করোনা পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তায় ত্রান বিতরণে সমন্বিত উদ্যোগের দাবি যশোরের বিশিষ্টজনদের

0

আকরামুজ্জামান ॥ করোনা সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতিতে অসহায় দরিদ্রদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ত্রান বিতরণে এই মূহুর্তে সমন্বিত উদ্যোগ ও প্রস্তুতি গ্রহণ অত্যান্ত জরুরি বলে মত দিয়েছেন যশোরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তারা বলেছেন দুর্যোগ পরিস্থিতিতে দম্ভ, অহঙ্কার, প্রতিহিংসা পরিহার করে সকল রাজনৈতিক দলসহ যশোরের সর্বস্তরের মানুষকে এক কাতারে সামিল হতে হবে। অসহায়-দরিদ্র, অস্বচ্ছল প্রতিটি পরিবারের ঘরে যাতে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে যায় সে বিষয়ে সবাইকে এক হয়ে ভূমিকা পালন করতে হবে।
এ বিষয়ে যশোর জেলা বিএনপির আহবায়ক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক নার্গিস বেগম বলেন, পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাই সময় এসেছে এখন সকলের এক হওয়ার। তিনি বলেন, এই মূহুর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হচ্ছে এ দুর্যোগ মোকাবেলায় সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ গ্রহনের। সকল রাজনৈতিক দল, ছাত্র-শিক্ষক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, সামাজিক শক্তিসহ সকলকে এক হয়ে এই সঙ্কট মোকাবেলায় কাজ করতে হবে। অধ্যাপক নার্গিস বেগম বলেন, বৈশিক এ পরিস্থিতিতে যশোরে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু কিছু এলাকায় খাদ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সমন্বয়হীনতার কারণে তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। স্বচ্ছতা ও সম বন্টনের অভাবে অধিকাংশ মানুষই এ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই প্রতিটি অসহায় মানুষ যাতে খাদ্য সহায়তা পায় সেজন্য অসহায়-দরিদ্রদের তালিকা প্রস্তুতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে সামনে এসব মানুষকে সামনে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। ডা. আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজ যশোরের সাবেক অধ্যক্ষ সুলতান আহমেদ বলেন, ত্রান বিতরণে সমন্বয়হীনতার কারণে যশোরের অধিকাংশ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে আমি এমপি, মেয়র ও জেলা প্রশাসকের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। আমার এলাকার অনেকে দুই থেকে তিনবার করে ত্রান পেয়েছেন। আবার অনেকেই এখনো পর্যন্ত কিছুই পাননি। পাওয়ার চেয়ে না পাওয়ার সংখ্যাটাই বেশি। তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতি যেভাবে জটিল দিকে এগুচ্ছে সে হিসেবে এখনই যদি অসহায়-দুস্থ ও মধ্যবিত্ত শ্রেনীর কিছু লোক যারা কর্ম হারায়ে বেকার হয়ে গরীবের তালিকায় চলে গেছে তাদের তালিকা প্রস্তুত করে খাদ্য নিরাপত্তা না দেওয়া যায় তাহলে সঙ্কট আরও বড় আকার ধারণ করবে।
সনাক যশোরের সাবেক সভাপতি শিক্ষাবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে এমন কিছু মানুষ যারা কর্মহীন পড়েছেন, যারা মানুষের কাছে হাত পাততে লজ্জা পান তাদের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার জন্য। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে কীনা সেটি দেখার বিষয়। আমার জানামতে এই যশোর শহরের অসংখ্য মানুষ আছেন। যাদের ঘরে খাবার নেই। তারা কাউকে বলতে পারছেন না। এসব মানুষ কষ্টে আছেন। তাই সমন্বিতভাবে এসব মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপি বা অন্য রাজনৈতিক দলের লোকেরা যে ত্রান বা সাহায্য দিচ্ছে। তা শুধু তাদের পছন্দের লোকদের দিচ্ছে। বাদ পড়ছেন বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী। তাই সাধারণ এসব মানুষের কল্যাণে সবাইকে এক হয়ে কাজ করার বিকল্প নেই। সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) যশোরের সভাপতি অধ্যাপক সুকুমার দাস বলেন, যশোরে সরকারি উদ্যোগে যে ত্রান বিতরণ হচ্ছে তা মুলত জেলা প্রশাসনের মাধ্যমেই হচ্ছে। এসব কর্মসূচিতে সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করার দাবি ছিলো আমাদের। সর্বস্তরের মানুষকে সাথে সমন্বয় করে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে প্রকৃত মানুষ এর সুফল পাবে। নইলে যে যার মতো এসব খাদ্য সহায়তা দিলে এর বাস্তব প্রতিফলন হবেনা। অনেকেই তালিকার বাইরে থাকবেন। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘমেয়াদি একটি সঙ্কটের দিকে এগুচ্ছি। করোনা পরিস্থিতি থেকে আমরা কবে মুক্তি পাবো তা বলা মুশকিল। তাই এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিতে হলে সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। প্রয়োজনে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের সাবেক তত্তাবধায়ক ও যশোর ইনস্টিউটের নবনির্বাচিত নেতা ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ত্রান বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের বিষয়টি নিয়ে এখন সবাইকে এক হতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ দিয়ে একটি তালিকা প্রস্তুত করা যায়। আসলে কারা ত্রান পাওয়ার উপযুক্ত তাদেরকে আগে চিহ্নিত করতে হবে। এরপর রাষ্ট্র্রের এসব গুরুত্বপূর্ন সংস্থার লোক দিয়ে তাদের বাড়ি বাড়ি খাদ্য সহায়তা পৌছে দিতে হবে। তিনি বলেন, একদিকে করোনা সংক্রম অন্যদিকে খাদ্য নিরাপত্তা। এ দুটোকে আলাদাভাবে দেখা যবেনা। নইলে সামনে আমাদের আরও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। যশোর জেলা পরিবহন সংস্থা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সেলিম রেজা মিঠু বলেন, যশোরে এ পর্যন্ত যে ত্রান বিতরণ করা হয়েছে তাতে কোনো সমন্বয় ছিলোনা। পরিবহন সংশ্লিষ্ট তিনটি ট্রেড ইউনিয়ন রয়েছে। এদের আওতায় এ যশোর শহর কেন্দ্রিক প্রায় ৬ হাজার লোক রয়েছে। এসব লোকের মধ্যে আমার জানামতে ৫০ জনের বেশি কেউ ত্রান পাননি। তিনি বলেন, প্রকৃত অসহায় ও দরিদ্রদের তালিকা প্রস্তুত করে যদি ত্রান না দেওয়া হয় তাহলে শুধু করোনায় নয়, অনেক লোক না খেয়েই মারা যাবেন।