মহালয়া উদযাপনের মধ্য দিয়ে শনিবার শুরু হবে দুর্গোৎসবের ক্ষণগণনা

0
মহালয়া উদযাপনের মধ্য দিয়ে শনিবার শুরু হবে দুর্গোৎসবের ক্ষণগণনা। এবছর সারা দেশে ৩৩,৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং টানা ৫ দিনের সরকারি ছুটিতে বইছে উৎসবের আবহ।। ছবি: সংগৃহীত

মহালয়া উদযাপনের মধ্য দিয়ে শনিবার শুরু হবে দুর্গোৎসবের ক্ষণগণনা। হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা বহনকারী এই মহালয়া উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মন্দিরগুলোতে নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট আয়োজন করা হয়েছে। আগামী শনিবার ভোরে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন রাখা হয়েছে।

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুবাশীষ কুমার বিশ্বাস সাধন জানান, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে মহালয়া অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

এছাড়া শনিবার ভোরে ঐতিহ্যবাহী রমনা কালী মন্দিরেও আনুষ্ঠানিকভাবে মহালয়া উদযাপিত হবে বলে তথ্য নিশ্চিত করেছেন মন্দির পরিচালনা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মিন্টু বসু।

প্রথা ও শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, মহালয়া মূলত পিতৃপক্ষের (পূর্বপুরুষদের স্মরণে নিবেদিত কৃষ্ণপক্ষ) সমাপ্তি ঘটায় এবং একই সঙ্গে দেবীপক্ষের (শুভ পক্ষ) সূচনার বার্তা বয়ে আনে।

"এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে
দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে এবং
সরকারের বর্ধিত ছুটির সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক।"
 — 
বাসুদেব ধর 
সভাপতি, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ

সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশেষ পূজা ও ব্রাহ্মণদের বস্ত্র দানের মাধ্যমে তাঁদের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করবেন। এই দিনেই দেবী দুর্গা কৈলাসের নিজ দেবালয় থেকে মর্ত্যলোকে তাঁর পিত্রালয়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন, যা দুর্গাপূজা উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে থাকে।

ধর্মীয় রীতি ও তিথি সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল উপাসনালয়ের প্রধান পুরোহিত সাধন চক্রবর্তী জানান, এ বছর দেবী দুর্গা ঘোড়ায় (ঘোটক) চড়ে মর্ত্যে আগমন করবেন এবং নৌকায় চড়ে কৈলাসে বিদায় নেবেন।

সারাদেশের সার্বিক আয়োজন সম্পর্কে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর জানান, ‘এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে।’

আরও পড়ুন:
যশোরে দুর্গাপূজা প্রস্তুতি সভা: সম্প্রীতি রক্ষা, সীমান্ত নজরদারি ও গুজব প্রতিরোধে নির্দেশনা

 

এদিকে, উৎসবের মাহাত্ম্য ও আনন্দ বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় এবছর দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি আর্থিক অনুদান বিগত ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। এর ফলে স্বাভাবিক সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার ও শনিবারের সাথে এই বর্ধিত ছুটি যুক্ত হয়ে আগামী ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়া যাবে।

এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বিষয়ে বাসুদেব ধর বলেন, ‘এটি সত্যিই একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্তের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।’

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদও (বিএইচবিসিইউসি) দুর্গাপূজায় টানা তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্তকে সানন্দে স্বাগত জানিয়েছে।

"এ বছর দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে আসবেন
 এবং নৌকায় চড়ে বিদায় নেবেন।" 
— 
সাধন চক্রবর্তী
প্রধান পুরোহিত, জগন্নাথ হল উপাসনালয়

বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো বাংলাদেশেও বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজার প্রস্তুতি এখন পুরোদমে এগিয়ে চলছে। আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐতিহ্যবাহী এই পূজার মূল পর্ব শুরু হবে।

আনন্দময় পাঁচ দিনব্যাপী এই উৎসবকে সামনে রেখে সারা দেশের পূজা কমিটি, মন্দির ও স্থানীয় মণ্ডপগুলো তাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে ব্যস্ত সময় পার করছে। এর মধ্যে রয়েছে সুদৃশ্য প্যান্ডেল নির্মাণ ও সাজসজ্জা, প্রতিমা স্থাপন, আলোকসজ্জার ব্যবস্থা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সূচি তৈরি। উৎসব চলাকালীন ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।

পঞ্জিকা মতে, আগামী ১৬ অক্টোবর ‘মহা ষষ্ঠী’র মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে এবং মহা সপ্তমী, মহা অষ্টমী ও মহা নবমী পেরিয়ে ২১ অক্টোবর ‘বিজয়া দশমী’র প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে এর সমাপ্তি ঘটবে।

দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে মহাসপ্তমীর আগের দিন, অর্থাৎ মহাসষ্ঠীতে ‘কল্পারম্ভ’ এবং দেবীর প্রতিমা উন্মোচন বা ‘বোধনের’ মধ্য দিয়ে।

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে প্রতিমা শিল্পী মণ্ডপে মৃৎশিল্পীর নিপুণ তুলির ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলছেন দেবী দুর্গার রূপ।। ছবি: লোকসমাজ

মহাসপ্তমীতে অনুষ্ঠিত হবে ‘নবপত্রিকা’ বা ‘কলাবউ’ স্নান ও পূজা; এতে দেবীর বিভিন্ন রূপের প্রতীক হিসেবে নয়টি উদ্ভিদকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্নান করিয়ে বিশেষ পূজা করা হয়।

মহাষ্টমীতে অনুষ্ঠিত হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ভাবগম্ভীর ‘সন্ধিপূজা’, যা অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে পালন করা হয়। অন্যদিকে, মহানবমীতে পূজার শেষ ধাপের প্রধান আনুষ্ঠানিকতা ও দেবীকে ‘ভোগ’ নিবেদনের মহা আয়োজন থাকবে।

উৎসবের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য স্থানে মণ্ডপগুলো জমকালো সাজসজ্জা, বর্ণিল আলোকসজ্জা এবং নান্দনিক থিমের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে।

পুরো উৎসবজুড়ে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা মণ্ডপগুলোতে সমবেত হবেন; তারা প্রার্থনা করবেন, প্রসাদ গ্রহণ করবেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবেন।

দুর্গাপূজা কেবল একটি প্রধান ধর্মীয় উৎসবই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উৎসব হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এবং অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের একসুতোয় একত্রিত করে, যা দেশের দীর্ঘকালের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।

তবে, দুর্গাপূজা চলাকালীন সুরক্ষা ও নজরদারি জোরদার করতে কর্তৃপক্ষ ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) তৈরি একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করবে।

উৎসবের সার্বিক প্রস্তুতি হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পূজা মণ্ডপগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। একই সঙ্গে মণ্ডপ আয়োজকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা সার্বক্ষণিক জেনারেটর প্রস্তুত রাখেন এবং বিদ্যুৎ বা জেনারেটর বিকল হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ব্যাকআপ হিসেবে রিচার্জেবল লাইটের ব্যবস্থা রাখেন।

সূত্র: বিএসএস