শিকদার খালিদ
মানুষ সামাজিক জীব। জন্মের পর থেকে পরিবার, পরিবেশ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে তার চিন্তা, বিবেক, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। একটি শিশু কীভাবে কথা বলতে শিখবে, অন্যের সঙ্গে কেমন আচরণ করবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে নাকি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবে—এসবের পেছনে তার বেড়ে ওঠার পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই কিশোর অপরাধের ঘটনা ঘটলে শুধু অপরাধীর পরিচয় খোঁজাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন, কোন পরিস্থিতি তাকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিল, কোথায় তার বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় ঘাটতি রয়ে গেল এবং সেই ঘাটতি পূরণে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কী ভূমিকা পালন করেছে।
অপরাধী হয়ে কোনো কিশোরের জন্ম হয় না
জন্মের সময় একটি শিশু অপরাধী কিংবা সৎ মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় নিয়ে পৃথিবীতে আসে না। মানুষের স্বকীয় চিন্তা, বিচারবোধ, বিবেক এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা তাকে অন্য প্রাণী থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। এ কারণেই মানুষকে বলা হয় সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। তবে মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতায় নয়, তার মানবিকতা, ন্যায়বোধ, দায়িত্বশীলতা ও আত্মসংযমের মধ্যেও নিহিত। এসব গুণের বিকাশ আপনা-আপনি ঘটে না; পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক অনুশাসন, নৈতিক চর্চা এবং জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ তা অর্জন করে। একটি শিশু যখন দেখে, তার পরিবারে সত্য কথা বলার মূল্য রয়েছে, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে সম্মান করা হয়, অন্যের অধিকার রক্ষা করা হয় এবং ভুল করলে তা স্বীকার করার শিক্ষা দেওয়া হয়, তখন তার মনেও এসব মূল্যবোধের বীজ বপন হয়। বিপরীতে, সে যদি দেখে শক্তিশালী ব্যক্তি দুর্বলকে নির্যাতন করছে, অন্যায় করে পার পেয়ে যাচ্ছে, অর্থ ও ক্ষমতার জোরে নিয়ম ভাঙছে কিংবা অপরাধ করেও সামাজিক মর্যাদা পাচ্ছে, তাহলে তার মনে ভুল ধারণা জন্মাতে পারে—ক্ষমতাবান হওয়াই বড় কথা, ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা নয়। অর্থাৎ শিশুর চারপাশে যা ঘটে, সে শুধু তা দেখে না; অনেক ক্ষেত্রে সেসব আচরণকে স্বাভাবিক বলেও গ্রহণ করতে শেখে। এই বাস্তবতা মনে রাখা জরুরি যে পরিবেশ মানুষের ওপর গভীর প্রভাব ফেললেও তা তার ভবিষ্যৎকে অবধারিতভাবে নির্ধারণ করে না। সঠিক দিকনির্দেশনা, সহমর্মিতা, শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠতে পারে।
কিশোর অপরাধ: বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সামাজিক সংকটের প্রতিফলন
বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং, দলবদ্ধ সহিংসতা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদকসম্পৃক্ততা এবং বিভিন্ন অপরাধে কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের দলবদ্ধভাবে চলাফেরা, আধিপত্য বিস্তার, সামান্য বিরোধে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংস আচরণ প্রদর্শনের প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এসব ঘটনার সব কটির পেছনে একই কারণ কাজ করে না। কোথাও অপরাধী চক্রের প্রভাব, কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ, কোথাও পারিবারিক অবহেলা, আবার কোথাও সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কিশোর অপরাধকে কেবল ব্যক্তির নৈতিক অবক্ষয় বলে চিহ্নিত করলে সমস্যার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। এমন গোষ্ঠীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, কোনো কিশোরের অপরাধে জড়িয়ে পড়া যেমন উদ্বেগের, তেমনি তার পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি, অপরাধী চক্র কিংবা অপরাধকে উৎসাহিত করা পরিবেশকে উপেক্ষা করাও সমাধানের পথ নয়।
যে কিশোর অপরাধে জড়াচ্ছে, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে; কিন্তু একই সঙ্গে দেখতে হবে, তাকে ব্যবহার করছে কে, অপরাধের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কোথায় এবং সংশোধনের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। কারণ, শুধু দৃশ্যমান অপরাধীকে আটক করে নেপথ্যের অপরাধী চক্রকে অক্ষত রাখা হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন।
পরিবার: শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
একটি শিশুর জীবনে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেই সে প্রাথমিকভাবে শিষ্টাচার, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা এবং সম্পর্কের মূল্য বুঝতে শেখে। পরিবারে ভালোবাসা, নিরাপত্তা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নৈতিকতার চর্চা থাকলে শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়। অন্যদিকে, নিয়মিত পারিবারিক কলহ, সহিংসতা, অবহেলা, অপমান কিংবা অসংগতিপূর্ণ শাসন শিশুর মনে ক্ষোভ, অনিরাপত্তা ও হতাশা তৈরি করতে পারে।
এখানে শাসনের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যায় না। তবে শাসন মানে অপমান, মারধর কিংবা ভয় দেখানো নয়। শাসন হওয়া উচিত যুক্তিনির্ভর, ধারাবাহিক ও ন্যায়সংগত। কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয় এবং কেন নয়, তা শিশুকে বুঝিয়ে বলতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারের বড়দের নিজেদের আচরণেও সেই নীতির প্রতিফলন থাকতে হবে। কারণ, বড়রা নিজেরা নিয়ম না মেনে সন্তানকে নিয়ম মানতে বললে সেই শিক্ষার কার্যকারিতা কমে যায়।
সমাজ যখন ভুলকে স্বাভাবিক করে তোলে।
একটি শিশুর বেড়ে ওঠা শুধু পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সংস্কৃতি, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তার চিন্তা ও আচরণে প্রভাব ফেলে। সমাজে ভালো মানুষের সম্মান, অন্যায়ের প্রতিবাদ, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং আইন মেনে চলার সংস্কৃতি থাকলে শিশুরাও সেসব আচরণ থেকে শিক্ষা পায়। কিন্তু সমাজে যখন অন্যায় দেখেও মানুষ নীরব থাকে, অপরাধীকে প্রভাবশালী বলে সমীহ করা হয় কিংবা পেশিশক্তি প্রদর্শনকে বীরত্ব হিসেবে দেখা হয়, তখন কিশোরদের একটি অংশ ভুল বার্তা পেতে পারে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে চলা, স্থানীয় বিরোধে তরুণদের ব্যবহার করা, ক্ষমতাবান ব্যক্তির আশ্রয়ে অন্যায় করার সুযোগ পাওয়া কিংবা অপরাধের পরও দায়মুক্তির ধারণা—এসব বিষয়ে সামাজিক উদ্বেগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিশোরদের ব্যবহার করে বড়রা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করতে পারে। কিশোরেরা তখন বুঝতে পারে না যে তারা অন্যের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠছে; বরং দলগত পরিচয়, প্রভাব বিস্তার কিংবা সাময়িক সুবিধাকে সাফল্য মনে করতে পারে।
এখানে সমাজের দায়িত্ব হলো, অপরাধকে কোনোভাবেই গৌরবান্বিত না করা। অপরাধে জড়িত কোনো কিশোরের সঙ্গে ছবি তুলে প্রচার করা, তার ভয় দেখানোকে সাহসিকতা হিসেবে উপস্থাপন করা কিংবা অন্যকে হেনস্তা করার ঘটনাকে বিনোদন হিসেবে নেওয়া বিপজ্জনক প্রবণতা। একই সঙ্গে কিশোরদের ভুল আচরণ সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে স্থায়ীভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও অনুচিত। সমাজকে একদিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে, অন্যদিকে ভুল থেকে ফিরে আসতে চাওয়া কিশোরের জন্য স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথও খোলা রাখতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু সনদ দেওয়ার জায়গা নয়
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়া কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফল করার উপযোগী করে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যালয়, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি শিশুর সামাজিক আচরণ, নৈতিকতা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গুণ বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত অনুপস্থিত থাকলে, হঠাৎ আচরণ বদলে গেলে, সহপাঠীদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ালে, মাদকসম্পৃক্ততার লক্ষণ দেখা দিলে কিংবা অস্বাভাবিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। এসব লক্ষণ দেখলেই কোনো শিক্ষার্থী অপরাধে জড়িত—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। বরং তার সমস্যার কারণ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা, শিক্ষক-পরামর্শকের সহায়তা কিংবা প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং, অপমান, দলবদ্ধ হয়রানি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর নীতিমালা থাকতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন নিরাপদে অভিযোগ জানাতে পারে এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ সমাধান পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। খেলাধুলা, বিতর্ক, সাহিত্য-সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চা, স্বেচ্ছাসেবা ও দলগত কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে। এসব কার্যক্রম কিশোরদের ইতিবাচক পরিচয় তৈরি করতে, নেতৃত্বের গুণ বিকাশে এবং দলগতভাবে ভালো কাজে যুক্ত হতে সহায়তা করতে পারে।
শিক্ষকেরাও যেন শিক্ষার্থীদের কেবল শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে না দেখে তাদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করেন। কোনো শিক্ষার্থী ভুল করলে তাকে শুধুই তিরস্কার না করে ভুলের পরিণতি বুঝতে এবং সংশোধনের পথ খুঁজতে সহায়তা করতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অপরাধের অনুকরণ
বর্তমান প্রজন্মের কিশোরদের জীবন থেকে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়। এসব মাধ্যম শিক্ষা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ ও নতুন দক্ষতা অর্জনের অসংখ্য সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, ক্ষতিকর বিষয়বস্তু, অনলাইন হয়রানি, সহিংসতার প্রদর্শন এবং অপরাধকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপনের প্রবণতা কিশোরদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কোনো কোনো কিশোর অনলাইনে জনপ্রিয়তা অর্জনের আশায় বিপজ্জনক আচরণ অনুকরণ করতে পারে। আবার অনলাইন বিরোধ বাস্তব জীবনে সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য নিয়ে হয়রানি, অপমানজনক মন্তব্য এবং দলবদ্ধভাবে কাউকে আক্রমণ করার ঘটনাও মানসিক চাপ ও বিরোধ বাড়াতে পারে।
এ কারণে কিশোরদের শুধু মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করাই সমাধান নয়। বরং অনলাইনে কী দেখা উচিত, কীভাবে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে হয়, ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত রাখতে হয় এবং অনলাইন বিরোধ হলে কীভাবে নিরাপদে সাহায্য চাইতে হয়—এসব বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। অভিভাবকদেরও প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা বাড়াতে হবে, যাতে তাঁরা সন্তানের অনলাইন জীবন নিয়ে যুক্তিসংগত আলোচনা করতে পারেন। একই সঙ্গে ক্ষতিকর বিষয়বস্তু ছড়ানো, অনলাইন হুমকি কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বেকার অবসর, হতাশা ও অপরাধী চক্রের প্রভাব
কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে সব সময় দারিদ্র্য কিংবা বেকারত্ব সরাসরি দায়ী নয়। তবে শিক্ষার সুযোগের অভাব, দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক সংকট, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা, ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সীমাবদ্ধতা এবং অপরাধী গোষ্ঠীর প্রলোভন কোনো কোনো কিশোরকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। আবার সচ্ছল পরিবারের কিশোরও দলগত আধিপত্য, উত্তেজনা, প্রতিশোধ কিংবা অপরাধী চক্রের প্রভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
তাই কিশোর অপরাধের সমাধান খুঁজতে গিয়ে সব দায় একটি শ্রেণি, পরিবার বা সামাজিক অবস্থার ওপর চাপানো ঠিক হবে না। প্রয়োজন প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট বোঝা। কোথাও মানসিক সহায়তা প্রয়োজন, কোথাও শিক্ষায় ফেরার সুযোগ, কোথাও মাদকাসক্তির চিকিৎসা, আবার কোথাও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।
কিশোরদের অবসর সময়কে অর্থবহ করার সুযোগও বাড়াতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে খেলার মাঠ, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বিজ্ঞান ক্লাব, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম গড়ে তোলা গেলে তারা ইতিবাচক কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। এসব উদ্যোগকে কেবল আনুষ্ঠানিক প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত পরিচালনা ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে।
অপরাধ দমনে আইনের প্রয়োগ হতে হবে নিরপেক্ষ
কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে মানবিকতার কথা বলে অপরাধকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কেউ সহিংসতা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত হলে অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা প্রয়োজন। ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বয়স, অপরাধের প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট কিশোরের ভূমিকা এবং প্রযোজ্য আইনি সুরক্ষা বিবেচনায় নিতে হবে। কিশোরদের বিচার ও সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন অনুসরণ, ন্যায্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তাদের দিয়ে অপরাধ করানো ব্যক্তি, অপরাধে উসকানিদাতা, আশ্রয়দাতা, মাদক বা অবৈধ অস্ত্রের জোগানদাতা এবং পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণকারী চক্রকে শনাক্ত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেবল ছোট সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে প্রভাবশালী নেপথ্য ব্যক্তিদের আড়ালে থাকতে দেওয়া হলে অপরাধের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যায়।
অভিযান হতে হবে তথ্যভিত্তিক, ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ। কারও রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থান যেন আইনের প্রয়োগে বাধা না হয়। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা করা যাবে না। তদন্ত, প্রমাণ এবং আইনসম্মত বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করতে হবে
সংশোধন ও পুনর্বাসনও অপরাধ দমনের অংশ
কিশোর বয়স মানুষের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা থাকতে পারে, আবার সঠিক সহায়তা পেলে আচরণ সংশোধন ও নতুনভাবে জীবন গড়ে তোলার সম্ভাবনাও থাকে। তাই অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরকে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এর অর্থ অপরাধের দায় এড়িয়ে যাওয়া নয়; বরং দায় স্বীকার, আচরণের পরিণতি উপলব্ধি এবং ভবিষ্যতে অপরাধ থেকে দূরে থাকার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা।
প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং, মাদকাসক্তির চিকিৎসা, শিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিবারভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে। অপরাধের কারণে শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া কিশোরকে আবার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। যারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে না, তাদের জন্য বয়স ও যোগ্যতা অনুযায়ী কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে পুনর্বাসনের কার্যকারিতা মূল্যায়নও জরুরি। শুধু একটি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কিশোরটি আবার অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাবে পড়ছে কি না, পরিবারে ফিরতে পারছে কি না, পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণ চালিয়ে যেতে পারছে কি না—এসব বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। সংশোধন ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে সমাজকর্মী, প্রশিক্ষিত পরামর্শক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবারের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন
কিশোরদের রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা
কিশোরেরা দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের একটি অংশ অপরাধে জড়িয়ে পড়লে শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবার নয়, পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপরাধের শিকার মানুষের নিরাপত্তা, কিশোরের নিজের ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা—সবকিছুই এ সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। তাই কিশোর অপরাধকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে প্রতিটি কিশোরকে সম্ভাব্য অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করাও অনুচিত।
একটি সভ্য সমাজের দায়িত্ব হলো অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া এবং একই সঙ্গে অপরাধের ঝুঁকিতে থাকা শিশুকে সঠিক পথে ফেরার সুযোগ দেওয়া। যে পরিবার সন্তানকে সময় দেয় না, যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীর সমস্যাকে উপেক্ষা করে, যে সমাজ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় এবং যে রাষ্ট্র প্রতিরোধের চেয়ে কেবল অপরাধ সংঘটনের পর প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকে—সেই পরিবেশে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন হয়ে পড়ে।
অপরাধের দায় ব্যক্তির; কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধের দায়িত্ব সমাজেরও। তাই কিশোর অপরাধ দমনে শাসন থাকতে হবে, তবে তা হতে হবে ন্যায়সংগত। সচেতনতা থাকতে হবে, তবে তা শুধু প্রচারপত্র ও সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পুনর্বাসন থাকতে হবে, তবে তা হতে হবে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি। পরিবারকে দায়িত্ব নিতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পাশে দাঁড়াতে হবে, সমাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে এবং রাষ্ট্রকে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, একটি কিশোরকে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা মানে শুধু একটি অপরাধ ঠেকানো নয়; বরং একটি জীবন, একটি পরিবার এবং ভবিষ্যৎ সমাজকে রক্ষা করার সম্ভাবনা তৈরি করা। তাই কিশোর অপরাধ দমনে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—অপরাধীর প্রতি অন্ধ সহনশীলতা নয়, আবার কিশোরের প্রতি অমানবিক নিষ্ঠুরতাও নয়; বরং ন্যায়বিচার, দায়িত্বশীল শাসন, সামাজিক সচেতনতা এবং মানবিক পুনর্বাসনের সমন্বিত প্রয়াস।






