দিল্লিতে নজিরবিহীন ছাত্র বিক্ষোভ: ব্যারিকেড ভেঙে সংসদের দোরগোড়ায় জনস্রোত

0
জল ও ভেজা কাপড় দিয়ে কাঁদানে গ্যাসের সেল নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছেন দুই আন্দোলনকারী ।। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর ও সংসদ ভবন সংলগ্ন পুরো এলাকা নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণদের নজিরবিহীন বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে।
সোমবার ভারতীয় সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই তিন স্তরের ব্যারিকেড, প্রায় তিন হাজার নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতি এবং ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখার পরও আন্দোলনকারীদের বিশাল জনস্রোত আটকাতে রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনী।

আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে সংসদ ভবনের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেলে পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সংসদ ভবন থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে বাস আড়াআড়ি করে রেখে পুলিশ তাঁদের রোখার চেষ্টা করে এবং পরবর্তীতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে। এতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী ও পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন।

ভারতের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সমর্থকদের বিক্ষোভে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ছেন আরএএফের এক সদস্য।। ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদে এবং ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের ডাক দেয় অনলাইনভিত্তিক যুব সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)।

এই ডাকের পাশাপাশি যন্তর মন্তরে টানা ২০ দিন ধরে অনশনরত প্রখ্যাত অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুককে গত ১৮ জুলাই ভোরে পুলিশ জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গেলে আন্দোলনের আগুনে নতুন মাত্রা যোগ হয়। ওয়াংচুকের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে রাজস্থান, উত্তর প্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা দিল্লিতে জড়ো হতে শুরু করেন।

‘নেতৃত্বহীন’ হিসেবে চিহ্নিত এই আন্দোলনকারীরা যন্তর মন্তর থেকে রাইসিনা মার্গ হয়ে হেঁটে সংসদের দিকে এগিয়ে যান। উত্তর প্রদেশের আজমগড় থেকে আসা পুলিশে চাকরিপ্রার্থী নীতীশ বলেন, “প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য সরকারকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।” পুলিশি বাধা সম্পর্কে তিনি জানান, “প্রথম ব্যারিকেড ভাঙার পর আমরা শুধু হেঁটে গেছি, কেউ আমাদের আটকায়নি।”

বিক্ষোভের চরম তীব্রতা এবং আন্দোলনকারীরা সংসদ ভবনের একদম কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় সরকারের নীতি-নির্ধারকরা তীব্র চাপের মুখে পড়েন। গোয়েন্দা তথ্যে লোকসমাগম বাড়ার খবর পেয়ে নয়াদিল্লির উপ–পুলিশ কমিশনার (ডিসিপি) শচীন শর্মার মাধ্যমে সিজেপি সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কেন্দ্র।

নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের দাবিতে অনশনরত সোনম ওয়াংচুককে পুলিশ তুলে নেওয়ার প্রতিবাদে এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ব্যারিকেডের সামনে পুলিশের মুখোমুখি বিক্ষোভকারীরা।। ছবি: সংগৃহীত
সিজেপি সদস্য সৌরভ দাস জানান, সরকার প্রথমে তাঁদের ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, পরবর্তীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং এরপর কেন্দ্রীয় সচিবের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তারা কেবল মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যের সঙ্গেই কথা বলবেন।

পরবর্তীতে সরকার নতি স্বীকার করে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডাকে আলোচনার দায়িত্ব দেয়। বৈঠক শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক্সে জানান, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং বিকেলে আন্দোলনকারীরা একটি লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে তিনি আন্দোলন তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে সংসদের ভেতরেও এনডিএ সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে রুদ্ধদ্বার আলোচনা চলে।

বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়ালও এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করেন। সরকারি সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক দলগুলোর মদদে বিক্ষোভস্থলে এত বিপুল মানুষ সংগৃহীত হয়েছিল, যার মধ্যে চন্দ্রশেখর আজাদের আজাদ সমাজ পার্টি (কাশিরাম), আম আদমি পার্টি ও সমাজবাদী পার্টির নাম উঠে এসেছে। বিশেষ করে রাজস্থান থেকে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ এই নজিরবিহীন বিক্ষোভে অংশ নেন।