সুন্দরবন ভাঙছে নদী ও সাগরে
কোলাজ এআই সহায়তায় - লোকসমাজ

সুন্দরবন থেকে ফিরে আবুল আহসান টিটু, লোকসমাজ : বলেশ্বর নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরে একটি পরিত্যক্ত ভবনের দিকে আঙুল দেখান বগী গ্রামের প্রবীণ নাসির পঞ্চায়েত। তিনি বলেন, “ছোটবেলায় ওই জায়গাটাই ছিল বনের অফিস। এখন সেখানে নদী। অফিসটা যেন নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করছে।”

নাসির পঞ্চায়েতের কথার মধ্যেই যেন ধরা পড়ে সুন্দরবনের এক নীরব সংকটের গল্প। যে বন যুগের পর যুগ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর উত্তাল সাগরের আঘাত থেকে বাংলাদেশের উপকূলকে রক্ষা করে এসেছে, সেই বনই এখন নদী ও সাগরের অব্যাহত ভাঙনের কাছে অসহায় হয়ে পড়ছে।

এই জায়গাটাই ছিল সুন্দরবনের অফিস। এখন সেখানে নদী। অফিসটা যেন নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করছে – লোকসমাজ

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পূর্বাঞ্চলের অন্তত ১২টি এলাকা বর্তমানে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। কটকা, কচিখালী, সুপতি, বগী, তেরাবেকা কিংবা মেহের আলীর চর—একটির পর একটি বনাঞ্চল, নদীতীর ও বন বিভাগের স্থাপনা ক্ষয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, গত সাত দশকে ঠিক কতটুকু বনভূমি নদী ও সাগরে হারিয়ে গেছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব নেই।

সাত দশকের ক্ষয়, অজানা ক্ষতির পরিমাণ

অবসরপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা আবুল বসার সুন্দরবনের পরিবর্তন দেখেছেন কয়েক দশক ধরে। তাঁর স্মৃতিতে এখনো স্পষ্ট ১৯৫০-এর দশকের দৃশ্য।

তিনি বলেন, “তাফালবাড়ী, গাবতলী আর বগী এলাকায় যখন ভাঙন শুরু হয়, তখন কেউ ভাবেনি এর প্রভাব এত দূর যাবে। এখন ফিরে তাকালে দেখি, কয়েক কিলোমিটার এলাকা আর নেই।”

তার মতে, গত প্রায় সাত দশকে বলেশ্বর নদীর পশ্চিম তীরে ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার ভূমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কিন্তু এই ক্ষতির কোনো পূর্ণাঙ্গ নথি নেই। বন বিভাগ, ভূমি বিভাগ কিংবা গবেষণা প্রতিষ্ঠান—কেউই দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করেনি।

ফলে সুন্দরবন কতটা ছোট হচ্ছে, কোথায় কত দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে কিংবা নতুন চর জেগে ওঠার মাধ্যমে কতটা ভূমি ফিরে পাওয়া যাচ্ছে—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর আজও অজানা।

রেমালের পর বদলে গেছে চিত্র

২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রেমাল সুন্দরবনের জন্য নতুন এক সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে বলে মনে করছেন বন কর্মকর্তারা।

শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. শরীফুল ইসলাম জানান, রেমালের পর অনেক এলাকায় ভাঙনের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নদীর তীর দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে, কোথাও কোথাও বনভূমি স্রোতের মুখে টিকতে পারছে না।

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে উজানের ঢল, জোয়ার-ভাটা এবং উত্তাল সাগরের প্রভাবে এই ক্ষয় আরও তীব্র হয়। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়টাকে বন কর্মকর্তারা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুম হিসেবে চিহ্নিত করেন।

বলেশ্বর নদীর তীরে বগী ফরেস্ট স্টেশনের ভবনটি এখন সুন্দরবনের সংকটের এক দৃশ্যমান প্রতীক- লোকসমাজ

ঝুঁকির মুখে বন ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রগুলো

বলেশ্বর নদীর তীরে বগী ফরেস্ট স্টেশনের ভবনটি এখন সুন্দরবনের সংকটের এক দৃশ্যমান প্রতীক।

একসময় কর্মচঞ্চল এই ভবন এখন পরিত্যক্ত। নদীর ভাঙনে যেকোনো সময় এটি ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বন বিভাগের কর্মীরা নিরাপত্তার কারণে অন্যত্র সরে গেছেন।

ডেপুটি রেঞ্জার বিপুলেশ্বর দেবনাথ বলেন, “নদী আমাদের অফিসের একেবারে কাছে চলে এসেছে। বাধ্য হয়ে কাঠের ঘরে বসে কাজ করছি।”

শুধু বগী নয়, মেহের আলীর চরের সাইক্লোন শেল্টার, জেটি, পানির পুকুর এবং দুবলার বেশ কয়েকটি বন অবকাঠামোও ভাঙনের মুখে।

কটকা অভয়ারণ্যের সাবেক স্টেশন কর্মকর্তা খলিলুর রহমান জানান, কটকার পুরোনো রেস্ট হাউস ইতোমধ্যে সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে।

সুন্দরবন কেন গুরুত্বপূর্ণ

সুন্দরবনকে শুধু একটি বন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা কিংবা রেমালের সময় এই বনই বাতাসের গতি কমিয়েছে, জলোচ্ছ্বাসের শক্তি শোষণ করেছে এবং লাখো মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় ভূমিকা রেখেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা তুহিন বয়াতী বলেন, “ঝড়ের সময় আমরা বুঝতে পারি সুন্দরবন কত বড় আশীর্বাদ। বন না থাকলে উপকূলের অবস্থা কী হতো, তা ভাবতেই ভয় লাগে।”

পরিবেশবাদী সংগঠন প্রদীপনের নির্বাহী পরিচালক ফেরদৌসউর রহমানের ভাষায়, “সুন্দরবনের আয়তন কমে যাওয়া মানে শুধু বন হারানো নয়; উপকূলের নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে যাওয়া।”

তথ্যহীনতার অন্ধকার

সুন্দরবনের ভাঙন নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো তথ্যের অভাব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ, দীর্ঘমেয়াদি উপকূলীয় জরিপ কিংবা ভাঙন পর্যবেক্ষণের সমন্বিত কোনো ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

এমনকি ভাঙন রোধে সম্ভাব্য প্রকল্প নিয়েও বন বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বক্তব্যে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়ের ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, কটকা এলাকায় সমুদ্রভাঙনের কারণে বন ধীরে ধীরে উত্তরের দিকে সরে যাচ্ছে এবং বর্তমানে অন্তত ১২টি স্থানে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—সাত দশক ধরে চলা এই ক্ষয়ের প্রকৃত পরিমাণ কত?

যে বন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলকে বারবার রক্ষা করেছে, সেই বনেরই যদি ক্ষয়ক্ষতির নির্ভরযোগ্য হিসাব না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা কীভাবে তৈরি হবে?

বলেশ্বরের পাড়ে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকা নাসির পঞ্চায়েতের কথাগুলো তখন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। তিনি বলেন, “নদী প্রতি বছর একটু একটু করে বনকে খেয়ে ফেলছে। আমরা চোখের সামনে দেখছি, কিন্তু কেউ যেন পুরো হিসাবটা রাখছে না।”

সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিয়েও এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সেখানেই—ক্ষয় চলছে, কিন্তু তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো অজানা।