তরিকুল ইসলাম: যশোরের মাটি ও মানুষের হৃদয়ে এক অবিস্মরণীয় নেতা

0
তরিকুল ইসলাম: যশোরের মাটি ও মানুষের হৃদয়ে এক অবিস্মরণীয় নেতা

ফারহান তানভীর জিসান : কিছু মানুষ ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান, আর কিছু মানুষ মানুষের হৃদয়ে রেখে যান তাঁদের অস্তিত্বের স্থায়ী চিহ্ন। তরিকুল ইসলাম ছিলেন তেমনই এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর নাম ও কর্মের সঙ্গে যশোরের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও যশোরের মাটি ও মানুষের সঙ্গে ছিল গভীর সম্পর্ক।

একজন মানুষের জীবনের প্রকৃত মূল্যায়ন কেবল তাঁর পদ-পদবি কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তিনি তাঁর সময়, সমাজ ও মানুষের জন্য কী রেখে গেছেন, তার মধ্যেই নিহিত থাকে জীবনের সার্থকতা। প্রয়াত তরিকুল ইসলামকে স্মরণ করতে গেলে তাই ফিরে দেখতে হয় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, যশোরের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের নানা দিক।

১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর যশোরে জন্মগ্রহণ করেন তরিকুল ইসলাম। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই নেতা দীর্ঘ পথপরিক্রমায় জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। তিনি জাতীয় পর্যায়ে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। খাদ্য, তথ্য এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিস্তৃতি ঘটে। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর তাঁর প্রয়াণ ঘটে। কিন্তু একজন মানুষের প্রস্থান তাঁর কর্মময় জীবনের আলোচনা শেষ করে দেয় না; বরং সময়ের ব্যবধানে তাঁর অবদানকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করে।

যশোর ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম প্রধান কর্মক্ষেত্র। এই জনপদের মানুষের প্রত্যাশা, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে ঘিরেই তাঁর রাজনৈতিক পথচলার একটি বড় অংশ আবর্তিত হয়েছে। একজন জনপ্রতিনিধির কাছে মানুষের প্রত্যাশা থাকে—তিনি মানুষের কথা শুনবেন, এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর সমাজ গড়ার প্রচেষ্টায় যুক্ত থাকবেন। যশোরের মানুষের কল্যাণে কাজ করার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তরিকুল ইসলামের নাম আজও উচ্চারিত হয়। তাঁর স্মরণে এ বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

বিশেষ করে সন্ত্রাসমুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ যশোর গড়ার স্বপ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রত্যাশা। এমন একটি যশোর, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারবে, তরুণেরা নিজেদের মেধা ও যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ পাবে এবং সাধারণ মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রয়োজন আইনের শাসন, সামাজিক সচেতনতা, ন্যায়বিচার এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। যশোরের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গেলে এসব প্রত্যাশাকে সামনে রাখা জরুরি।

তরিকুল ইসলামের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজও আলোচনায় আসে তাঁর ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের মাধ্যমে। তিনি যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং বর্তমানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। তাঁর এই দায়িত্বের মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি যশোরের মানুষের প্রত্যাশা ও উন্নয়ন-আকাঙ্ক্ষার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তবে উত্তরাধিকার কেবল একটি পরিচয়ের নাম নয়; এটি দায়িত্বেরও নাম। পূর্বসূরির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রকাশ পায় তখনই, যখন তাঁর ইতিবাচক আদর্শ ও জনকল্যাণের প্রত্যাশাকে বাস্তব কাজের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেওয়া যায়। যশোরের মানুষের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শান্তিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

একটি জনপদের উন্নয়ন কখনো একজন মানুষের একক প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ হয় না। এর জন্য প্রয়োজন জনগণের অংশগ্রহণ, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা। তরিকুল ইসলামকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে তাই শুধু একজন সাবেক মন্ত্রী বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ফিরে দেখা নয়, বরং যশোরের আগামী দিনের প্রত্যাশা ও দায়িত্বের কথাও স্মরণ করা প্রয়োজন।

স্মরণসভা ও স্মরণসংখ্যার তাৎপর্য এখানেই—এগুলো অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের পথচলার জন্যও অনুপ্রেরণা জোগায়। একজন মানুষের কর্ম, চিন্তা ও অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারলে তাঁর স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে।

তরিকুল ইসলামের প্রয়াণবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। আমাদের প্রত্যাশা, যশোর হয়ে উঠুক শান্তি, সম্প্রীতি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জনপদ। সন্ত্রাস ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশে মানুষ যেন নিজের অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারে, তরুণেরা যেন স্বপ্ন দেখার সাহস পায় এবং আগামী প্রজন্ম যেন একটি সুন্দর যশোর উত্তরাধিকার হিসেবে পায়।

মানুষের জীবন একদিন শেষ হয়, কিন্তু তাঁর কর্ম ও অবদানকে মূল্যায়ন করার দায়িত্ব থেকে যায় পরবর্তী প্রজন্মের ওপর। তরিকুল ইসলামকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে যশোরের মাটি ও মানুষের কল্যাণের প্রত্যাশা আরও গভীর হোক। তাঁর কর্মময় জীবনের স্মৃতি নতুন প্রজন্মকে জনকল্যাণে কাজ করার প্রেরণা জোগাক—এই হোক তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।