সুন্দরবনে আবার দস্যু আত্মসমর্পণের খবর, তবে মিলবে কি অস্ত্রের উৎসের হিসাব?

আত্মসমর্পণ ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে পুরোনো এক প্রশ্ন- দস্যুরা কি সত্যিই অপরাধের পথ ছাড়ছে, নাকি এটি আবারও “সাধারণ ক্ষমা” পাওয়ার কৌশল?

0

শিকদার খালিদ :
দস্যুদের অবাধ বিচরণে অস্থির হয়ে উঠেছে সুন্দরবন-এমন খবর বেশ কয়েক মাস ধরে গণমাধ্যমে মিলছে। দীর্ঘ কয়েক বছর শান্ত থাকার পর সুন্দরবনের নদী-খালজুড়ে নতুন করে সক্রিয় হয়েছে বন ও জলদস্যু চক্র। জেলে-মৌয়ালদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে উপকূলজুড়ে। এমন পরিস্থিতিতে আলোচনায় এসেছে সুন্দরবনের আলোচিত ‘ছোট সুমন বাহিনী’র আত্মসমর্পণের প্রস্তুতির খবর।
তবে এই আত্মসমর্পণ ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে পুরোনো এক প্রশ্ন- দস্যুরা কি সত্যিই অপরাধের পথ ছাড়ছে, নাকি এটি আবারও “সাধারণ ক্ষমা” পাওয়ার কৌশল?
২০১৮ সালের ‘দস্যুমুক্ত’ সুন্দরবন আবার কেন অশান্ত?
২০১৮ সালে সরকারের উদ্যোগে সুন্দরবনের ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু আত্মসমর্পণ করেছিল। সে সময় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র জমা দিয়ে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ঘোষণা দেয়। এরপর সরকারিভাবে সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আত্মসমর্পণ করা অনেক দস্যুই প্রকাশ্যে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও গোপনে নিজেদের নেটওয়ার্ক অক্ষত রেখেছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর সেই চক্রই আবার সংগঠিত হয়ে নতুন নামে সুন্দরবনে ফিরে আসে।
বর্তমানে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৮ থেকে ৯টি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি স্থানীয় সূত্রের।

সুন্দরবনে সম্প্রতি আটক বনদস্যু
-ফাইল ফটোছোট সুমন:       

আত্মসমর্পণ নাকি পুনর্বিন্যাস : ছোট সুমনের নাম নতুন নয়। ২০১৮ সালেও সে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে আবারও তার নাম উঠে এসেছে সুন্দরবনের দস্যুতার সঙ্গে।
প্রশ্ন উঠেছে যদি সে সত্যিই স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছিল, তাহলে আবার কীভাবে অস্ত্রধারী বাহিনী গড়ে উঠলো?
স্থানীয়দের অভিযোগ, আত্মসমর্পণের পরও অনেক দস্যু নিজেদের অস্ত্র পুরোপুরি জমা দেয়নি। বরং কিছু অস্ত্র আড়ালে রেখে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।
এখন ছোট সুমন আবার আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, এটি কি সত্যিকারের আত্মসমর্পণ, নাকি নতুন কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন?
সুন্দরবন এলাকার সূত্রগুলোর দাবি, বর্তমানে সুন্দরবনের দস্যু বাহিনীগুলোর কাছে রয়েছে-

সুন্দরবনে সম্প্রতি উদ্ধার আগ্নেয়াস্ত্র
ফাইল ফটো

একে-৪৭ রাইফেল, থ্রি-নট-থ্রি, পিস্তল, পাইপগান ও বিপুল তাজা গুলি। প্রশ্ন হচ্ছে, এই আধুনিক অস্ত্র কোথা থেকে আসছে? সুন্দরবনের মতো দুর্গম অঞ্চলে এত অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের পেছনে সংঘবদ্ধ চক্র না থাকলে তা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দস্যুদের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী অর্থদাতা ও গডফাদার চক্র। কিন্তু অভিযানে মাঠপর্যায়ের সদস্যরা ধরা পড়লেও নেপথ্যের অর্থদাতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
দস্যুদের সবচেয়ে বড় শিকার এখন সুন্দরবননির্ভর জেলে ও মৌয়ালরা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী-
নদীতে মাছ ধরতে গেলেই অপহরণের ভয়, মুক্তিপণের জন্য পরিবারের ওপর চাপ, গহীন বনে নির্যাতন ও জেলে বহরে হামলা ও লুটপাট। ফলে অনেক জেলে এখন সুন্দরবনে যেতে ভয় পাচ্ছেন। এতে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
যৌথ বাহিনীর অভিযান কতটা কার্যকর?
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, বাংলাদেশ পুলিশ ও বন বিভাগের যৌথ অভিযানে সম্প্রতি কয়েকজন দস্যু আটক হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে অস্ত্র ও গোলাবারুদও।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, এই চাপের মুখেই ছোট সুমন বাহিনী আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন শুধু কয়েকটি অস্ত্র জমা দিলেই কি সুন্দরবন আবার নিরাপদ হয়ে যাবে?
সাধারণ মানুষের শঙ্কা: ‘আত্মসমর্পণ’ যেন নাটক না হয়

সুন্দরবন জুড়ে এখন বনদস্যু আলোচনা
পাখির চোখে সুন্দরবন- সংগৃহীত ছবি

উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের বড় ভয় ২০১৮ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি। তাদের দাবি- আত্মসমর্পণকারীদের কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে, অস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিশ্চিত করতে হবে, অর্থদাতা ও গডফাদারদের শনাক্ত করতে হবে, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়া থাকলে সেটিও তদন্ত করতে হবে।
সচেতন মহল বলছে, শুধু মাঠপর্যায়ের দস্যু নয়, পুরো নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারলে সুন্দরবনে দস্যুতা পুরোপুরি নির্মূল হবে না।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের বিভিন্ন সূত্র বলছে- ছোট সুমনসহ তার কয়েকজন সহযোগীর আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি চলছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। সরকারি অনুমোদন ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
সুন্দরবনে দস্যুতা কি কেবল অপরাধ, নাকি সংগঠিত নেটওয়ার্ক?
বিশ্লেষকদের মতে, সুন্দরবনের দস্যুতা এখন আর শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি অস্ত্র, অর্থ, প্রভাব ও স্থানীয় নেটওয়ার্কনির্ভর একটি সংঘবদ্ধ কাঠামোতে রূপ নিয়েছে।
যতদিন পর্যন্ত অস্ত্রের উৎস বন্ধ না হবে, অর্থদাতারা গ্রেফতার না হবে, আত্মসমর্পণের পর পুনর্বাসন ও নজরদারি কার্যকর না হবে, ততদিন সুন্দরবনে দস্যুতার পুনরুত্থানের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

[প্রতিবেদনটি তৈরির জন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের সহায়তা নেওয়া হয়েছে]