মেসির বিদায়ের রাতে তোরেসের গোল, বিশ্বকাপের মুকুট স্পেনের

0
বিশ্বকাপজয়ের উল্লাসে স্পেনের খেলোয়াড়
বিশ্বকাপজয়ের উল্লাসে স্পেনের খেলোয়াড়

লোকসমাজ ডেস্ক॥ একটি গোল। ১০৫ মিনিটের অপেক্ষা। আর তারপরই ইতিহাস।

ফেরান তোরেসের অতিরিক্ত সময়ের গোলের ওপর ভর করে ১০ জনের আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে স্পেন। নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ১০৬তম মিনিটে করা তোরেসের গোলই নির্ধারণ করে দেয় বিশ্বফুটবলের নতুন চ্যাম্পিয়ন।

এই জয়ে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতল স্পেন। অন্যদিকে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্ন শেষ হলো ফাইনালে।

১০৫ মিনিটের অপেক্ষা, ৩৭ সেকেন্ডে ইতিহাস

ফাইনালের শুরু থেকেই স্পেন ছিল বেশি সক্রিয়। বলের দখল, পাসিং ও আক্রমণের ধারাবাহিকতায় তারা আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখে।

একপর্যায়ে স্পেনের ২০টি শটের বিপরীতে আর্জেন্টিনা স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমনকে কোনো সেভ করাতেই পারেনি। কিন্তু আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে ম্যাচে নিজের দলকে টিকিয়ে রাখেন।

নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

এরপর অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর মাত্র ৩৭ সেকেন্ডে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র।

বাঁ দিক থেকে পেদ্রো পোরোর ক্রস। নিকো উইলিয়ামসের হেডে বল ফিরে আসে বিপজ্জনক জায়গায়। সেখানেই অপেক্ষায় ছিলেন ফেরান তোরেস।

একটি শক্তিশালী ভলি।

মার্তিনেসকে পরাস্ত করে বল জালে।

স্পেন ১—আর্জেন্টিনা ০।

এই এক গোলই স্পেনকে এনে দেয় বিশ্বকাপের দ্বিতীয় শিরোপা।

তোরেস: নায়ক হওয়ার জন্য একটি গোলই যথেষ্ট

ফেরান তোরেসের জন্য এবারের বিশ্বকাপ ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার।

টুর্নামেন্টের ৭ ম্যাচে গোল না করা তোরেস ফাইনালের ১০৬তম মিনিটে এমন এক গোল করলেন, যা তাকে চিরদিনের জন্য বিশ্বকাপ ইতিহাসে লিখে রাখবে।

ম্যাচ শেষে তোরেস বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি বেশি কিছু ভাবিনি। বলটি আমার দিকে আসতে দেখেছি এবং পুরো স্পেনের শক্তি দিয়ে শট নিয়েছি।’

পুরো টুর্নামেন্টে তার একমাত্র গোল। কিন্তু সেই এক গোলই স্পেনের জন্য হয়ে উঠল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোল।

স্পেনের ফুটবল দর্শনের জয়

২০২৬ বিশ্বকাপ জিতেছে শুধু কোনো একজন তারকার নৈপুণ্যে নয়। স্পেনের সাফল্যের ভিত্তি ছিল দলগত ফুটবল।

বল দখল, ছোট ছোট পাস, দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন এবং প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ সময় বলের পেছনে ছুটতে বাধ্য করা—স্পেন আবারও তাদের পরিচিত ফুটবল দর্শনের সফল প্রয়োগ করেছে।

এই দলের মাঝমাঠে রদ্রি ছিলেন নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র। রক্ষণে পাও কুবার্সি ছিলেন দৃঢ়। গোলপোস্টের নিচে উনাই সিমন ছিলেন নির্ভরতার প্রতীক।

আক্রমণে ছিলেন তোরেস, নিকো উইলিয়ামসসহ একঝাঁক তরুণ প্রতিভা।

ফাইনালের নায়ক তোরেস হলেও বিশ্বকাপ জিতেছে পুরো স্পেন দল।

১০ জনের আর্জেন্টিনা, তবু লড়াই ছিল শেষ পর্যন্ত

ফাইনালে আর্জেন্টিনার জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে।

পাও কুবার্সির ওপর কঠোর ট্যাকলের পর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফের্নান্দেস। ফলে অতিরিক্ত সময়ে ১০ জনের দল হয়ে যায় বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।

এরপর স্পেনের চাপ সামলানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে এমিলিয়ানো মার্তিনেসের অসাধারণ গোলরক্ষণ আর্জেন্টিনাকে দীর্ঘ সময় ম্যাচে টিকিয়ে রাখে। ১১টি সেভ করে তিনি স্পেনের আক্রমণকে বারবার থামিয়ে দেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগত সুবিধা ও ধারাবাহিক চাপের সামনে আর্জেন্টিনার রক্ষণ ভেঙে পড়ে।

মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায়ের শেষ?

ফাইনালের পর ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এটাই কি লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ?

৩৯ বছর বয়সী মেসি এবারের টুর্নামেন্ট শেষ করেছেন ৮ গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট নিয়ে।

বয়সকে উপেক্ষা করে তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন, কেন তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বলা হয়।

কিন্তু ফাইনালে স্পেনের সংগঠিত মাঝমাঠ মেসিকে খুব বেশি সময় বলের দখলে রাখতে দেয়নি। রদ্রির নেতৃত্বে স্পেনের মিডফিল্ড মেসির প্রভাব অনেকটাই সীমিত করে দেয়।

যে মেসি বহুবার শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনাকে উদ্ধার করেছেন, এবার সেই জাদু আর দেখা যায়নি।

তবে একটি ফাইনালের পর মেসির উত্তরাধিকার শেষ হয়ে যায় না।

বরং তার বিদায়ের আবহের মধ্যেই ফুটবল বিশ্বে নতুন প্রজন্মের আগমন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

মেসির পরের ফুটবল প্রজন্ম

২০২৬ বিশ্বকাপের গল্পে শুধু মেসি বা এমবাপ্পে নন, সামনে এসেছে নতুন প্রজন্মের অনেক নাম।

স্পেনের পাও কুবার্সি, নিকো উইলিয়ামস, রদ্রি এবং দলের অন্যান্য তরুণ খেলোয়াড় দেখিয়ে দিয়েছেন, আগামী দিনের ফুটবল কাদের হাতে।

বিশেষ করে কুবার্সির পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। অল্প বয়সেই স্পেনের রক্ষণভাগে তার পরিণত ফুটবল তাকে বিশ্বকাপের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার এনে দিয়েছে।