এস আলম আমলে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগের নিয়ম বদল, বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ ৮ হাজার ৫৪২ জন

0

বিশেষ প্রতিনিধি : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণকালীন সময়ে নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন করে ব্যাপকসংখ্যক কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকটিতে ১০ হাজার ৮৩২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৪২ জনের নিয়োগে প্রচলিত নিয়োগবিধি অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিদর্শনে দেখা গেছে, এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আবেদন আহ্বান এবং লিখিত পরীক্ষা গ্রহণের মতো বাধ্যতামূলক ধাপগুলো অনেক ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি। প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

নীতিমালা পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া শিথিল

ইসলামী ব্যাংকের প্রচলিত নিয়োগবিধি অনুযায়ী বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আবেদন জমার জন্য ন্যূনতম ১৫ দিন সময় এবং লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার শর্ত ছিল। তবে ২০১৭ সালে ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তনের পর মানবসম্পদ নীতিমালার ৭.০৪ ধারায় সংশোধন এনে ‘জরুরি প্রয়োজন’ দেখিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে সরাসরি নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের ফলে মূল নিয়োগবিধির ৭.০১ ধারা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং প্রবেশ পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বাইরে সম্পন্ন করা হয়।

নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় অংশ চট্টগ্রামের

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলমের নিয়ন্ত্রণকালে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের মধ্যে ৮ হাজার ৯৯ জন ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগের বাসিন্দা। এর মধ্যে ৫ হাজার ১৪৮ জনের বাড়ি পটিয়ায়, যা এস আলমের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, জাতীয় পর্যায়ে উন্মুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না থাকায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চাকরিপ্রার্থীরা প্রতিযোগিতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ পাওয়ায় ব্যাংকে একটি কেন্দ্রীভূত ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

সিভি সংগ্রহে ব্যবহৃত হতো বিশেষ বাক্স

পরিদর্শনের সময় ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছে, চাকরিপ্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহের জন্য চট্টগ্রামের পটিয়ায় এস আলম গ্রুপ চেয়ারম্যানের বাড়ি এবং আসাদগঞ্জ কার্যালয়ে বিভিন্ন শ্রেণিভিত্তিক বাক্স রাখা হতো। ‘পটিয়া জেনারেল’, ‘পটিয়া ক্যাশ’, ‘পুরুষ জেনারেল’, ‘মহিলা’, ‘ডিপ্লোমা’সহ বিভিন্ন নামে চিহ্নিত এসব বাক্সে জমা পড়া সিভি থেকে প্রার্থী বাছাই করা হতো। পরে নির্বাচিতদের তথ্য ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

পাস নম্বর কমিয়ে নিয়োগের অভিযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ২৪তম প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচের নিয়োগ নিয়ে বিশেষ তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৯ সালের শুরুতে চট্টগ্রাম থেকে পাঠানো ৮৪০ জন প্রার্থীর তালিকা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ লিখিত পরীক্ষা নেয়।

নিয়ম অনুযায়ী পাস নম্বর ছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু মাত্র ৩৬ জন ওই মানদণ্ড পূরণ করায় পরে পাস নম্বর কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। এরপর ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১৯০ জনকে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের প্রায় সবাই চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

পদোন্নতিতেও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ

পরিদর্শন প্রতিবেদনে উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতির ক্ষেত্রেও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে উন্নীত হতে নির্দিষ্ট সময়ের অভিজ্ঞতা ও ন্যূনতম ২০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলমের ব্যক্তিগত সহকারী আকিজ উদ্দিন মাত্র আট বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিয়ে ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান। একইভাবে মিফতাহ উদ্দিনও নির্ধারিত অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ না করেই ডিএমডি হন।

বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা ও চাকরি অবসান

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের পর ইসলামী ব্যাংক ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ওই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৫ হাজার ৩৭৩ কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং সবাই উত্তীর্ণ হন। বাকি ৪ হাজার ৯৭২ জন পরীক্ষায় অংশ নেননি।

পরবর্তীতে শৃঙ্খলাভঙ্গ ও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে তিন মাসের বেতন পরিশোধ করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, কোনো ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ কার্যক্রমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি যুক্ত থাকে না। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে অনিয়মের তথ্য পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হোসাইন বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের শুধু নিয়োগপ্রক্রিয়ার কারণে চাকরিচ্যুত করা হয়নি। তাদের জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়ার ঘাটতি পূরণে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেকেই পরীক্ষায় অংশ নেননি এবং অন্যদের অংশগ্রহণেও বাধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সে কারণেই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।