কোরবানির গরু কাটতে বিমানে ঢাকায় আসেন সৈয়দপুরের শতাধিক কসাই

0
‘চামড়া ছাড়ানো থেকে মাংস কাটা—সবই শিল্প’: ঢাকার সাবেক মেয়রের বাড়িতেও কাজ করেছেন ছোটু নাদিম ।। ছবি: সংগৃহীত

ঈদুল আজহার সময় ঘনিয়ে এলেই সৈয়দপুরের মাংসপট্টিতে শুরু হয় অন্য রকম ব্যস্ততা। হাটের কোলাহলের পাশাপাশি বাড়তে থাকে কসাইদের ঢাকামুখী প্রস্তুতি। প্রতিবছরের মতো এবারও নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে শতাধিক কসাই রাজধানীতে যাবেন কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার কাজে। কেউ যাবেন বাসে, কেউ ট্রেনে, আর অনেকে সুলভ ভাড়ার সুযোগ নিয়ে যাবেন বিমানে।

এই দলের অন্যতম পরিচিত মুখ নাদিম কোরাইশি, এলাকায় যিনি ‘ছোটু নাদিম’ নামেই পরিচিত। বয়স ৫৫। সৈয়দপুর মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তিনি। এবার ঈদের আগের দিন ১০ জনের একটি দল নিয়ে বিমানে ঢাকায় যাবেন। টিকিটও কেনা হয়ে গেছে।

ছোটু নাদিম বলেন, তাঁদের বাপ-দাদারাও কোরবানির ঈদে ঢাকায় কাজ করতে যেতেন। এখনো মানুষ তাঁদের ডাকেন। চামড়া ছাড়ানো থেকে শুরু করে মাংস টুকরো করা, হাড় আলাদা করা — প্রতিটি কাজেই দক্ষতা লাগে। ছোটবেলা থেকেই এসব কাজ শিখে বড় হয়েছেন তাঁরা।

ছোটু নাদিমসহ এই কসাইদের বড় একটি অংশ বিহারি সম্প্রদায়ের। বংশপরম্পরায় মাংস ব্যবসা ও কসাইয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত তাঁরা। পশু জবাই ও মাংস কাটায় তাঁদের বিশেষ দক্ষতা রয়েছে, ঢাকায় যে কারণে তাঁদের আলাদা চাহিদা তৈরি হয়েছে।

ছোটু নাদিমের মতে, কসাইয়ের কাজটিও একধরনের শিল্প। নিখুঁতভাবে পশু জবাই, চামড়া অক্ষত রেখে ছাড়ানো কিংবা সুনিপুণভাবে মাংস ভাগ করা — প্রতিটিতেই প্রয়োজন দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা।

বাবার হাত ধরে প্রায় ২০ বছর আগে এ পেশায় আসেন ছোটু। তখন থেকে প্রতি ঈদেই ঢাকায় আসছেন। রাজধানীর অভিজাত অনেক পরিবারের বাড়িতে কাজ করেছেন। একসময় ঢাকার সাবেক মেয়র ও মন্ত্রী সাদেক হোসেন খোকার বাসায়ও কোরবানির গরু জবাই করেছেন। থাকার ব্যবস্থাও করে দিতেন খোকা, জানান ছোটু।

গত বছর চার সহযোগী নিয়ে ঢাকায় ১২টি গরু জবাই করেছিলেন তিনি। মোট আয় হয়েছিল প্রায় ২ লাখ টাকা। প্রতিজন সহযোগীকে ২০ হাজার টাকা করে দেন, যাতায়াত খরচও নিজেই বহন করেন। এবার দল বেড়ে হয়েছে ১০ জন। দলটিকে তিন ভাগে ভাগ করে কাজ করার পরিকল্পনা করেছেন তিনি। ইতিমধ্যে অনেক পরিবার বুকিং দিয়ে রেখেছে।

ছোটু নাদিমের মতো সৈয়দপুর পৌর মাংসহাটির কসাই ফজলে রাব্বি, নওশাদ আলী ও খয়রাত হোসেনও পৃথক দল নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন। স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সি থেকে বিমান টিকিটও কিনেছেন। ফজলে রাব্বি জানান, ঈদের আগে ঢাকাগামী বিমানে যাত্রী কম থাকে, কারণ তখন সবাই ঢাকা থেকে সৈয়দপুরে ফেরেন। এ সুযোগে বিমান কোম্পানিগুলো ভাড়া কমিয়ে দেয়, যা কাজে লাগান তাঁরা।

বাড়তি আয়ের টানেই ঈদের আনন্দ ছেড়ে ঢাকায় যান কসাইরা। কসাই মো. মিন্টু বলেন, সবাই পরিবার নিয়ে ঈদ করতে চায়, কিন্তু তাঁরা বাড়তি আয়ের আশায় ঢাকায় যান। সৈয়দপুরে ১ লাখ টাকা দামের একটি গরু জবাই করলে সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা পাওয়া যায়। অথচ ঢাকায় একই কাজে মেলে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। একজন অভিজ্ঞ কসাই ঈদের তিন দিনে অন্তত ১০টি গরুর মাংস কাটতে পারেন।

ঢাকার অনেক পরিবার এখন সৈয়দপুরের কসাইদের নাম ধরেই চেনেন, মোবাইল নম্বরও সংরক্ষণ করে রাখেন। কারখানা গেট বাজারের কসাই মোস্তাকিম জানান, তাঁর বাবা আগে গুলশান-বনানীর বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্টে কাজ করতেন। তিন বছর ধরে বাবার দেওয়া সেই ঠিকানায়ই যাচ্ছেন তিনি। ওই অ্যাপার্টমেন্টের গ্যারেজেই থাকার ব্যবস্থা হয় তাঁদের।

ঈদ শেষে আবার কেউ বিমানে, কেউ বাস বা ট্রেনে করে ফিরে আসেন সৈয়দপুরে। শুরু হয় পুরোনো জীবনের চেনা ব্যস্ততা।