ঢামেকের কেবিন ১০৩-এ চলছে চিকিৎসা: কেমন আছেন পাঁচ শতাধিক নাটকের জনপ্রিয় অভিনেতা রিফাত চৌধুরী?

0
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেবিনে চিকিৎসাধীন আছেন পাঁচ শতাধিক নাটকের অভিনেতা ও কবি রিফাত চৌধুরী। জীবনের এই পর্যায়ে এসে সরকারি সহায়তা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই গুণী শিল্পী।। ছবি: সংগৃহীত

শারীরিক নানা জটিলতা ও মারাত্মক অসুস্থতা নিয়ে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি হন দেশের বিশিষ্ট কবি ও জনপ্রিয় জ্যেষ্ঠ অভিনেতা রিফাত চৌধুরী। হাসপাতালে ভর্তির শুরুর প্রথম কয়েক দিন জায়গা না পেয়ে তাঁকে থাকতে হয়েছিল সাধারণ মেঝেই।

পরবর্তীতে তাঁর এই আশঙ্কাজনক শারীরিক অবস্থা ও অবহেলার খবর গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে আসে এবং দুই দিন আগে তাঁকে একটি কেবিন বরাদ্দ দেওয়া হয়। বর্তমানে ঢামেকের নতুন ভবনের দশম তলার ১০৩ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এই অভিনেতা।

দীর্ঘ তিন বছর ধরে জটিল শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন ৬৫ বছর বয়সী এই গুণী শিল্পী। বর্তমানে তিনি টানা দশ কদমও সঠিকভাবে হাঁটতে পারেন না; হাঁটতে গেলে হঠাৎ করেই তাঁর পা অবশ হয়ে আসে। এর মাঝে কয়েকবার মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারানোর ঘটনাও ঘটেছে।

সম্প্রতি একটি নাটকের দৃশ্যধারণের কাজ করছিলেন তিনি, শুটিং চলাকালেই সেটে আকস্মিকভাবে মাথা ঘুরে পড়ে যান। এরপরই চিকিৎসার্থে তাঁকে তড়িঘড়ি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে ঢামেক হাসপাতালে বিভিন্ন বিভাগের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসকেরা সেসব পরীক্ষার রিপোর্ট পর্যালোচনা করছেন এবং এর পরেই তাঁর মূল চিকিৎসাপদ্ধতি ও ওষুধ শুরু হবে।

নিজের বর্তমান শারীরিক অবস্থা ও সার্বিক পরিবেশ নিয়ে রিফাত চৌধুরী জানান, ঢামেক কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকেরা নিয়মিত এসে তাঁর খবরাখবর নিচ্ছেন। হাসপাতালে ভর্তির শুরুতে সুচিকিৎসা পাওয়া নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কায় থাকলেও গণমাধ্যমের কারণে কেবিন সুবিধা এবং চিকিৎসা পেতে সুবিধা হয়েছে বলে তিনি জানান।

একই সঙ্গে দেশ-বিদেশের অগণিত ভক্ত ও মানুষের ভালোবাসায় তিনি গভীরভাবে অভিভূত। কথাবার্তা ও আড্ডার মাঝেই হাসপাতালের নার্স, প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ইলেকট্রিশিয়ান—সবাই বারবার তাঁর খোঁজ নিতে আসছিলেন। সবাইকে আশ্বস্ত করে রিফাত চৌধুরীর স্পষ্ট জবাব ছিল, ‘আরে আপনারা এত উদ্গ্রীব হবেন না, আমি ভালো আছি।’

দীর্ঘ চার দশকের অভিনয় ক্যারিয়ারে প্রায় পাঁচ শতাধিক নাটকে অভিনয় করে দেশের কোটি কোটি দর্শকের হৃদয় জয় করেছেন রিফাত চৌধুরী। ‘সিক্সটি নাইন’ নাটকে তাঁর কালজয়ী ‘জাতীয় কাকা’ চরিত্রটি ছাড়াও ‘হাউসফুল’, ‘এইম ইন লাইফ’, ‘পাটিগণিত’, ‘ফোর টোয়েন্টি’, ‘বনমানুষ’, ‘বাইসাইকেল’, ‘ক্যারাম’ ও ‘মুড়ির টিন’-এর মতো বহু জনপ্রিয় নাটকে তাঁর দুর্দান্ত ও স্বাভাবিক অভিনয় দারুণ প্রশংসিত হয়েছে। তবে এতো আকাশচুম্বী পরিচিতি পাওয়া সত্ত্বেও তিনি খোলাখুলি জানান, তিনি কখনো পেশাদার অভিনেতা হতে চাননি।

মূলত কবিতার টান ও কবি পরিচয় নিয়ে বাঁচতে চাওয়া রিফাত চৌধুরী স্রেফ জীবিকার তাগিদে এবং বন্ধুদের আড্ডার এক প্রস্তাবে মজা করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। পেশাগত বাধ্যবাধকতায় সেখানে টিকে গেলেও তাঁর মূল টান লেখালেখির দিকেই। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘আলিঙ্গনের নাম’-সহ এ পর্যন্ত তাঁর মোট ২৯টি বই প্রকাশিত হয়েছে। লেখালেখিতেই তিনি জীবনের আসল তৃপ্তি খুঁজে পান বলে জানান।

৬৫ বছর বয়সকে জীবনের ‘বোনাস সময়’ হিসেবে দেখছেন এই প্রবীণ শিল্পী। ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর অনীহা প্রকাশ করে তিনি জানান, সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরলে তিনি আর অভিনয়ে ফিরবেন না, তবে নাট্য পরিচালনা করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।

চিকিৎসা ও ওষুধপত্রের পেছনে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ হলেও সরকারের কাছে কোনো প্রকার আর্থিক সাহায্য বা অনুদান চাইতে চরম অস্বীকৃতি জানান তিনি। কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে রিফাত চৌধুরী বলেন, এনআইডি, পাসপোর্ট বা হোল্ডিং নম্বর না থাকায় তিনি মূলত এক ‘অনাগরিক’; আর তাই কোনো অনাগরিকের রাষ্ট্র বা সরকারের কাছে সাহায্য কিংবা মৌলিক সুবিধা দাবি করার যৌক্তিকতা তিনি দেখেন না। সাক্ষাৎকার শেষে বিদায়লগ্নে দীর্ঘ অভিনয় ও সাহিত্যজীবনে প্রযোজক ও প্রকাশকদের কাছ থেকে প্রাপ্য পাওনা না পাওয়ার গভীর আক্ষেপ ব্যক্ত করেন এই গুণী ব্যক্তিত্ব।