প্রযুক্তির বিকাশের যুগে জেলা সাংবাদিকতার অনগ্রসরতা: গণমাধ্যমের অপব্যবহার ও পেশাগত সংকট

0
শিকদার খালিদ

খবরের কাগজে কাজ করার বর্তমান সময়টা আমি খুব উপভোগ করি। কাজ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা, নিজের ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা এবং কম্পিউটার পরিচালনা কিংবা গ্রাফিকসের কাজে যুক্ত সহকর্মীদের কাছে মনের কথাটি ঠিকঠাক বোঝাতে না পারার কারণে প্রত্যাশিত কাজ না হওয়ার যে আক্ষেপ ছিল, তা অনেকটাই দূর হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুই সহায়ক—চ্যাটজিপিটি ও গুগল জেমিনির সঙ্গে কাজ করতে বসে।
এখন একটি কম্পিউটারের সামনে বসেই আমি লিখছি, সম্পাদনা করছি, ছবির পরিকল্পনা করছি, নকশা তৈরি করছি। মনের মধ্যে কোনো ভাবনা এলে তা ভাষায় প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গেই তার একটি দৃশ্যমান রূপ হাজির হচ্ছে। শুধু আমার কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েই তারা থেমে থাকছে না, বরং আরও ভালো কিছু করার পথও দেখাচ্ছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি ও তার ব্যবহার সম্পর্কে জানতে পারছি, আর সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগও তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন কিছু শিখছি, নতুনভাবে ভাবতে শিখছি। প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর সম্ভাবনা আমাকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করছে।
এমন মুহূর্তে ফিরে যেতে হয় সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর দিকের দিনগুলোতে।

হাতে কম্পোজের যুগে দৈনিক যশোরে বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কাগজের পাতা মেকআপ দিতে গিয়ে কত রকমের ভাবনা যে মাথায় আসত! রাজধানী থেকে প্রকাশিত অফসেট মুদ্রণের সংবাদপত্রে ছাপা বক্স নিউজ দেখে নিজের কাগজেও তেমন কিছু করার ইচ্ছা হতো। কোনো কোনো সংবাদের চারপাশে বক্স দিতে চাইতাম, কখনো শিরোনামের নিচে রুল টানার কথা ভাবতাম। কিন্তু তখনকার প্রযুক্তিতে আমার কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এত সহজ ছিল না।
কম্পোজিটর কাম মেকআপম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন সহকর্মী মিরাজ। আমার নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনি প্রায়ই বিরক্ত হয়ে বলতেন, এতক্ষণ ধরে কি মেকআপ দেওয়া যায়! এতে তো মালিকের ক্ষতি হচ্ছে।

তাঁর বিরক্তির কারণও ছিল বাস্তব। তখন কম্পোজের সময় লাইন ও স্পেসের জন্য যে পাত ব্যবহার করা হতো, সেগুলো কেটে ছোট করে রুল তৈরি করতে গেলে কম্পোজের স্বাভাবিক কাজে ব্যাঘাত ঘটত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাতের অপচয় হতো, আবার কাটা পাত ব্যবহার করতে গিয়ে কাজের গতিও কমে যেত। ফলে আমার

সৃজনশীলতার চর্চা সহকর্মীদের জন্য বাড়তি পরিশ্রমের কারণ হয়ে দাঁড়াত।

একপর্যায়ে মেকআপম্যান মিরাজ আমার বিরুদ্ধে প্রকাশক ও সম্পাদক জাহিদ হাসান টুকুনের কাছে অভিযোগ করলেন। কিন্তু অভিযোগের ফল হলো উল্টো। মালিকের খরচ বাড়ানোর জন্য তিরস্কার করার পরিবর্তে জাহিদ ভাই আমাকে উৎসাহ দিলেন। তাঁর এই প্রশ্রয়ে মিরাজ ভাইসহ অন্য কম্পোজিটরদের হতাশ হওয়ারই কথা। কারণ, আমার নতুন কিছু করার আগ্রহের মূল্য দিতে হচ্ছিল তাঁদের বাড়তি পরিশ্রম দিয়ে।

সেদিন জাহিদ ভাইয়ের একটি কথা আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। তিনি বলেছিলেন, নতুন কিছু করতে গিয়ে ও যদি আমার কাছ থেকে কিছু শিখে নেয়, তাহলে একসময় আমার কথা ওর মনে পড়বে।
আজ সত্যিই তাঁর কথা মনে পড়ে।

এখন একটি কম্পিউটারে বসেই সংবাদ লিখছি, সম্পাদনা করছি। কোনো সংবাদ প্রকাশের আগে তার উপস্থাপনা কেমন হবে, পাঠকের চোখে কীভাবে সেটি আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, তা নিয়ে ভাবছি। কখনো সংবাদ লেখার কাজটি সরিয়ে রেখে সংবাদের জন্য একটি ফিচার ইমেজের বর্ণনা তৈরি করছি। নির্দেশনা দিয়ে এন্টার চাপতেই পর্দায় ভেসে উঠছে আমার কল্পনার কাছাকাছি কোনো ছবি, কখনো তার চেয়েও ভালো কিছু। তখন নিজের অজান্তেই বিস্ময়ে বলে উঠি—যুগের কী পরিবর্তন! তথ্যপ্রযুক্তির বিজ্ঞানীরা মানুষের ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ কত সহজ করে দিয়েছেন!

এই পরিবর্তন শুধু আমার ব্যক্তিগত কাজের সুবিধা বাড়ায়নি; সংবাদপত্রের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজাও খুলে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় সংবাদ সম্পাদনা, তথ্য বিন্যাস, অলংকরণ, গ্রাফিকস ও ফিচার ইমেজ তৈরির মতো কাজ তুলনামূলক কম সময়ে এবং সীমিত সম্পদে করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে সামর্থ্য ও সদিচ্ছা থাকলে জেলা শহরের একটি সংবাদপত্রও উপস্থাপনার দিক থেকে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে।

সংবাদপত্রের মূল শক্তি অবশ্যই সংবাদ। কিন্তু পাঠক শুধু তথ্যের জন্যই সংবাদপত্র হাতে নেন না; সংবাদ কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তার ভাষা কতটা সাবলীল, ছবি কতটা প্রাসঙ্গিক, পৃষ্ঠাসজ্জা কতটা আকর্ষণীয়—এসবও পাঠকের আগ্রহ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। পাঠক প্রতিদিন নতুন খবরের পাশাপাশি সংবাদপত্রের উপস্থাপনাতেও নতুনত্ব দেখতে চান। সেই চাহিদা পূরণে প্রযুক্তি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সহায়ক।

অথচ জেলা শহরের সংবাদপত্রগুলোর বড় একটি অংশ প্রযুক্তির এই সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছে না। ফলে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও ভিজ্যুয়াল কনটেন্টের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাদের পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। রাজধানীকেন্দ্রিক সংবাদপত্রগুলোও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, তবে তাদের অনেকের সম্পদ, জনবল ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা তুলনামূলক বেশি। জেলা শহরের সংবাদপত্রগুলোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট।

এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে—প্রযুক্তির এত সহজলভ্যতার পরও জেলা সংবাদপত্রের সংকট কাটছে না কেন?

আমার বিবেচনায়, এর উত্তর শুধু অর্থের অভাব কিংবা প্রযুক্তির অপ্রতুলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংকটের গভীরে রয়েছে সংবাদপত্র পরিচালনার উদ্দেশ্য, মালিকানার চরিত্র, সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা এবং গণমাধ্যমকে ব্যবহারের প্রবণতা।

পাঠকের জন্য নয়, অন্য স্বার্থে সংবাদপত্র

অনলাইন সাংবাদিকতার বিস্তার এবং পাঠাভ্যাসের পরিবর্তনের মধ্যে সংবাদপত্রের অস্তিত্ব নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন উঠছে, তখনও জেলা শহরে নতুন নতুন সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে কিছু সংবাদপত্র আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠকের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছে। আবার কিছু প্রকাশনার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠছে—নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা, মুদ্রণ ও বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে সেগুলো কীভাবে চলছে?

একজন প্রকাশক-সম্পাদক দু-তিনজন কর্মী নিয়ে প্রতিদিন চার পাতার সংবাদপত্র প্রকাশ করছেন—এমন উদাহরণও চোখে পড়ে। সীমিত জনবল নিয়ে সংবাদপত্র পরিচালনা করা অসম্ভব নয়। কিন্তু পর্যাপ্ত সংবাদকর্মী, সম্পাদনা, তথ্য যাচাই এবং মানসম্মত সংবাদ উপস্থাপনার ব্যবস্থা ছাড়া একটি সংবাদপত্র নিয়মিতভাবে পাঠকের প্রত্যাশা পূরণ করবে কীভাবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

কিছু প্রকাশনার ক্ষেত্রে অভিযোগ বা ধারণা রয়েছে, পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার চেয়ে অন্য কোনো স্বার্থ তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই স্বার্থ হতে পারে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার, রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি কিংবা ব্যবসায়িক সুবিধা অর্জন। সংবাদপত্র তখন আর জনস্বার্থে পরিচালিত গণমাধ্যমের স্বাভাবিক ভূমিকা পালন করে না; বরং হয়ে ওঠে অন্য কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার।

এখানে সংবাদপত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি আর সুস্থ সাংবাদিকতার বিকাশকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। প্রকাশনার সংখ্যা বাড়লেই সংবাদ পরিবেশনের মান বাড়ে না, পাঠকের আস্থা তৈরি হয় না, সাংবাদিকতার পরিসরও সমৃদ্ধ হয় না। বরং গণমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করে যদি ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ রক্ষা করা হয়, তাহলে সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কখনো কখনো সংবাদপত্রের মালিকানা ও প্রকাশনার অনুমোদনকে কেন্দ্র করেও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। এমন উদাহরণও রয়েছে, যেখানে একটি সংবাদপত্রের প্রকাশক-সম্পাদক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তি অন্য একটি সংবাদপত্রে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছেন। কোনো প্রকাশনার নিয়মিত প্রকাশ, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ কিংবা মানসম্মত মুদ্রণ নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়। সরকারি তালিকায় প্রকাশনার পরিচয় বজায় রাখার জন্য মাঝেমধ্যে সীমিত পরিসরে পত্রিকা ছাপিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানোর অভিযোগও শোনা যায়।

এসব ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট প্রকাশনার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি। তবে বৃহত্তর বাস্তবতা হলো, সংবাদপত্রের অনুমোদন, নিয়মিত প্রকাশনা, সম্পাদকীয় দায়িত্ব এবং প্রকৃত সাংবাদিকতার মধ্যে সুস্পষ্ট সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। শুধু প্রকাশক বা সম্পাদক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করলেই সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করা হয় না।

সাংবাদিকের সংকট, দায় কার?

জেলা সাংবাদিকতার অনগ্রসরতার অন্যতম বড় কারণ যোগ্য ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের পেশায় ধরে রাখতে না পারা। এ পেশায় শ্রম, সময়, মেধা ও ঝুঁকির তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে পারিশ্রমিক এত কম যে তা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করাই কঠিন হয়ে পড়ে।

একজন তরুণ অন্য পেশায় কয়েক ঘণ্টা কাজ করে যে আয় করতে পারেন, অনেক ক্ষেত্রে সংবাদপত্রে সারাদিন কাজ করেও তার কাছাকাছি পারিশ্রমিক পান না। ফলে সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অনেকে বিকল্প পেশা বেছে নিতে বাধ্য হন। অভিজ্ঞ সাংবাদিকেরাও একসময় পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবেন। এতে শুধু একজন সংবাদকর্মী হারিয়ে যান না; তাঁর সঙ্গে হারিয়ে যায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, সংবাদ চেনার দক্ষতা, তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস এবং স্থানীয় সমাজ সম্পর্কে অর্জিত জ্ঞান।

অন্যদিকে সংবাদপত্রের মালিকদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়, ভালো সাংবাদিক পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে দুর্বলদের দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যোগ্য সাংবাদিকদের ধরে রাখার মতো পারিশ্রমিক, কর্মপরিবেশ ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?

যোগ্য মানুষকে ন্যায্য পারিশ্রমিক না দিয়ে তাঁর কাছ থেকে মানসম্মত কাজ প্রত্যাশা করা যায় না। আবার পারিশ্রমিক কম হওয়ার অজুহাতে সংবাদ যাচাই, সম্পাদনা কিংবা পেশাগত নৈতিকতার প্রশ্নেও ছাড় দেওয়া যায় না। সংবাদপত্রের মালিক ও সম্পাদকদের বুঝতে হবে, সাংবাদিকতা কোনো দয়ার কাজ নয়। এটি একটি পেশা, যেখানে দক্ষতা ও শ্রমের যথাযথ মূল্য দিতে হয়।

সংবাদপত্রের মালিকানা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের ক্ষেত্রেও এক ধরনের বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। কেউ কেউ সংবাদপত্র প্রকাশের মধ্য দিয়ে সামাজিক পরিচিতি অর্জন করেন, পরে মুদ্রণযন্ত্র, প্রেস কিংবা অন্যান্য ব্যবসায় যুক্ত হন। সংবাদপত্রের পরিচয় তাঁদের সামাজিক ও ব্যবসায়িক পরিসর বিস্তারে সহায়তা করে। কেউ কেউ রাজনীতি ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।

অবশ্য সংবাদপত্রের মালিকের অন্য ব্যবসা থাকা কিংবা রাজনীতিতে যুক্ত থাকা নিজে থেকে কোনো অপরাধ নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন সেই পরিচয় সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, সংবাদ প্রকাশে পক্ষপাত তৈরি করে কিংবা গণমাধ্যমের পরিচয় ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়।
এই বাস্তবতায় কোনো কোনো ব্যক্তি সংবাদপত্রকে জনসেবার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ব্যবসায়িক সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। তখন সংবাদপত্রের সংখ্যা বাড়লেও পেশাদার সাংবাদিকতার পরিসর বাড়ে না। বরং প্রকৃত সাংবাদিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রযুক্তি আছে, পরিকল্পনা কোথায়?

প্রযুক্তির বর্তমান অগ্রগতি সংবাদপত্র প্রকাশের অনেক কাজ সহজ করে দিয়েছে। সংবাদ সম্পাদনা, পৃষ্ঠাসজ্জা, ছবি প্রস্তুত, শিরোনাম বিন্যাস এবং ডিজিটাল প্রচারের কাজে নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় সীমিত জনবল নিয়েও অনেক কাজ আগের তুলনায় দ্রুত করা সম্ভব।

তবে প্রযুক্তি নিজে থেকে একটি সংবাদপত্রকে সফল করে তুলতে পারে না। প্রয়োজন সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল, দায়িত্বশীল সম্পাদকীয় নেতৃত্ব এবং পাঠক সম্পর্কে বাস্তব ধারণা।

একজন প্রকাশক চাইলে তাঁর সংবাদপত্রের আকার ও বাজার অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জনবল নির্ধারণ করতে পারেন। সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা, পৃষ্ঠাসজ্জা, মুদ্রণ ও অনলাইন প্রচারের কাজ ভাগ করে দিতে পারেন। কর্মীদের বাজারসঙ্গত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করে তাঁদের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারেন। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সংবাদ ও উপস্থাপনার মান উন্নত করতে পারেন।

কিন্তু এসব করতে হলে সংবাদপত্র পরিচালনাকে শুধু দৈনিক কাগজ ছাপানোর কাজ হিসেবে দেখলে চলবে না। পাঠকের চাহিদা বুঝতে হবে, স্থানীয় সংবাদকে গুরুত্ব দিতে হবে, তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং সময়ের সঙ্গে নিজেদের কাজের ধরন বদলাতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখানে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকের বিকল্প নয়। প্রযুক্তি দিয়ে লেখা সম্পাদনা করা যায়, ছবি তৈরি করা যায়, তথ্য বিন্যাস করা যায়; কিন্তু মাঠপর্যায়ে সত্যতা যাচাই, মানুষের বক্তব্য সংগ্রহ, ঘটনার প্রেক্ষাপট বোঝা এবং জনস্বার্থ নির্ধারণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সাংবাদিক ও সম্পাদকেরই। প্রযুক্তির অপব্যবহার করলে ভুল তথ্যও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন তার দায়িত্বশীল প্রয়োগ।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানোর কথা যেসব সাংবাদিক সংগঠন ও প্রেসক্লাবের, তাদেরও কার্যকর ভূমিকা থাকা জরুরি। সাংবাদিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, ন্যায্য পারিশ্রমিক, পেশাগত নিরাপত্তা, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের নৈতিকতা রক্ষায় তাদের সক্রিয় হওয়ার সুযোগ রয়েছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে এসব মৌলিক প্রশ্নের চেয়ে সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান ও তৎপরতাই বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

সাংবাদিক সংগঠন কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষার মঞ্চে পরিণত হলে পেশার সামগ্রিক স্বার্থ আড়ালে পড়ে যায়। সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন বাড়ে, পেশাগত ঐক্য দুর্বল হয়। অথচ প্রযুক্তির পরিবর্তন, অনলাইন গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং সংবাদপত্রের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ।

গণমাধ্যমের অপব্যবহারই বড় সংকট

প্রযুক্তির বিকাশের যুগে জেলা সাংবাদিকতার অনগ্রসরতার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তাই বারবার ফিরে আসতে হয় গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যের প্রশ্নে।

একটি সংবাদপত্রের প্রধান দায়িত্ব হলো পাঠকের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া, জনস্বার্থের বিষয় তুলে ধরা এবং ক্ষমতাসীন কিংবা প্রভাবশালী যে কারও কর্মকাণ্ডকে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো। সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক কিংবা সাংবাদিক—কেউই এই দায়িত্বের ঊর্ধ্বে নন।

কিন্তু সংবাদপত্র যদি ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি অর্জনের মাধ্যম হয়ে ওঠে, রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে সংবাদ প্রকাশে বৈষম্য তৈরি হয় কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় তথ্যের ব্যবহার করা হয়, তাহলে তার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। তখন সংবাদপত্রের বাহ্যিক অস্তিত্ব থাকলেও সাংবাদিকতার মৌলিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
আমার মনে হয়, জেলা সংবাদপত্রের সংকটের সঙ্গে এই প্রশ্নটি গভীরভাবে জড়িত। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণে ব্যর্থতা একটি সমস্যা; কিন্তু তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো, সংবাদপত্রকে পাঠকের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার সদিচ্ছার অভাব। কারণ, পাঠককে গুরুত্ব দিলে সংবাদপত্রের মান বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করতে হয়। দক্ষ সাংবাদিক নিয়োগ, ন্যায্য পারিশ্রমিক, তথ্য যাচাই, আধুনিক উপস্থাপনা এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতার জন্য বিনিয়োগ করতে হয়। আর সংবাদপত্র যদি অন্য কোনো স্বার্থে পরিচালিত হয়, তাহলে এসব প্রয়োজনীয়তা সহজেই উপেক্ষিত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন সংবাদপত্রের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু সংবাদপত্রের অস্তিত্ব যখন প্রধানত বিজ্ঞাপন, প্রভাব কিংবা অন্য কোনো সুবিধা অর্জনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন পাঠকের প্রয়োজন গৌণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরিস্থিতি এমনও হতে পারে যে সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্দেশ্য পাঠকের কাছে বিজ্ঞাপন পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং বিজ্ঞাপন বা অন্য সুবিধা অর্জনের জন্য সংবাদপত্রের অস্তিত্ব বজায় রাখা। তখন সংবাদপত্রের সংখ্যা বাড়লেও সাংবাদিকতার মানোন্নয়নের নিশ্চয়তা থাকে না।

লোকসমাজের অভিজ্ঞতা

যশোরের সাংবাদিকতায় কাজ করতে গিয়ে আমি এমন একজন প্রকাশককে দেখেছি, যিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েও তাঁর মালিকানাধীন সংবাদপত্রকে কেবল রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ারে পরিণত করেননি। তিনি দৈনিক লোকসমাজের প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক প্রয়াত তরিকুল ইসলাম।

সফল রাজনীতিক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতায়, তিনি লোকসমাজকে কেবল রাজনীতির কাগজ বানিয়ে রাখেননি। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের যথেষ্ট স্বাধীনতা দেওয়ার দৃষ্টান্ত রেখেছেন। বিভিন্ন ধরনের সংবাদ প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সংবাদপত্রের পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতা গড়ে উঠেছিল সংবাদকে কেন্দ্র করেই।

এর ফলে লোকসমাজ শুধু যশোর জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও নিজের পরিচিতি বিস্তার করতে পেরেছে। পাঠক সংবাদ পড়ার জন্য পত্রিকাটি খুঁজে নিয়েছেন। আর পাঠকের সেই আগ্রহই সংবাদপত্রটির দীর্ঘ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে লোকসমাজের প্রকাশনা অব্যাহত থাকার পেছনে পাঠকের সঙ্গে এই সম্পর্কের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।

এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বুঝিয়েছে—সংবাদপত্রের মালিকের রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই তাঁর সংবাদপত্র রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হবে, এমন কোনো অনিবার্যতা নেই। মালিক চাইলে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ও সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় দায়িত্বকে পৃথক রাখতে পারেন। সংবাদপত্রকে পাঠকের আস্থার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।

দুঃখজনক হলো, দেশের ক্ষমতার পালাবদলের রাজনীতিতে মালিকানার পরিচয়ের কারণে দৈনিক লোকসমাজও রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার হয়েছে। অথচ সংবাদপত্রের বিচার হওয়া উচিত তার প্রকাশিত সংবাদ, পেশাগত দায়িত্ব ও জনস্বার্থে ভূমিকার ভিত্তিতে; মালিকের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।

লোকসমাজের অভিজ্ঞতা থেকে আমার উপলব্ধি, সংবাদপত্রের স্থায়িত্ব শুধু মুদ্রণযন্ত্র, প্রকাশনার অনুমোদন কিংবা আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা, সংবাদকর্মীদের পেশাগত মর্যাদা এবং পাঠকের আস্থা। এসবের কোনো একটি দুর্বল হয়ে পড়লে সংবাদপত্রের বাহ্যিক অস্তিত্ব টিকে থাকলেও তার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সামনে এগোনোর পথ

প্রযুক্তির বিকাশকে জেলা সাংবাদিকতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখার কারণ নেই। বরং এটি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। কম খরচে সংবাদ প্রস্তুত ও উপস্থাপনা, ডিজিটাল সংস্করণ প্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ছবি, ভিডিও ও তথ্যচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরার সুযোগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি।

এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রথমেই সংবাদপত্রের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করতে হবে। সংবাদপত্র কি পাঠকের জন্য, নাকি অন্য কোনো স্বার্থে—এই প্রশ্নের উত্তর মালিক ও সম্পাদককে নিজেদের কাছেই পরিষ্কার করতে হবে। এরপর প্রয়োজন পেশাদার জনবল, ন্যায্য পারিশ্রমিক, প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং তথ্য যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা।

একই সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকেও পেশাগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাংবাদিকদের অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের নৈতিকতা রক্ষায় কাজ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদেরও সংবাদপত্রের নিয়মিত প্রকাশনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

সবশেষে, পাঠকের আস্থাকে সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ, পাঠক না থাকলে সংবাদপত্রের অস্তিত্বের অর্থ থাকে না। প্রযুক্তি দিয়ে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়, কিন্তু আস্থা অর্জন করতে হয় নির্ভরযোগ্য সংবাদ দিয়ে। আকর্ষণীয় পৃষ্ঠাসজ্জা পাঠককে সংবাদ পড়তে উৎসাহিত করতে পারে, কিন্তু তাঁকে নিয়মিত পাঠকে পরিণত করে সংবাদপত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা।

হাতে কম্পোজের যুগ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান সময় পর্যন্ত সাংবাদিকতার পরিবর্তন নিজের চোখে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। একসময় যে কাজ করতে গিয়ে সহকর্মীদের বাড়তি পরিশ্রমের কারণ হতাম, আজ প্রযুক্তির সহায়তায় তার অনেক কিছুই নিজে করতে পারছি। এই পরিবর্তন আমাকে আশাবাদী করে। কিন্তু সেই আশাবাদের সঙ্গে একটি প্রশ্নও থেকে যায়—প্রযুক্তি যখন এত সহজে সংবাদপত্রের কাজকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে, তখন জেলা সাংবাদিকতা কেন প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারছে না?

আমার উত্তর, সমস্যার বড় অংশ প্রযুক্তির অভাবে নয়; বরং প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর সদিচ্ছা, পেশাদারত্বের ঘাটতি এবং গণমাধ্যমের উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতির মধ্যে নিহিত। সংবাদপত্রকে যদি ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থের সীমা থেকে বের করে পাঠকের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যায়, তাহলে জেলা সাংবাদিকতার সামনে এখনও বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রযুক্তি সেই পথ সহজ করতে পারে। কিন্তু পথটি বেছে নেওয়ার দায়িত্ব সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক ও সাংবাদিকদেরই।