বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে ইন্টারনেট-রেল বন্ধ, ৪১ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন

0
দিল্লিতে সিজেপির বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে ৪১ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত এবং বহু ট্রেন ও মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে।। ছবি: সংগৃহীত

বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে ইন্টারনেট-রেল বন্ধ করা হয়েছে এবং শহরজুড়ে ৪১ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে এই ব্যাপক সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।

শনিবার যন্তর মন্তরে এই কর্মসূচি হওয়ার কথা থাকলেও দিল্লি পুলিশ এর অনুমতি দেয়নি। অনুমতি না নেওয়া, অতীতে আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা এবং বড় জমায়েতের কারণে নিরাপত্তা ও যান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও সিজেপির সদস্য ও সমর্থকেরা দিল্লিতে প্রবেশ করে জমায়েতের চেষ্টা করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন।

শুক্রবার রাত থেকেই রাজধানীতে নিরাপত্তার ব্যাপক প্রস্তুতি দেখা যায় এবং যন্তর মন্তরের চারপাশে একাধিক স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে দিল্লির পাশাপাশি প্রতিবেশী উত্তরপ্রদেশেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

রাজধানীতে ৪১ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশের ১৫ হাজারের বেশি সদস্যের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনীর অন্তত ২৬ হাজার সদস্য এতে অংশ নিচ্ছেন। নয়াদিল্লিকে ২০টি জোনে ভাগ করা হয়েছে এবং প্রতিটি জোনের দায়িত্বে উপকমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা রয়েছেন।

জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আজ নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে বিরোধীরা। বিক্ষোভের আগে গতকাল সেখানে অবরোধ তৈরি করে অবস্থান নেন নিরাপত্তাকর্মীরা ।। ছবি: সংগৃহীত

আন্দোলনকারীদের মিছিল আসতে পারে এমন ৩৭টি স্থান চিহ্নিত করে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশ থেকেও পাঁচ হাজার নিরাপত্তাকর্মী এনে দিল্লিতে মোতায়েন করা হয়েছে।

বিক্ষোভের আশঙ্কায় দেশের সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশপ্রধানদের চিঠি দিয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন। গত ৯ অক্টোবর পাঠানো ওই চিঠিতে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে চিঠিতে জানানো হয় যে, অনুমতি না থাকলেও সিজেপির সমর্থকেরা দিল্লিতে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারন। এ কারণে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং রাজধানীতে প্রবেশকারী যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দিল্লির সব খুচরা মদের দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কনট প্লেস, ভাগীরথ প্যালেস ও চাঁদনি চক বাজার কর্তৃপক্ষও দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করেছে।

যন্তর মন্তর, জনপথ, নির্বাচন কমিশনের দপ্তর ও দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তর ঘিরে প্রায় দেড় কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন রয়েছে।

যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার রাস্তাগুলোতে অন্তত সাত স্তরের ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। বিক্ষোভ চলাকালে আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য ১২টি আটককেন্দ্র প্রস্তুত করেছে দিল্লি পুলিশ। পাশাপাশি নয়াদিল্লি ও মধ্য দিল্লির হোটেল, লজ ও অতিথিশালাগুলোতেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠি চালাচ্ছেন। যন্তর মন্তরের কাছে, নয়াদিল্লিতে ।। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

নিরাপত্তার অংশ হিসেবে নয়াদিল্লি জেলার স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে অডিও ও ভিডিও ধারণের সুবিধাসহ তিনশটির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য বডি ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিস্থিতি ও পুলিশের পদক্ষেপ নথিবদ্ধ করতে প্রায় একশ জন আলোকচিত্রী ও ভিডিও ধারণকারীকে কাজে লাগনো হয়েছে।

জনপথ ও করতব্য পথের সংযোগস্থলকে কেন্দ্র করে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। ৯ অক্টোবর রাত ১০টা থেকে ১০ অক্টোবর রাত ১০টা পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এয়ারটেল, জিও, ভোডাফোন আইডিয়া ও এমটিএনএলকে এ নির্দেশ কার্যকর করতে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) সংশোধিত নির্দেশনায় ৪৫টি মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রেখেছে। ৯ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জনপথ, প্যাটেল চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, রাজীব চক, নয়াদিল্লিসহ গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের প্রবেশ ও বের হওয়া বন্ধ রয়েছে। তবে স্টেশনগুলোতে মেট্রোর লাইন পরিবর্তনের সুবিধা চালু রাখা হলেও নয়াদিল্লি স্টেশনে সেটি পাওয়া যাচ্ছে না।

নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রভাব পড়েছে রেল চলাচলেও। ১০ অক্টোবর সকাল চারটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত মোট ২৫৪টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭৫টি মেল ও এক্সপ্রেস এবং ১৭৯টি লোকাল ট্রেন রয়েছে। এর ফলে দিল্লির সঙ্গে গাজিয়াবাদ, মিরাট, পানিপথ ও কুরুক্ষেত্রের রেল যোগাযোগ প্রভাবিত হয়েছে। এছাড়া দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ প্রায় ৩০টি সড়ক চিহ্নিত করেছে যেখানে যান চলাচলে প্রভাব পড়তে পারে।

উত্তরপ্রদেশেও উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং দিল্লিসংলগ্ন মিরাট ও বেরেলি অঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলাকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। গৌতম বুদ্ধ নগর জেলায় ১০ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। দিল্লি-লখনউ রেল চলাচলেও প্রভাব পড়েছে এবং একাধিক ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।

সিজেপির আহ্বায়ক অভিজিৎ দীপক শুক্রবার রাতে জানিয়েছেন যে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, তবে তিনি নেতাকর্মীদের আন্দোলন না থামিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। একদিকে নিরাপত্তা জোরদার এবং অন্যদিকে মেট্রো, ট্রেন ও ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে রাজধানীর স্বাভাবিক জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সূ্ত্র: ইন্ডিয়া টুডে ও আনন্দবাজার