দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আলোচিত ‘হুন্ডি কাজল’ ভারতে মারা গেছেন

হুন্ডি কাজলের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও ক্ষতিগ্রস্ত বহু পরিবারের আর্থিক ক্ষতি ও বেদনার স্মৃতি এখনো মুছে যায়নি।

0

আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ , লোকসমাজ : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির অন্যতম অভিযুক্ত ও ‘হুন্ডি কাজল’ নামে পরিচিত ফারুক আহমেদ কাজল আর নেই। বুধবার রাত ৮টার দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার চাকদহ শহরের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল আনুমানিক ৭৫ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুরে ভারতের একটি স্থানীয় কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়। তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোটচাঁদপুর শহরে বসবাসকারী ছোট ভাই চঞ্চল শাহরিয়ার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আশির দশকে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে একজন ফুটবলার হিসেবে পরিচিত ছিলেন ফারুক আহমেদ কাজল। পরে ১৯৯৫ সালের দিকে তিনি অবৈধ হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। অল্প সময়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে তিনি একটি বৃহৎ আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
তৎকালীন সময়ে ঝিনাইদহ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ তার ব্যবসায় অর্থ লগ্নি করেন। অভিযোগ রয়েছে, অনেকেই জমিজমা ও সঞ্চয় বিক্রি করে সেখানে বিনিয়োগ করেছিলেন। পরবর্তীতে অর্থ হারিয়ে বহু পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে এবং এলাকায় সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের দাবি, ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে লগ্নিকারীদের বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান কাজল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় তিনি ও তার সহযোগীরা জড়িত ছিলেন। যদিও এ অর্থের পরিমাণের কোনো সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি।
অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ক্ষুব্ধ মানুষের চাপের মুখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম কোটচাঁদপুর সফর করেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্বাস দেন। তবে হারানো অর্থ আর উদ্ধার হয়নি বলে স্থানীয়রা জানান।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে কাজলের বিরুদ্ধে কোটচাঁদপুরসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। একপর্যায়ে তিনি গ্রেপ্তার হলেও পরে আদালত থেকে জামিন পেয়ে ভারতে চলে যান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছিলেন।
ভারতে অবস্থানকালে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এ নিয়ে পারিবারিক টানাপোড়েনও ছিল বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
কাজলের ভাই চঞ্চল শাহরিয়ার গণমাধ্যমকে বলেন, “আমাদের পরিবারের সঙ্গে কাজলের দীর্ঘদিন কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবে তার মৃত্যুর খবর সত্য। তিনি ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।”
এদিকে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার প্রথম স্ত্রী শামিমা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বর্তমানে তিনি কোটচাঁদপুর উপজেলার সলেমানপুর গ্রামে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
কোটচাঁদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনসারুল ইসলাম বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুন্ডি কাজলের মৃত্যুর খবর জেনেছি। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া তার নামে পাঁচটি গ্রেফতারি পরোয়ানাও ছিল।”
হুন্ডি কাজলের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও ক্ষতিগ্রস্ত বহু পরিবারের আর্থিক ক্ষতি ও বেদনার স্মৃতি এখনো মুছে যায়নি।