেকে ৯০ দিন লালন-পালন করলেই এই হাঁস বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে। বাজারে এর মাংসের চাহিদার পাশাপাশি দামও বেশ ভালো।

চুয়াডাঙ্গা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু সুফিয়ান খান জানান, “আমরা নির্বাচিত ১৫ জন খামারীকে ৫০টি করে হাঁসের বাচ্চা, মাচা তৈরির খরচ, খাবার, ভ্যাকসিন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়েছি। সঠিক ও আধুনিক তদারকির ফলে মাত্র ৩ মাসের মধ্যে একেকটি হাঁসের ওজন হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ কেজি। ভালো দাম পাওয়ায় খামারীরা দারুণ লাভবান হচ্ছেন।”

দামুড়হুদা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নীলিমা আক্তার হ্যাপি বলেন, “পিকেএসএফ ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের হাত ধরে চুয়াডাঙ্গার প্রান্তিক মানুষ এখন রঙিন আগামীর স্বপ্ন দেখছেন। গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে এই কর্মসূচির আওতায় আরও বেশি গৃহিণী ও যুব উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।” এই ধরনের উদ্যোগে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে সার্বিক ও সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

সঠিক প্রশিক্ষণ আর সামান্য আর্থিক সহায়তা পেলে যে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র আমূল বদলে যেতে পারে, চুয়াডাঙ্গার এই প্রান্তিক খামারীরা আজ তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।