কাঁচা মাছ খেয়ে এক মাস সাগরে ভেসে থাকা শ্রীলঙ্কান বাবা-ছেলে পুলিশের হেফাজতে

0
উদ্ধার হওয়া শ্রীলঙ্কান দুই নাগরিক সম্পর্কে বাবা ও ছেলে।। ছবি: সংগৃহীত

বঙ্গোপসাগরে ইঞ্জিন বিকল হয়ে দীর্ঘ ৩৬ দিন ভাসমান অবস্থায় জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার পর অবশেষে বাংলাদেশের কক্সবাজার উপকূল থেকে অলৌকিকভাবে উদ্ধার হয়েছেন শ্রীলঙ্কার দুই জেলে। টানা ২৯ দিন সমুদ্রের কাঁচা মাছ খেয়ে প্রাণ বাঁচানো এই দুই বিদেশি নাগরিককে বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালী থানা-পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া শ্রীলঙ্কান দুই জেলে সম্পর্কে বাবা-ছেলে। তাঁরা হলেন শ্রীলঙ্কার ডেভিনুওয়ারা এলাকার রুরাল হসপিটাল রোডের বাসিন্দা এস এইচ চামিন্দা (বাবা) এবং তাঁর ছেলে সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং।

বৈরী আবহাওয়া ও ইঞ্জিন বিকল
পুলিশ, উদ্ধারকারী ও স্থানীয় সূত্র জানা যায়, প্রায় এক মাস আগে শ্রীলঙ্কার উপকূল থেকে ৪ জন জেলে একটি ছোট ট্রলারে করে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। যাত্রার শুরুতেই সাগরে তীব্র বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে তাঁদের ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। ট্রলারটি ভাসতে ভাসতে আন্দামান সাগরের দিকে চলে যায়।

ঘটনার তিন দিনের মাথায় অন্য একটি নৌকার দেখা মিললে সঙ্গে থাকা অপর দুই জেলে নিজ দেশে ফিরে যান। তবে ট্রলারটি নিজেদের হওয়ায় বাবা ও ছেলে অচল ট্রলারটিতেই অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নেন।

দস্যুতা ও খাদ্য সংকট
দুর্ভোগের এখানেই শেষ ছিল না। ইঞ্জিন বিকল হওয়ার সাত-আট দিন পর আন্দামান সাগর এলাকায় মিয়ানমারের কিছু দুর্বৃত্ত তাঁদের ট্রলারে উঠে পড়ে এবং ট্রলারে থাকা দুরবিন, ক্যামেরাসহ যাবতীয় মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।

এদিকে সমুদ্রযাত্রার মাত্র সাত দিনের মাথায় তাঁদের ট্রলারে থাকা সব খাবার ও পানীয় জল ফুরিয়ে যায়। খাবার না থাকায় চরম খাদ্যাভাবে পড়েন এই বাবা-ছেলে। বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে তাঁরা বড়শির টোপ হিসেবে সঙ্গে আনা অনুষঙ্গ এবং সমুদ্র থেকে ধরা কাঁচা মাছ খেয়ে ক্ষুধা মেটাতে থাকেন। এভাবে টানা ২৯ দিন সাগরে ভেসে ভেসে শুধু কাঁচা মাছ খেয়েই অলৌকিকভাবে জীবন টিকিয়ে রাখেন তাঁরা।

এই নৌকা নিয়ে ৩৬ দিন আগে মাছ ধরতে সাগরে গিয়েছিলেন তাঁরা। এরপর ইঞ্জিন বিকল হয়ে ভাসতে ভাসতে চলে আসেন বাংলাদেশের উপকূলে ।। ছবি: সংগৃহীত

যেভাবে উদ্ধার হলেন
গত বুধবার রাতে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা ও ট্রলারমালিক জিয়াউর রহমান গভীর সাগর থেকে মাছ ধরে মহেশখালী উপকূলে ফিরছিলেন। এ সময় সাগরের বুকে একটি ট্রলার অচল অবস্থায় ভাসতে দেখে তারা এগিয়ে যান।

ট্রলারের কাছে গিয়ে দেখেন, ভেতরের দুজন মানুষ শারীরিক দুর্বলতায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের শারীরিক অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক। তারা হাতজোড় করে বাঁচার আকুতি জানান।

পরিস্থিতি দেখে জিয়াউর রহমান ও তাঁর সহকর্মীরা মানবিক দিক বিবেচনা করে দ্রুত দুই শ্রীলঙ্কানকে নিজেদের ট্রলারে তুলে নেন এবং অচল ট্রলারটি রশি দিয়ে বেঁধে টেনে এনে শুক্রবার রাতে মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের তাজিয়াকাটা ঘাটে পৌঁছান। প্রাথমিক চিকিৎসার পর জিয়াউর রহমানের আত্মীয় দুবাইপ্রবাসী এক দোভাষীর সহায়তায় তাঁদের শ্রীলঙ্কান পরিচয় ও ঘটনার পুরো বিবরণ নিশ্চিত হওয়া যায়।

দুই জেলেকে উদ্ধারকারী ট্রলারের মালিক জিয়াউর রহমান বলেন, দুই শ্রীলঙ্কান বারবার দেশে ফিরে যাওয়ার আকুতি করছেন। তাঁরা নৌকাটিকেও তাঁদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চান। কিন্তু মহেশখালী থেকে উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে এই ছোট্ট নৌকায় এত দূর যাওয়া সম্ভব নয়। এ বিষয়ে প্রশাসন পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছে।

বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে ও হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া
খবর পেয়ে শনিবার রাতে মহেশখালী থানা-পুলিশ উপকূল থেকে ওই দুই শ্রীলঙ্কান নাগরিককে নিজেদের আইনি হেফাজতে নেয় এবং তাঁদের ব্যবহৃত অচল ট্রলারটি জব্দ করে।

মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুস সুলতান বলেন, ‘দুই জেলের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমাদের ঊর্ধ্বতন অফিসারদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আজকের মধ্যেই একটা সমাধান হবে বলে আশা করছি। দুই জেলের নৌকাটিও আমরা জব্দ করেছি।’