গাজায় কাগজের যুদ্ধবিরতির আট মাস: ধ্বংসস্তূপে পড়ে আছে লাশ, তাঁবুতে শিশুদের কামড়াচ্ছে ইঁদুর

0
গাজায় নামেমাত্র যুদ্ধবিরতির মাঝে বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে আশ্রয়শিবির; প্লাস্টিকের বোতল ও পাত্র দিয়ে তাঁবুর ভেতর থেকে পানি সেচার চেষ্টা করছে কয়েকটি শিশু।। ছবি: সংগৃহীত
গত বছরের ১১ অক্টোবর দুই ধাপের যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার আট মাসেরও বেশি সময় পার হয়েছে কিন্তু ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় কাটেনি বিপজ্জনক অচলাবস্থা। মার্কিন সমর্থনে সমঝোতা হওয়া গাজার সাধারণ মানুষের জীবনে প্রকৃত শান্তি আনতে পারেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা চালালেও সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গাজাবাসী একে আরেকটি ব্যর্থ ও অকার্যকর চুক্তি বলে বর্ণনা করেছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইসরায়েল বিদেশি সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে গাজায় প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে।

চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে চলতি বছরের ২১ জুন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় গাজায় নতুন করে অন্তত ১ হাজার ৫৯ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৪২৯ জন আহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, গত অক্টোবর থেকে গাজায় গড়ে প্রতিদিন একজন করে শিশু নিহত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতিসংঘ, যদিও ইসরায়েল এই অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর বাহিনীকে গাজার ৭০ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর বাইরেও সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।

অন্যদিকে হামাসও অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিজেদের পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে কাগজে-কলমে টেকনোক্র্যাট কমিটি বা আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে এখনো তার কোনো কার্যকর রূপরেখা দাঁড়ায়নি।

যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার পাশাপাশি গাজার ১৯ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনে যুক্ত হয়েছে নতুন এক সংকট। বাতাস চলাচলের অনুপযোগী তাঁবুতে বসবাসকারী ৮০ শতাংশের বেশি মানুষের মধ্যে চর্মরোগ ও পরজীবী সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইঁদুর, তেলাপোকা ও বেজির চরম উপদ্রব— এসব প্রাণী তাঁবুর কাপড় ছিঁড়ে ভেতরে ঢুকে ঘুমন্ত শিশু ও নবজাতকদের কামড়ে দিচ্ছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এনজিও ‘মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টিনিয়ানস’ (এমএপি)-এর জরুরি কার্যক্রমের প্রধান সালি সালেহ জানিয়েছেন, বহু অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের ইঁদুরের কামড়ের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ইঁদুরের দল ত্রাণসামগ্রীও কেটে নষ্ট করে ফেলছে, ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে খাবার ফেলে দিচ্ছে অথবা তা তাঁবুর ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখছে।

গাজা সিটির পানি সরবরাহ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, তীব্র শৌচাগার সংকটের কারণে বাসিন্দারা মাটিতে অস্থায়ী গর্ত খুঁড়তে বাধ্য হচ্ছেন, যা ভূগর্ভস্থ পানির উৎসকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।

ইসরায়েল সরকার জাতিসংঘের সহযোগিতায় গাজায় কীটপতঙ্গ ও ইঁদুর দমন অভিযান শুরুর দাবি করলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। জেনারেটর ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ইসরায়েলি বিধিনিষেধ এবং ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলার কারণে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ পরিস্থিতি দিন দিন আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।