অসীম সাহসী নেতা তরিকুল ইসলাম

0
অসীম সাহসী নেতা তরিকুল ইসলাম
বরেণ্য রাজনীতিক তরিকুল ইসলাম- ফাইল ফটো

আখতারুজ্জামান মনোহরী : স্কুলজীবনেই অনেকটা স্বপ্রণোদিত হয়ে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। তখন শহরতলির এ এলাকায় রাজনীতিচর্চা তেমন একটা ছিল না। তবে মাঝেমধ্যে বামপন্থী দলের দু-একটি ছাত্রসংগঠনের নেতারা আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসে তাঁদের রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করতেন। তাঁরা নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ম্যাক্সিম গোর্কির উপন্যাস এবং পাবলো নেরুদা ও নাজিম হিকমতের কবিতার বই বিতরণ করতেন।

অন্য একদিন শহর থেকে একদল শিক্ষার্থী এসে তাঁদের নেতা, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে সুন্দরভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তাঁদের বক্তব্যে আমরা আগ্রহ প্রকাশ করায় আমাদের মধ্য থেকে একজনকে আহ্বায়ক নির্বাচিত করে ছাত্রদলের একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে সেটি দৈনিক স্ফুলিঙ্গ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আমি তখন নবম শ্রেণিতে পড়ি। এত অল্প বয়সে রাজনীতিতে নাম লেখানোয় এলাকায় লোকজন এ নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করতে থাকেন। কিন্তু আমরা সেদিকে কর্ণপাত না করায় কিছুদিনের মধ্যেই বিষয়টি স্থিমিত হয়ে যায়।

আসলে কমিটি গঠনের ঘটনাটির সময় আমাদের কারোরই রাজনীতি সম্পর্কে খুব একটা পরিমিত বোধ ছিল না বললেই চলে। তবে পূর্ববর্তী দুটি ঘটনা আমাদের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে তোলে।

বাংলাদেশের প্রথম স্কাউট জাম্বুরিতে অংশ নিতে আমরা ঢাকার গাজীপুরে যাই। সেদিন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাত মাইলেরও বেশি পথ পায়ে হেঁটে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তাঁর সঙ্গে ছাত্র-শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সেনাবাহিনী, বিডিআর, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যসহ যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে পারেননি। অনেকেই মাঝপথে হাল ছেড়ে দেন। বিষয়টি আমাদের ছাত্রদের মনে গভীরভাবে দাগ কাটে।

অনুষ্ঠানবিকেলে

আমাদের তাঁবু ছিল রূপসা অঞ্চলে। দুপুরের খাবারের পর কেউ বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছেন, আবার দু-একজন তাঁবুর সামনের অংশে ফুলের টব ও বিভিন্ন সরঞ্জাম সাজিয়ে গুছিয়ে রাখছিলেন। এমন সময় একটি স্লোগান আমাদের সচকিত করে তোলে—

‘তরিকুল ভাই এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে।’
‘তরিকুল ভাই, তরিকুল ভাই, জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ।’

সবাই তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়ালাম। সাদা ধবধবে পোশাক ও পাঞ্জাবি পরিহিত একজন হাস্যোজ্জ্বল মুখে সবার সঙ্গে করমর্দন করে কুশল বিনিময় করলেন। যাঁরা এর আগে তাঁকে দেখেননি, তাঁরা ফিসফিস করে অন্যদের কাছ থেকে যশোরের সেই নেতার পরিচয় জেনে নিলেন।

দ্বিতীয়বারও কাকতালীয়ভাবে এই দুই নেতার সঙ্গে দেখা হয় উলশী খালকাটা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সময়। ফলে তরিকুল ভাইয়ের প্রতি ভালো লাগার বীজটি মনের মধ্যে অনেক আগেই উপ্ত হয়েছিল। তাই সময়-সুযোগ হলেই ছাত্রদলের মিছিলে মিশে যেতে কালবিলম্ব করিনি। পড়াশোনায় কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও ধীরে ধীরে সংগঠনের গভীরে প্রবেশ করি। তখন থেকেই প্রত্যক্ষ করি তরিকুল ভাইয়ের দুর্দান্ত সাহসী পদক্ষেপ, নির্ভীক মনোভাব ও অদম্য আকাঙ্ক্ষা।

৮ ফাল্গুন প্রতিবাদী রিকশাচালকদের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পেটোয়া বাহিনী ক্ষুব্ধ জনতার মিছিলে নির্মমভাবে গুলি চালায়। প্রাণভয়ে মানুষ যখন দিকবিদিক ছুটে পালাচ্ছিল, সেদিনও তরিকুল ভাই জনশূন্য দড়াটানা এলাকায় সিদ্দিক বেকারির সামনে মৃত্যুকে উপেক্ষা করে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত এক রিকশাচালকের লাশ নিয়ে একাকী দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেদিনও তিনি একটুও নিজের জীবনের কথা ভাবেননি।

আরেক দিনের ঘটনা

সেদিন ছিল ঐতিহাসিক ১০ নভেম্বর। ঝাঁকড়া চুলের অদম্য সাহসী যুবক নূর হোসেনের বুক-পিঠে লেখা ছিল—‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক।’ সেই নির্ভীক যুবক সেদিন এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ হন।

এ আন্দোলনে আমাদের অবস্থান ছিল শাপলা চত্বরে। ৯ নভেম্বরই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের রাতযাপনে বেশ বেগ পেতে হয়। তবু নানা কষ্ট স্বীকার করে আন্দোলনকারীরা ১০ নভেম্বরের মধ্যে নির্ধারিত স্থানে হাজির হন। তরিকুল ভাইও যথাসময়ে ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আন্দোলনের উত্তাপ আরও বাড়িয়ে তোলেন।

আন্দোলনকারীরা ছোট ছোট মিছিলে বিভক্ত হয়ে মুহুর্মুহু স্লোগানে শাপলা চত্বরের চারপাশ প্রকম্পিত করে তোলেন। বেলা ১২টার দিকে তরিকুল ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা বিশাল একটি মিছিল নিয়ে আকাশবিদারী স্লোগানসহ এগিয়ে যেতে থাকি। স্লোগান ছিল—

‘আকাশপথ বন্ধ করো, এরশাদ পালিয়ে যাবে।’
‘তরিকুল ভাই ভয় নাই, আমরা আছি তোমার সাথে।’

মিছিলটি যখন জঙ্গি মেজাজে আল্লাহওয়ালা বিল্ডিংয়ের কাছে পৌঁছায়, তখন ওপর থেকে মিছিল লক্ষ্য করে পাঁচ-সাতটি বোমা নিক্ষেপ করা হয়। সেগুলো বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হলে বারুদের ধোঁয়ায় চারদিক আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে কে কোন দিকে ছুটে পালিয়েছেন, তার কোনো হিসাব ছিল না।

ধোঁয়া কিছুটা হালকা হলে দেখা গেল, তরিকুল ভাই ঘটনাস্থলের পাশেই মুখে রুমাল চেপে নির্ভীক সিংহের মতো একাকী দাঁড়িয়ে আছেন। চরম মুহূর্তেও তিনি নিজের জীবনের কথা ভেবে কর্মীদের ফেলে চলে যাননি। আশপাশে যাঁরা কিছুটা দূরে সরে গিয়েছিলেন, তাঁদের আবার সংগঠিত করে মিছিলের নেতৃত্ব দেন। অসীম সাহস ও নতুন উদ্যমে প্রতিবাদী প্রত্যয় নিয়ে কঠিন পদক্ষেপে সামনে এগিয়ে যান।

ইনিই আমাদের গর্ব, যশোর গড়ার কারিগর—জননেতা তরিকুল ইসলাম।