জিয়াউর রহমান: মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্রগঠন ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক প্রভাবশালী অধ্যায়

0

মাসুদ রানা বাবু

৩০ মে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি আলোচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এদিন স্মরণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে তিনি নিহত হন। তার মৃত্যু দেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। চার দশকেরও বেশি সময় পরও বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় তিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত।

মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান

২৫ মার্চ কাল রাতে ‘উই রিভোল্ট’ বলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন জিয়াউর রহমান। পর দিন ২৬ মার্চ প্রথমে প্রহরে বাঙালি জাতি ইথারের মাধ্যমে প্রথমবারের মত তাদের এই মহানায়কের কন্ঠ শুনতে পেয়েছিল। সেদিন ইথারের মাধ্যমে মহান স্বাধীনতার স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি একাধিক বিদেশি মিডিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে ইন্টারভিউ দেন, যা বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বে জনমত গড়ে উঠতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমে জিয়াউর রহমানের সাহসিকতাপূর্ণ অভিযানের বিবরণ প্রকাশিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে জেড ফোর্সের নেতৃত্ব দেন। তার নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন সামরিক অভিযান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য তাকে কুমিল্লায় সেনাবাহিনীর ব্রিগেড কমান্ডার নিয়োগ করে বাংলাদেশ সরকার। জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ পদে উন্নীত করা হয়। তিনি ব্রিগেডিয়ার এবং মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করে চিফ অব আর্মি স্টাফ নিযুক্ত হন।

রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উত্থান

স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে জিয়াউর রহমান জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর শাফায়েত জামিলের নেতৃত্বাধীন ঢাকা বিগ্রেডের সহায়তায় খালেদা মোশাররফ যখন এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান। তখন জিয়াউর রহমানকে পদত্যাগে বাধ্য করা এবং গৃহবন্দি করা হয়। ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাকে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসীন করেন। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দেশের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন।

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কালজয়ী দর্শনের প্রবক্তা জিয়াউর রহমান জাতির নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরেন। তিনি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ির গ্লানি মুছে আধুনিক ও সমৃদ্ধি এনে দিয়েছিলেন। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। কৃষিনির্ভর দেশের অর্থনীতিতে কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিয়াকনের মাধ্যমে কৃষিতে সবুজ বিপ্লব ঘটিয়ে দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেন। আজ নতুন করে তার দেখানো পথে খাল খনন কর্মসূচি থেকে শুরু হয়েছে।

তার ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ওপর গুরুত্বারোপ করে। তার শাসনামলে কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে আলোচিত হয়।

বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বিএনপির প্রতিষ্ঠা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের অন্যতম আলোচিত অবদান বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন।  তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারণ করেন এবং ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। জিয়াউর রহমান ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। বাকশালকে হটিয়ে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

পরবর্তীতে বিএনপি দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলে পরিণত হয় এবং বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। বর্তমানে দলটি বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি।

পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন দিগন্ত

জিয়াউর রহমানের সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নতুন মাত্রা লাভ করে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে তার উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য।

সৌদি আরবসহ মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুল পরিরমাণ বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। চীনের সাথে বাংলদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করেন। তার সময়ে পররাষ্ট্র নীতির সাফল্যে বাংলাদেশ শক্তিশালী জাপানকে হারিয়ে প্রথমবারের মত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন।

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে যে উদ্যোগ পরবর্তীতে সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে, সেই ধারণার অন্যতম প্রবক্তা হিসেবেও তাকে স্মরণ করা হয়।

সামরিক জীবন থেকে জাতীয় নেতৃত্ব

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা জিয়াউর রহমান ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে অংশ নেন। পরে স্বাধীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে সেনাপ্রধানের পদে উন্নীত হন।

সামরিক নেতৃত্ব থেকে জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বে উত্তরণ তার জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

কেন আজও আলোচনায় জিয়াউর রহমান?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানকে নিয়ে মূল্যায়ন ও বিতর্ক—দুই-ই রয়েছে। তবে সমর্থক ও অনুসারীদের কাছে তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং আধুনিক রাষ্ট্রগঠনের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব।

তার কর্মজীবন, রাজনৈতিক দর্শন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নানা উদ্যোগ নিয়ে গবেষণা, আলোচনা ও মূল্যায়ন আজও অব্যাহত রয়েছে।

স্মরণে এক প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে তার রাজনৈতিক সহকর্মী, সমর্থক এবং দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসে তার অবদান, ভূমিকা এবং উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।