একের পর এক গ্রেফতার, তবুও যশোরে পাড়া-মহল্লায় সক্রিয় কিশোর গ্যাং

0
একের পর এক গ্রেফতার, তবুও যশোরে পাড়া-মহল্লায় সক্রিয় কিশোর গ্যাং
প্রতীকী এআই ছবি- লোকসমাজ

স্টাফ রিপোর্টার, লোকসমাজ : যশোর শহরের রেলগেটের ‘ভাগ্নে ইমন’, খড়কী কলাবাগানের ‘পিচ্চি রাজা’, রায়পাড়ার ‘ভাইপো রাকিব’ ও শংকরপুরের ‘অনি’—স্থানীয়ভাবে আলোচিত এসব নামের সঙ্গে কিশোর গ্যাং ও বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি তাদের কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
গ্রেফতারের পর কয়েকটি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা কমেছে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ জানিয়েছেন। তবে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। পাড়া-মহল্লায় এখনও কিশোর ও উঠতি বয়সী তরুণদের একটি অংশ মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মারামারিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, যশোর শহর ও আশপাশে ৪০ থেকে ৫০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপে ৮ থেকে ১৬ জন করে সদস্য রয়েছে এবং তাদের বয়স ১৪ থেকে ২১ বছরের মধ্যে। পালবাড়ি, ধর্মতলা, শংকরপুর, বেজপাড়া, রায়পাড়া, তুলোতলা, ষষ্টিতলা, খড়কী, রেলগেট, চাঁচড়া, বারান্দিপাড়া, মণিহার, নীলগঞ্জ, বকচর ও উপশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের তৎপরতার অভিযোগ বেশি।
স্থানীয়দের মতে, যশোরে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার নতুন নয়। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট অপরাধীচক্র গড়ে উঠেছে। একসময় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনুসারী হিসেবে কিশোর-তরুণদের বিভিন্ন দলে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা থাকলেও পরে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের মধ্যে দল গঠনের প্রবণতাও বেড়েছে।

প্রথম দিকে মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা ও নিজেদের মধ্যে মারামারির মতো অপরাধ বেশি দেখা গেলেও কিছু গ্রুপের বিরুদ্ধে পরে মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, হামলা এমনকি হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ ওঠে।

একের পর এক গ্রেফতার, তবুও যশোরে  পাড়া-মহল্লায় সক্রিয় কিশোর গ্যাংসম্প্রতি পুরাতন কসবার ঘোষপাড়া এলাকায় ‘বিজয়’ নামে এক উঠতি বয়সী যুবকের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের হয়রানি ও চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় এক বাসিন্দার দাবি, নির্মাণাধীন একটি ভবনের মালিকের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিরাজুল ইসলাম বলেন, কিশোর গ্যাংসহ অপরাধীদের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চেকপোস্ট ও বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ সেপ্টেম্বর জেলার নয়টি থানা ও জেলা গোয়েন্দা শাখা একযোগে ৪৩টি স্থানে বিশেষ চেকপোস্ট বসায়। দিনব্যাপী অভিযানে ১ হাজার ৭০০টির বেশি যানবাহন তল্লাশি, ৩৪টি মোটরসাইকেল আটক এবং ১২টির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। একই অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্যকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে শুধু গ্রেফতার ও অভিযান যথেষ্ট নয়। অপরাধে কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার সামাজিক কারণগুলোও চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
যশোর পৌর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, কিশোর অপরাধীদের দৌরাত্ম্য শহরের আইনশৃঙ্খলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাদের দমনে পুলিশের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।
তরুণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাহমিদ আকাশও কিশোর অপরাধের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শুধু গ্রেফতার ও অভিযান নয়, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণ চিহ্নিত করে সামাজিক সংগঠনসহ বিভিন্ন পক্ষকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।