ঈদের আগে গরু কেনাবেচায় বিধিনিষেধ আরোপ; — মুসলিম নয়, বিপাকে পড়লেন পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু গোপালকেরা

0
পশ্চিমবঙ্গে গবাদিপশু কেনাবেচায় কড়াকড়ি: ঈদুল আজহার আগে বিপাকে গ্রামীণ খামারিরা ।। প্রতীকী ছবি: এআই/লোকসমাজ

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় বসার মাত্র চার দিনের মাথায় গরু কেনাবেচার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বিজেপি সরকার। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত যাদের লক্ষ্য করে নেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা, তাদের চেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন রাজ্যের হিন্দু গোপালক ও কৃষকেরা। সিদ্ধান্তটি এখন বিজেপির ভেতরেও অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ১৩ মে জারি করা নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, সরকারি কয়েকটি দপ্তর থেকে গবাদিপশুর বয়স ও শারীরিক সক্ষমতার সনদ ছাড়া গরু কেনাবেচা করা যাবে না। পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক আগে জারি হওয়া এই নির্দেশিকার কারণে রাজ্যজুড়ে পশুর হাটে কার্যত স্থবিরতা নেমে এসেছে।

হিন্দু গোপালকেরা বিপদে:

উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায় বিজেপির সংখ্যালঘু সেলের অন্যতম সহসভাপতি ইউনুস আলী পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে গরু পালন করেন মূলত হিন্দু গোপালকেরা — বিশেষত ঘোষ সম্প্রদায়। তাঁরা গরু লালন-পালন করেন, দুধ বিক্রি করেন এবং একটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যগত কারণে বা অর্থের প্রয়োজনে গরু বিক্রি করে দেন। সেই গরু কেনেন মুসলিমরা। কিন্তু গরু পালনটা মুসলিমরা সাধারণত করেন না। এই বাস্তবতা না বুঝেই নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ইউনুস আলী আরও বলেন, হিন্দুরা গরু পালন বন্ধ করলে পশ্চিমবঙ্গে দুধ, ছানা ও মিষ্টির মতো দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার বড় ধাক্কা খাবে। শিল্পে অনুন্নত রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব হবে মারাত্মক।

বিষয়টি যে বিজেপিকে ‘শাঁখের করাতের’ মতো সংকটে ফেলেছে, তা স্বীকার করে বিজেপির এই নেতা বলেন, ‘বিষয়টা কিছুটা সমস্যা সৃষ্টি করেছে। তবে আশা করছি, ঈদুল আজহার আগেই দল এটা সামলে নেবে।’

গ্রামের নারীরা ক্যামেরার সামনে কাঁদতে কাঁদতে জানাচ্ছেন, বছরের এই সময়ে গরু বিক্রির অর্থ দিয়ে তাঁরা কৃষিঋণ ও মাইক্রোক্রেডিটের ধার মেটান। নিষেধাজ্ঞা না উঠলে আত্মহত্যা ছাড়া পথ নেই বলেও জানিয়েছেন অনেকে।

তৃণমূলের পাল্টা আক্রমণ:

পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস বিষয়টিকে হাতিয়ার করে মাঠে নেমেছে। তৃণমূল সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ক্ষমতায় আসার এক সপ্তাহ না পেরোতেই বিজেপি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ‘সাংঘাতিক আঘাত’ করেছে। গ্রামের পশুর হাটে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং ব্যবসা প্রায় বন্ধের মুখে।

মহুয়া মৈত্র বলেন, বিজেপি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে আঘাত করতে চেয়েছিল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এই ব্যবসার সঙ্গে ঘোষ, দাস-সহ জাতিধর্মনির্বিশেষে গরিব মানুষ জড়িত। ফলে চোট সবার গায়েই লাগছে।

মহুয়া আরও তুলে ধরেন, সংসদের প্রশ্নোত্তরে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ সালে ভারত গরুর মাংস রপ্তানি করে ৪০ হাজার কোটি টাকা বিদেশি মুদ্রা আয় করেছে। একই সময়ে মহিষের মাংস বিক্রির বড় করপোরেট সংস্থা অ্যালানা গ্রুপ বিজেপির তহবিলে ৩০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন করেন, করপোরেট অনুদান বা বৈদেশিক মুদ্রা আয় গ্রহণযোগ্য হলে গরিব মানুষের ব্যবসা বন্ধ করার যুক্তি কী।

সমাধানের আশা:

বিজেপি নেতা ইউনুস আলী বলেন, দল বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং তিনি আশাবাদী যে একটি সমাধান বেরোবে। তিনি বলেন, বিজেপি হিন্দুদের ভোটে ক্ষমতায় এসেছে এবং সেই ভোটারদের কাছে একটি বার্তা দিতে গিয়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এমন ব্যক্তি নন যে ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে বিপদে ফেলবেন।