খুলনা জেলা প্রশাসনের ‘বদ্ধ জলাশয়’ অজুহাতে ১ লাখ টাকায় নদী ইজারা

0
খুলনা বটিয়াঘাটার আমতলা নদীতে বাঁশের নেটপাটা ও বাঁশ দিয়ে আড়াআড়ি বেড়া দিয়ে ইজারাদারদের তৈরি কৃত্রিম বাধা।। ছবি: সংগৃহীত

খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার হাজার হাজার মানুষের প্রাণরেখা হিসেবে পরিচিত ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ঐতিহ্যবাহী ‘আমতলা নদী’ মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

নদীকে কাগজে-কলমে ‘বদ্ধ জলাশয়’ বানিয়ে ২০২৩ সালে গঙ্গারামপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ৬ বছরের জন্য বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘ ১২ বছর পর নদীটি আবারও সাধারণ কৃষক ও মৎস্যজীবীদের হাতছাড়া হয়ে ইজারাদারদের কব্জায় চলে গেছে।

ইজারা দেওয়ার পর থেকেই নদীতে বাঁশের নেটপাটা ও আড়াআড়ি বেড়া দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে বর্ষা মৌসুমে আমনের ক্ষেতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে কৃষির ক্ষতি হচ্ছে, আবার শুষ্ক মৌসুমে স্লুইসগেট দিয়ে লোনা পানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

ফলে চরম হুমকির মুখে পড়েছে আমতলা নদীর দুই পাড়ের ১৬টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা এবং ৩৭টি গ্রামের ৪৫ হাজার একর কৃষিজমির স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা।

নদীটি ১৯৮৫ সাল থেকে জলমহাল হিসেবে ইজারা দেওয়া শুরু হলেও কৃষকদের লাগাতার আন্দোলন ও সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশে দীর্ঘদিন উন্মুক্ত ছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালে মামলা প্রত্যাহার করা হলে ২০২৩ সালে বিগত সরকারের আমলে এটিকে পুনরায় বন্দোবস্ত দেওয়া হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কাগজে ইজারাদার সুধীর সরদারের নাম থাকলেও নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হারুনুর রশিদ। নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও এই অবৈধ ইজারা বাতিল না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন এবং ২০১৯ সালের হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী নদীকে মুক্ত ও ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে ঘোষণার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, তা উপেক্ষা করেই এ ইজারা বলবৎ রয়েছে।

সম্প্রতি অতিবৃষ্টির ফলে পানি আটকে এলাকা প্লাবিত হলে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা নেটপাটা ভেঙে ফেলে মাছ ধরা শুরু করেন। নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাহমান নদীকে কৃত্রিমভাবে আটকে ‘বদ্ধ জলাশয়’ দেখিয়ে ইজারা দেওয়া একটি বেআইনি প্রশাসনিক কৌশল। অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে নদীর অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব নয়।