যুব উন্নয়নের চাকরি পরীক্ষা বাতিল, ক্ষতিপূরণ চান প্রার্থীরা

0
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের পর রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ করেন ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীরা।। ছবি: সংগৃহীত

যুব উন্নয়নের চাকরি পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে ওএমআর শিট দেওয়ার মাত্র দুই মিনিটের মাথায় বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি ছুটির দিন শনিবার সকাল থেকেই রাজধানীর মেট্রোরেল স্টেশনগুলোয় ছিল বাড়াত ভিড়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আগারগাঁও, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া স্টেশনে যাত্রীদের চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। এর অন্যতম কারণ ছিল যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা।

২৪২টি পদের বিপরীতে প্রায় তিন লাখ প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। তাঁদের অনেকে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরীক্ষা দিতে ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রে ওএমআর শিট দেওয়ার পরই জানানো হয় পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। শেষ মুহূর্তের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীরা এখন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন।

পরীক্ষার্থীরা জানান, অনেক কষ্টে সকালে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন তারা। নির্ধারিত সময়ে তাঁদের হাতে ওএমআর শিট দেওয়া হয়। এর দুই মিনিটের মাথায় হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কক্ষে এসে জানান, অনিবার্য কারণে পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে।

ওএমআর শিট হাতে নিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার পর এমন ঘোষণা শুনে হতবাক হয়ে যান কক্ষে থাকা পরীক্ষার্থীরা। দূর থেকে ঢাকায় আসা, যাতায়াত, থাকা ও খাওয়ার জন্য যে টাকা খরচ হয়েছে, তা তাঁদের নিজেদেরই বহন করতে হয়েছে। পরীক্ষা না হওয়ায় সেই খরচও বিফলে গেছে।

ওএমআর শিট বিতরণের ঠিক আগমুহূর্তে পরীক্ষা বাতিলের পর চাকরিপ্রার্থীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্নপত্র কীভাবে বাইরে গেল, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চান পরীক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে পরীক্ষা বাতিলের কারণে তাঁদের যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অবস্থানও স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণার পর বিভিন্ন কেন্দ্রে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসা পরীক্ষার্থীদের একাংশ সড়কে বিক্ষোভ করেন। ধানমন্ডির সাতমসজিদ সড়ক, মানিক মিঞা অ্যাভিনিউ ও মিরপুর এলাকায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটে।

পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, সারা দেশ থেকে প্রায় তিন লাখ চাকরিপ্রার্থী ঢাকায় এসেছেন। তাঁদের যাতায়াত, খাওয়া ও থাকার খরচ কম নয়। পরীক্ষা বাতিলের কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তার দায় কে নেবে—এমন প্রশ্ন তুলেছেন তারা। চাকরিপ্রার্থীদের এই ভোগান্তির আর্থিক ক্ষতি বিবেচনা করে সরকারের কাছে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়েছে।

পরীক্ষার্থীরা আরও জানান, শুক্রবার রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর ও প্রশ্নের নমুনা ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁদের দাবি, বিষয়টি আগে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তারা কেন্দ্রে প্রবেশ করার পর এবং ওএমআর শিট হাতে পাওয়ার পর পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়।

পরীক্ষা বাতিল ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রসঙ্গে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ে পরীক্ষার নতুন তারিখ প্রকাশ করা হবে। সংস্থাটির প্রশাসন উইংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নপত্রের সঙ্গে আসল প্রশ্নপত্রের আংশিক মিল পাওয়ায় এই পরীক্ষা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শাহবাগে যানজট ।। ছবি: সংগৃহীত

উল্লেখ্য, সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদটি ১১তম গ্রেডের এবং শূন্য পদ ছিল ২৪২টি। বিপরীতে আবেদন করেছিলেন প্রায় তিন লাখ প্রার্থী। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি পদের বিপরীতে গড়ে প্রায় ১ হাজার ২৪০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ছিল।

ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থীরা জানান, একটি নিয়োগ পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ দিন প্রস্তুতি নিতে হয়। অনেকে চাকরির প্রস্তুতির পাশাপাশি পরিবার ও পড়াশোনার দায়িত্ব সামলান। দূরের জেলা থেকে পরীক্ষা দিতে এলে যাতায়াত ও আবাসন খরচ যোগ হয়। ফলে পরীক্ষা বাতিলের প্রভাব শুধু একটি দিনের সময় নষ্ট হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরির সীমিত পদে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে উঠেছে।

চাকরিপ্রার্থীদের কাছে তাই প্রতিটি নিয়োগ পরীক্ষা দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত। পরীক্ষা আয়োজনের আগে প্রশ্নের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের আশঙ্কা দেখা দিলে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ পরীক্ষার্থীদের ওপর যে আর্থিক ও মানসিক চাপ তৈরি হয়, সেটিও উপেক্ষা করা যায় না। নতুন পরীক্ষার তারিখ দ্রুত ঘোষণা করার পাশাপাশি যাঁরা দূরদূরান্ত থেকে এসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ বা অন্য কোনো প্রতিকার বিবেচনা করার জোর দাবি উঠেছে।