শহীদ জিয়ার খাল খনন ছিল কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা ও দূরদর্শী উদ্যোগ

জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি ও ১৯ দফা কৃষি উন্নয়নে কিভাবে বাংলাদেশে সবুজ বিপ্লব ও খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি গড়ে তুলেছিল—তা বিশ্লেষণ।

0

শিকদার খালিদ : বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ হলেও বছরের একটি বড় অংশজুড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানির কারণে বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, আবার শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এই দ্বৈত সংকট বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য দীর্ঘদিনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচিকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন। তার এই উদ্যোগ ছিল মূলত পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচিকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন
খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিজেই হাতে কোদাল তুলে নিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহামান- সংগৃহীত ছবি

কৃষির প্রধান চ্যালেঞ্জ খাল ব্যবস্থার সংকট

বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো সেচ ব্যবস্থার দুর্বলতা। দেশের অসংখ্য খাল, বিল ও প্রাকৃতিক জলপথ দীর্ঘদিন অবহেলা, দখল ও পলি জমার কারণে নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে বর্ষার পানি দ্রুত নদী হয়ে সাগরে চলে যায়, অথচ শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা পানির অভাবে ফসল উৎপাদনে হিমশিম খায়।

এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি গ্রহণ করে ছিলেন দূরদর্শী জিয়াউর রহমান, যার মূল লক্ষ্য ছিল বর্ষার পানি সংরক্ষণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।

কৃষি উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন

খাল খনন কর্মসূচির ফলে দেশের বহু অঞ্চলে কৃষিজমিতে সেচের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। এক ফসলি জমি ধীরে ধীরে দুই বা তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং কৃষকের আয়ও বাড়তে থাকে। কৃষি খাতে এই পরিবর্তন পরবর্তী সময়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের ভিত্তি তৈরি করে।

পরিবেশ পানি ব্যবস্থাপনায় প্রভাব

খাল খনন কর্মসূচি শুধু কৃষি উৎপাদনেই নয়, পরিবেশ ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খালগুলোতে পানি সংরক্ষণের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমে এবং স্থানীয় জলাধারগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা হ্রাস, মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গ্রামীণ জনপদে একসময় খাল ছিল জীবন ও জীবিকার অপরিহার্য অংশ। সেই খাল পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে কৃষি, মৎস্য, পরিবহন ও ক্ষুদ্র অর্থনীতির একটি সমন্বিত চক্র পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় পানি সংরক্ষণের গুরুত্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এই প্রেক্ষাপটে খাল খনন ও পুনঃখননের ধারণা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে স্থানীয় জলাধার, খাল ও প্রাকৃতিক জলপথ পুনরুদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। কয়েক দশক আগে নেওয়া এই উদ্যোগ আজও একটি কার্যকর উন্নয়ন মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচিকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন
১৯৭৬ সালে যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী থেকে খাল খনন কর্মসূচির যাত্রা শুরু করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান- ফাইল ফটো

১৯ দফা কর্মসূচি কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের ভিত্তি

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে খাদ্যঘাটতি, বেকারত্ব এবং কৃষির দুর্বল অবকাঠামো দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এই বাস্তবতা থেকেই কৃষিকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনা হয়।

তার উন্নয়ন ভাবনায় উন্নত বীজ, সার বিতরণ, সহজ কৃষিঋণ, সেচ সম্প্রসারণ এবং কৃষককে উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। এর ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ধীরে ধীরে দেশে এক ধরনের “সবুজ বিপ্লব”-এর ভিত্তি গড়ে ওঠে।

খাল খনন কর্মসূচি এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করে তোলে। বহু এলাকায় এক ফসলি জমি বহুফসলি জমিতে রূপান্তরিত হয় এবং খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে।

ধারাবাহিক উন্নয়ন উদ্যোগ

খাল খনন ও কৃষি বিপ্লবের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কথা বলছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পিতার ফলপ্রসূ কর্মকাণ্ডগুলো বা কর্মসূচিগুলো তিনি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন।

বর্তমান সময়েও বাংলাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ে খাল পুনঃখনন, নদী খনন এবং পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় জলাধার পুনরুদ্ধার ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ অতীতের পানি ব্যবস্থাপনা দর্শনেরই একটি ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়।

এতে স্পষ্ট হয় যে, কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য খাল ও জলপথ পুনরুদ্ধারের ধারণা এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয়।

উপসংহার

বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ও পানি ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি একটি দূরদর্শী ও যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন।

বর্তমান জলবায়ু সংকট ও পানি ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই ধরনের উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। খাল ও জলপথ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে টেকসই কৃষি ও শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব—এটাই এই উন্নয়ন দর্শনের মূল শিক্ষা।