পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ সংকট: ১৯৭১-এর শিক্ষা ও বর্তমান বাস্তবতা

0

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, লোকসমাজ : পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদ কোনো নতুন বাস্তবতা নয়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশটি জঙ্গিবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সামরিক অভিযানের জটিল চক্রের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এই সংকটের দায় কোনো নির্দিষ্ট প্রদেশ বা জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়াল হয়ে যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে পাঞ্জাবে অন্য প্রদেশ থেকে জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এমন উদ্বেগ অমূলক নয়। তবে কোনো অঞ্চলের ভেতর দিয়ে সন্ত্রাসীদের চলাচল এবং সেই অঞ্চলের জনগণকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে একাকার করে দেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। খাইবার পাখতুনখোয়া, বেলুচিস্তান, সিন্ধ কিংবা পাঞ্জাব—প্রতিটি প্রদেশেরই নিজস্ব রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতা রয়েছে। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়া দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গিবাদ ও সামরিক অভিযানের বড় চাপ বহন করেছে, আর বেলুচিস্তান ভুগছে রাজনৈতিক অসন্তোষ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংকটে।

পাকিস্তানের বর্তমান সন্ত্রাসবাদ সমস্যার শিকড় কেবল সাম্প্রতিক জঙ্গি তৎপরতায় সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বহু বছর ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি সব সময় এক ছিল না। কিছু সংগঠনকে কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, আবার অন্যদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, রাজনৈতিক বা কৌশলগত উদ্দেশ্যে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ব্যবহার করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। একসময় সেই গোষ্ঠীগুলোই রাষ্ট্রের জন্য হুমকিতে পরিণত হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা আসে ১৯৭১ সাল থেকে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায্যতা এবং প্রতিনিধিত্বের দাবিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও ক্ষমতা হস্তান্তরে ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে গড়ায়। শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের বিভক্তির মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, রাজনৈতিক সংকটকে শুধু নিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে তার স্থায়ী সমাধান হয় না। নাগরিকদের আস্থা, ন্যায়বিচার এবং সমান মর্যাদা নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রের ভেতরে অসন্তোষ জমতে থাকে। পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতেও এই শিক্ষা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় পাকিস্তানের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সব ধরনের সশস্ত্র গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে কি একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে? কোনো গোষ্ঠী বিদেশি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালালে তাকে সহনীয় এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরলে তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচনা করার নীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। সহিংসতা ও আইনের প্রশ্নে সবার জন্য একই মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করাই কার্যকর পথ।

নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান, জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধ এবং অস্ত্র সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই প্রয়োজন। তবে কেবল সামরিক পদক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, কার্যকর ফেডারেল কাঠামো, ন্যায়সংগত অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনগণের আস্থা অর্জনের প্রচেষ্টাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ কোনো এক প্রদেশের সৃষ্টি নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নীতি, রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় কৌশলের জটিল ইতিহাস। ফলে সমাধানের পথও প্রাদেশিক বিভাজনে নয়; বরং সমান নাগরিক অধিকার, একক নীতি এবং রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনের মধ্যেই নিহিত।

একটি রাষ্ট্র শুধু সীমান্ত রক্ষা করেই নিরাপদ হয় না; তাকে নাগরিকদের আস্থাও অর্জন করতে হয়। পাকিস্তানের জন্য ১৯৭১ সালের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই।