তামাকের বিরুদ্ধে তরুণদের সচেতনতা: নিকোটিন আসক্তি, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

তামাকের প্রলোভন নয়, সুস্থ জীবনের অঙ্গীকার—তরুণদের সচেতনতাই পারে গড়তে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ

0

শিকদার খালিদ, লোকসমাজ : বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ। দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ভর করছে এই প্রজন্মের ওপর। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, তামাকজাত পণ্যের সহজলভ্যতা, কৌশলী বিপণন এবং সামাজিক প্রভাবের কারণে ক্রমেই বেশি সংখ্যক তরুণ ধূমপান ও তামাক ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ফলে জনস্বাস্থ্য, পারিবারিক অর্থনীতি এবং জাতীয় উন্নয়নের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আজ বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস।দিবসটিকে সামনে রেখে দেশের তরুণ প্রজন্মের ওপর তামাক পণ্যের আগ্রাসনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য—‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি’।

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস আজ
সংগৃহীত ছবি

দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তামাকের বিরুদ্ধে জনগণকে, বিশেষ করে তরুণদের সচেতন করতে প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, সংশ্লিষ্ট সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, তামাক চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিল ও প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি তামাক ব্যবহারে বহুগুণ বেড়ে যায়।

তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকজনিত রোগে প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। কর্মক্ষম মানুষের অকাল মৃত্যু ও অসুস্থতায় পরিবারগুলো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জাতীয় উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হয়।

তরুণরাই প্রধান লক্ষ্য

বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক কোম্পানিগুলোর প্রধান লক্ষ্যবস্তু এখন তরুণ ও কিশোররা। কৌতূহল, বন্ধুদের প্রভাব, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ভ্রান্ত ধারণা এবং মানসিক চাপের কারণে অনেকেই অল্প বয়সে তামাকের সংস্পর্শে আসে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী অন্তত ৩ কোটি ৭০ লাখ কিশোর-কিশোরী নিয়মিত তামাক ব্যবহার করে। তাদের নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডে আসক্ত করতে কোম্পানিগুলো নানা কৌশল অবলম্বন করে। সুগন্ধিযুক্ত তামাকপণ্য বাজারজাতকরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতা তার মধ্যে অন্যতম।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) গবেষণায় দেখা গেছে, ২১ বছর বয়সের আগেই যারা তামাকে আসক্ত হয়, তাদের মধ্যে আজীবন নিকোটিন নির্ভরতার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান ‘প্রজ্ঞা’র নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের বলেন, দেশের প্রায় ৪৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী তরুণ। এ কারণেই তামাক কোম্পানিগুলোর মূল লক্ষ্যও এই বয়সী মানুষ। তিনি ই-সিগারেট ও ভ্যাপিংসহ নতুন প্রজন্মের তামাকপণ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে ভয়াবহ ক্ষতি :  বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহার করে। তামাকজনিত রোগে প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে।

২০২৪ সালে তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা এ খাত থেকে অর্জিত রাজস্ব আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। শুধু চিকিৎসা ব্যয় ও কর্মক্ষমতা হ্রাসজনিত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা।

তামাক কেবল একজন ব্যক্তির স্বাস্থ্য নষ্ট করে না, এটি একটি পরিবারের আর্থিক সক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। একজন তরুণ নিয়মিত সিগারেটের পেছনে যে অর্থ ব্যয় করে, তা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন বা সঞ্চয়ের কাজে ব্যবহার করা যেত।

পরিবেশেরও বড় শত্রু : তামাকের ক্ষতি শুধু মানুষের শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়; পরিবেশও এর কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৩১ শতাংশ বন নিধনের সঙ্গে তামাক চাষের সম্পর্ক রয়েছে। কক্সবাজার ও বান্দরবানের কয়েকটি উপজেলায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, তামাকপাতা শুকানোর কাজে এক বছরেই প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি কাঠ ব্যবহৃত হয়েছে।

বিশ্বের ১২৫টির বেশি দেশে প্রায় ৪০ লাখ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়। অথচ কৃষিজমির স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও তামাক চাষে ব্যবহৃত জমির পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১৩তম। বিশ্বের মোট তামাক উৎপাদনের প্রায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ আসে বাংলাদেশ থেকে।

সচেতনতার লড়াই আরও জোরদার করতে হবে : বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নাটক, সিনেমা ও বিভিন্ন অনলাইন কনটেন্টে ধূমপানকে অনেক সময় পরোক্ষভাবে আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে তরুণদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে আইন থাকা সত্ত্বেও অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাকজাত পণ্য বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

তরুণদের তামাকমুক্ত রাখতে প্রথম দায়িত্ব পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। অভিভাবকদের সচেতন আচরণ, শিক্ষকদের ইতিবাচক ভূমিকা এবং সহপাঠীদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে তামাকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়। তামাকজাত পণ্যের ওপর উচ্চ কর আরোপ, বিজ্ঞাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ বাড়াতে হবে।

তামাকের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল স্বাস্থ্য রক্ষার লড়াই নয়; এটি একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল প্রজন্ম গড়ে তোলার সংগ্রাম। আজকের তরুণদের তামাকমুক্ত রাখা গেলে আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে আরও সুস্থ, শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময়। তাই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে এসে তামাকবিরোধী সচেতনতা আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে হবে।