পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা: ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সার্বজনীনতার আহ্বান

বাংলা বর্ষবরণ বিশেষ সংখ্যা

0

আমীন রুহুল-

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে এক অনন্য আনন্দের উপলক্ষ। এটি কেবল একটি তারিখের সূচনা নয়; বরং একটি সংস্কৃতি, একটি চেতনা এবং একটি সম্মিলিত পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ। ধর্ম, বর্ণ, পেশা—সব বিভাজন অতিক্রম করে এই দিনটি মানুষকে একত্রিত করে। আর এই উৎসবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে মঙ্গল শোভাযাত্রা, যা আজ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক সূত্রপাত ঘটে মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে। তখন কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে খাজনা আদায় সহজ করার জন্য হিজরি চান্দ্র সনের পরিবর্তে সৌরনির্ভর বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়। এর ফলে ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের সময়ের সামঞ্জস্য তৈরি হয়। ধীরে ধীরে এই প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ নেয়। চৈত্র মাসের শেষ দিনের পরদিন, অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল (বাংলাদেশে), নতুন বছর হিসেবে উদযাপিত হতে থাকে।

loksamaj issuসময়ের সঙ্গে সঙ্গে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে বাঙালির সার্বজনীন উৎসব। গ্রামগঞ্জে বৈশাখী মেলা, হালখাতা খোলা, পান্তা-ইলিশ খাওয়া, নাগরদোলা, লোকসংগীত—এসবের মধ্য দিয়ে মানুষ নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। শহরাঞ্চলে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো গান, নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি এবং নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বিশেষ করে ছায়ানটের আয়োজিত রমনার বটমূলে সূর্যোদয়ের সংগীতানুষ্ঠান এখন এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

এই পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সঙ্গে যে উপাদানটি আধুনিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত, তা হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা। এর সূচনা ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে। সে সময় দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপটে এই শোভাযাত্রা ছিল এক ধরনের প্রতিবাদ ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ভাষা। প্রথমদিকে এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। পরে ১৯৯৬ সালে এর নামকরণ করা হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’, যেখানে ‘মঙ্গল’ শব্দটি শুভ, কল্যাণ এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রধান আকর্ষণ হলো বিভিন্ন মুখোশ, প্রতীকী ভাস্কর্য, পাখি, প্রাণী ও লোকজ শিল্পের উপস্থাপন। এখানে বিশালাকৃতির বাঘ, হাতি, পেঁচা, রাক্ষস কিংবা লোককাহিনির চরিত্র তুলে ধরা হয়, যা সমাজের নানা অসঙ্গতি, অন্যায় ও অশুভ শক্তির প্রতীক। এই শোভাযাত্রা মূলত এক ধরনের দৃশ্যমান শিল্পকর্ম, যেখানে মানুষের আশা, প্রতিবাদ, আনন্দ ও স্বপ্ন একত্রে প্রকাশ পায়।

২০১৬ সালে ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে এই আয়োজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মর্যাদা লাভ করে এবং বিশ্ববাসীর কাছে বাঙালির সংস্কৃতি নতুনভাবে পরিচিত হয়। এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে, মঙ্গল শোভাযাত্রা শুধু একটি স্থানীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক সম্পদ।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই শোভাযাত্রার নাম ও প্রকৃতি নিয়ে কিছু বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ এর নাম বা কিছু প্রতীকের ধর্মীয় ব্যাখ্যা তুলে ধরে আপত্তি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে অনেকেই মনে করেন, এটি সম্পূর্ণরূপে একটি সাংস্কৃতিক ও অসাম্প্রদায়িক আয়োজন, যার সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাসের সম্পর্ক নেই। এই দ্বন্দ্ব থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার আলোচনা সামনে এসেছে, যেখানে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’-এর পরিবর্তে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নাম ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘মঙ্গল’ শব্দটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের একচেটিয়া সম্পদ নয়। এটি বাংলা ভাষার একটি সাধারণ শব্দ, যার অর্থ শুভ বা কল্যাণ। একইভাবে ‘বৈশাখী’ শব্দটিও বাংলা মাস বৈশাখ থেকে উদ্ভূত। অর্থাৎ, দুটি নামই মূলত ভাষা ও সংস্কৃতির অংশ, ধর্মীয় পরিচয়ের নয়। তাই নাম নিয়ে বিভাজন সৃষ্টি না করে এর অন্তর্নিহিত চেতনা—মানবতা, সৌন্দর্য ও সম্মিলিত আনন্দ—কে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সার্বজনীনতা। একজন মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান—সকলেই এই উৎসবে সমানভাবে অংশগ্রহণ করে। এখানে ধর্মীয় আচার নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐক্যই প্রধান। এই দিনটিতে মানুষ নতুন পোশাক পরে, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটায়, বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেয়। ব্যবসায়ীরা হালখাতা খুলে নতুন হিসাব শুরু করে, যা অর্থনৈতিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বর্তমান সময়ে যখন নানা কারণে সমাজে বিভাজন বাড়ছে, তখন পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের ঐক্যের বার্তা দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা আগে মানুষ, তারপর অন্য কোনো পরিচয়। এই উৎসব আমাদের শেখায়, আনন্দ ভাগ করে নিলে তা আরও বড় হয়, আর বিভাজন সৃষ্টি করলে তা ক্ষুদ্র হয়ে যায়।

সবশেষে বলা যায়, পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক উজ্জ্বল প্রতীক। নামের পরিবর্তন বা বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে এর মূল চেতনা—অশুভের বিরুদ্ধে শুভ, বিভাজনের বিরুদ্ধে ঐক্য এবং হতাশার বিরুদ্ধে আনন্দ—ধরে রাখা জরুরি। নাম ‘মঙ্গল’ হোক বা ‘বৈশাখী’, এটি কোনো একক ধর্মের নয়; এটি সমগ্র বাঙালির। এই উপলব্ধিই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে একটি আরও সহনশীল, সুন্দর ও ঐক্যবদ্ধ সমাজের দিকে।