আমার সহোদর কমরেড দীপু

0
আমার সহোদর কমরেড দিপু
আবুল বাশার সাইফুদ্দৌলা :

শহীদ কমরেড আবুবকর জাফরুদ্দৌলা দীপু ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার হাকিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় কায়ুর কমরেডদের নেতার নাম ছিল আবুবকর। কমরেড দীপুর পিতা প্রয়াত আব্দুল হাসিব ব্রিটিশবিরোধী কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর সন্তানও যেন সেই আদর্শ ধারণ করে বড় হয়, এমন চিন্তা থেকেই ছেলের নাম রেখেছিলেন আবুবকর। সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করে শহীদ কমরেড দীপু তাঁর নামের সার্থকতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

শহীদ কমরেড দীপুর পিতা প্রয়াত সাংবাদিক আব্দুল হাসিব ছিলেন প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার অধিকারী। অবিভক্ত কমিউনিস্ট আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। পেশাগত জীবনে প্রথমে খাদ্য অধিদপ্তরে এবং পরবর্তীকালে একটি বিমা কোম্পানিতে সফল কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি যশোর প্রেসক্লাব এবং পরবর্তীকালে প্রেসক্লাব যশোর প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন। সর্বশেষ তিনি দীর্ঘদিন দৈনিক লোকসমাজের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

আব্দুল হাসিবের নয় সন্তানের মধ্যে কমরেড দীপু ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর বড় বোন অধ্যাপক নার্গিস বেগম বর্তমানে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কমরেড দীপুর ভাগনে, যশোরের গণমানুষের নেতা অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এমপি বর্তমানে সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন।

কমরেড দীপুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় সাতক্ষীরা শহরের জুবিলী প্রাইমারি স্কুলে। পেশাগত কারণে তাঁর পিতা আব্দুল হাসিব যশোরে চলে এলে দীপু ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী যশোর সম্মিলনী ইনস্টিটিউশনে। সেখানে অধ্যয়নকালে ১৯৫৮ সালে আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হলে তিনি ছাত্ররাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। পড়াশোনার পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে থাকেন।

১৯৬৪ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি যশোরের এমএম কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে আইএসসি ও বিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এমএম কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে সংগঠনের প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রেরণার উৎস ছিলেন বড় বোন নার্গিস বেগম। সে সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) যশোর জেলা কমিটির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন।

১৯৬৮-৬৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবল আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। এমনই এক সময়ে যশোর এমএম কলেজে তৎকালীন সরকারি ছাত্রসংগঠনের ছত্রচ্ছায়ায় আইয়ুব খানের ‘উন্নয়নের এক দশক’ পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে যে ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, সেখানেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন শহীদ কমরেড দীপু।

আমার সহোদর কমরেড দীপু
শহীদ কমরেড আবুবকর জাফরুদ্দৌলা দীপু – ফাইল ফটো

ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত থাকা অবস্থাতেই কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে কমরেড আসাদ, কমরেড তোজো, কমরেড নজরুল, কমরেড হাফিজ ও কমরেড মানিকের মতো তিনিও কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৭০ সালে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতি ছেড়ে গ্রামে চলে যান এবং কমিউনিস্ট পার্টির গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে পুরোপুরি সম্পৃক্ত করেন।

১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ যশোর কারাগার ভেঙে কমরেড অমল সেন, কমরেড বৈদ্যনাথ বিশ্বাস, কমরেড অ্যাডভোকেট সৈয়দ গোলাম মোস্তফা ও গোকুল বিশ্বাসকে মুক্ত করার অভিযানে শহরের পার্টি কমরেডদের মধ্যে কমরেড মহিউদ্দিন আলী আখতার, কমরেড মতিন মুনির, কমরেড নূর মোহাম্মদ, কমরেড আসাদ, কমরেড নজরুল ও কমরেড শান্তির সঙ্গে কমরেড দীপুও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭১ সালের জুলাই মাসে পার্টির হেডকোয়ার্টার শালিখার পুলুম গ্রামে কমরেড নূর মোহাম্মদের সঙ্গে চলে যান কমরেড দীপু। ওই বছরের ১৩ অক্টোবর নড়াইলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকাররা নলদী বাজারে নেমে দ্রুতগতিতে আক্রমণ চালায়। এ সময় সম্মুখযুদ্ধে যশোবন্তপুরে নয়জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। ওই যুদ্ধে কমরেড পন্টু শহীদ হন। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে কমরেড দীপু কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে যান।

ইপিসিপি (এমএল) ১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বাহিনী বিলুপ্ত ঘোষণা করে। এ সময় কমরেড দীপু অন্য কমরেডদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বলেছিলেন, বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে। এরপর তিনি নড়াইল জেলার খলিসাখালী গ্রামে অবস্থান করেন। পরবর্তীকালে নলদীচর গ্রামের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে বাঘারপাড়া উপজেলার বাড়ী গ্রামে অবস্থান নেন।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি কমরেড দীপু প্রচুর পড়াশোনা করতেন এবং লেখালেখিতে যুক্ত ছিলেন। ‘প্রাথমিক রাজনীতি’ নামে একটি বই তিনি লিখে গেছেন। ১৯৭৭ সালে বইটি সাপ্তাহিক গণশক্তিতে প্রকাশিত হয়েছিল। এ ছাড়া মার্কসীয় দর্শনের ওপরও তিনি বেশ কিছু লেখা লিখে গেছেন।

১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি বাহিনী যখন পূর্ব বাংলার নিরস্ত্র জনগণের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়, তখন কমরেড দীপুর মতো অকুতোভয় সূর্যসন্তানরাই সর্বপ্রথম সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে এসব সূর্যসন্তানের মধ্যে কমরেড আসাদ, মানিক, শান্তি, তোজো, ফজলু, ইসহাক, নজরুল, হাফিজ ও হেমসহ কমিউনিস্ট পার্টির অসংখ্য সদস্য শহীদ হন।

১৯৭১-পরবর্তী সময়ে, অর্থাৎ ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত তৎকালীন মুজিব সরকারের জাতীয় রক্ষীবাহিনীর হাতে কমরেড সিরাজ শিকদারসহ ৩৪ হাজার বামপন্থী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হত্যা ও গুমের শিকার হন বলে বামপন্থী রাজনৈতিক পরিসরে অভিযোগ রয়েছে। কমরেড দীপুও তাঁদের একজন।

১৯৭৪ সালের ১ নভেম্বর কমরেড দীপু ঘোপের বাসা থেকে বের হয়ে বাবলাতলা-ঢাকা রোড সেতুর কাছ থেকে কালীগঞ্জগামী বাসে যাত্রা করেন। ওই বছরের ৪ নভেম্বর কয়েকজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে কোটচাঁদপুরের পুষ্পবলরামপুর গ্রামে পার্টি নির্ধারিত স্থানে সভা করতে গেলে রক্ষীবাহিনী সেখানে অতর্কিত হামলা চালায়।

সেখানে উপস্থিত কমরেড দীপু (গোপন নাম গোরা), কমরেড রাশিদা (গোপন নাম ঝর্ণা), কমরেড মহিউদ্দিন বিশ্বাস (গোপন নাম আলো), কমরেড হায়দার আলী গাজী ও কমরেড তবিবর গ্রেপ্তার হন। রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা কমরেড তবিবর ছাড়া বাকিদের হত্যা ও গুম করে। গ্রেপ্তারের পর পথিমধ্যে কমরেড তবিবর বাওড়ে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। উল্লেখ্য, কমরেড মহিউদ্দিন ও কমরেড ঝর্ণা আপন ভাইবোন ছিলেন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে যখন কমিউনিস্ট আন্দোলন নতুন করে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই শহীদ হন কমরেড দীপু। বিরাট বিপর্যয়ের পর নিজ মেধা ও যোগ্যতায় কমরেড দীপু তদানীন্তন ইপিসিপি (এমএল)-এর বৃহত্তর যশোর জেলা কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

শহীদ কমরেড দীপুর স্বপ্ন ছিল সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা। তাঁর আত্মত্যাগ সেদিনই সার্থকতা লাভ করবে, যেদিন এ দেশে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।

লেখক: শহীদ কমরেড দীপুর আপন ছোট ভাই।