বিশেষ প্রতিনিধি: বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই বিতর্ক আবারও ফিরে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের ঐতিহাসিক সংগ্রহশালাকে ঘিরে।
সংস্কারের পর গত ১৩ সেপ্টেম্বর ডাকসুর আর্কাইভ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। সেখানে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি ও কিছু সংবাদপত্রের প্রতিবেদন স্থান পায়। এরপরই শুরু হয় বিতর্ক। ১৪ সেপ্টেম্বর এক সাবেক শিক্ষার্থী জিন্নাহর দুটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন। পরদিন একদল শিক্ষার্থী ডাকসুর প্রবেশপথ ও সংগ্রহশালার মেঝেতে জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি রেখে প্রতিবাদ জানান।
এই ঘটনাকে কেবল ছবি রাখা বা সরানোর প্রশ্ন হিসেবে দেখলে এর গভীরতর তাৎপর্য ধরা পড়ে না। মূল প্রশ্ন হলো—বিতর্কিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের কি ইতিহাসের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে, নাকি তাঁদের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে ইতিহাসের প্রদর্শনী থেকে বাদ দেওয়া হবে?
ইতিহাসের নথি মুছে ফেলার মাধ্যমে ইতিহাস বদলে যায় না। বরং কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রকে বোঝার জন্য তাঁর বক্তব্য, কর্মকাণ্ড, সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
জিন্নাহর ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার প্রশ্ন তাঁর ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়, কারণ তিনি ১৯৪৮ সালেই মৃত্যুবরণ করেন। তবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রের ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বিষয়ে তাঁর অবস্থান ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পরিষদের অন্যতম ভাষা করার প্রস্তাব দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা। কিন্তু প্রস্তাবটি গৃহীত হয়নি। একই বছরের মার্চে ঢাকায় এসে জিন্নাহ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর সেই বক্তব্যের বিরুদ্ধে তৎকালীন শিক্ষার্থীসমাজ প্রতিবাদ গড়ে তোলে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের দাবি স্বাধীন বাংলাদেশের দাবি ছিল না। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই বাংলার সাংবিধানিক স্বীকৃতি চেয়েছিলেন। ছাত্রসমাজও ভাষার অধিকার ও মর্যাদার দাবিতে আন্দোলন করেছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আন্দোলন বিস্তৃত হয়। ভাষার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি। দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় সেই আন্দোলন একসময় স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসও ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়নি। ১৯৪৭-৪৮ সাল থেকেই তমদ্দুন মজলিশ, ছাত্রসমাজ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে সক্রিয় ছিল। সভা, মিছিল, ধর্মঘট, গ্রেপ্তার ও প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে আন্দোলন ক্রমশ শক্তিশালী হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হওয়ার ঘটনা সেই আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয় এবং বাঙালির জাতীয় চেতনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
অতএব, ডাকসুর আর্কাইভে জিন্নাহর ছবি থাকলে শুধু তাঁর ছবি প্রদর্শন করাই যথেষ্ট নয়। তাঁর ভাষানীতি, ১৯৪৮ সালের রাজনৈতিক অবস্থান এবং সেই অবস্থানের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিক্রিয়ার দলিলও সেখানে থাকা উচিত। একইভাবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব, ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংগ্রামের নথিও উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
একই যুক্তি প্রযোজ্য জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও।
১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল—এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নথিভুক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা। দলটির তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের কয়েকজন নেতার ভূমিকা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমেও আলোচিত হয়েছে।
তবে ব্যক্তি, সংগঠন এবং নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক ভূমিকার মধ্যে পার্থক্য করাও জরুরি। কোনো ব্যক্তির ছবি একটি আর্কাইভে থাকা মানেই তাঁর সব কর্মকাণ্ডের সমর্থন নয়। বরং একটি ঐতিহাসিক সংগ্রহশালার দায়িত্ব হলো—কেন তিনি ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, কী অবস্থান নিয়েছিলেন এবং সেই অবস্থানের প্রভাব কী ছিল—তার দলিল উপস্থাপন করা।
গোলাম আযমের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা, ১৯৭১ সালের অবস্থান এবং স্বাধীনতার পরবর্তী কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়। এসব তথ্য বাদ দিলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে। আবার কেবল প্রতীকী প্রতিবাদ বা সমর্থনের মধ্যেও ইতিহাসের পূর্ণতা পাওয়া যায় না।
জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরেও ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনা ও ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নে দীর্ঘদিন আলোচনা হয়েছে। দলটির সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুর রাজ্জাকের মরণোত্তর প্রকাশিত স্মৃতিকথা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে দলের ভেতরে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এমনকি একটি খসড়া বিবৃতিও প্রস্তুত হয়েছিল, যদিও তা শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়নি।
এটিও ইতিহাসের অংশ। কারণ ইতিহাস শুধু বাইরের সমালোচনা দিয়ে তৈরি হয় না; কোনো সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক, আত্মসমালোচনা ও মতপার্থক্যও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
সাম্প্রতিক ছাত্ররাজনীতির বাস্তবতাও এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল অধিকাংশ কেন্দ্রীয় পদে জয়লাভ করে। এটি বর্তমান ছাত্ররাজনীতির একটি বাস্তবতা তুলে ধরে। তবে কোনো নির্বাচনী ফলাফল অতীতের ইতিহাসকে বাতিল করে না। একইভাবে অতীতের রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে বর্তমান প্রজন্মের প্রত্যেক সদস্যকে বিচার করাও সমীচীন নয়।
তরুণদের কী ভাবতে হবে বা কাকে সমর্থন করতে হবে—সেটি নির্ধারণ করার দায়িত্ব কোনো আর্কাইভের নয়। বরং তাদের সামনে তথ্য, দলিল ও প্রমাণ তুলে ধরাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তারা জিন্নাহর বক্তব্য পড়ুক, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব পড়ুক, ভাষা আন্দোলনের দলিল দেখুক, ১৯৭১ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবস্থান সম্পর্কে জানুক, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় পর্যালোচনা করুক, কিংবা জামায়াতের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক সম্পর্কেও অবগত হোক। এরপর তারা নিজেদের মতো করে ইতিহাসকে বুঝুক এবং প্রশ্ন তুলুক।
ইতিহাসের নথি যত বেশি উন্মুক্ত হবে, ইতিহাসকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রচারণা বা বিভ্রান্তির সুযোগ তত কমবে।
একটি জাদুঘর বা ঐতিহাসিক আর্কাইভের মূল দায়িত্বও এখানেই। এটি কোনো পক্ষের প্রচারমঞ্চ নয়, আবার কোনো পক্ষের ইতিহাস মুছে ফেলার স্থানও নয়। সেখানে দলিল, ছবি, সংবাদপত্র, বক্তব্য, সিদ্ধান্ত ও ঘটনাপ্রবাহ এমনভাবে উপস্থাপিত হওয়া উচিত, যাতে দর্শক নিজেই একটি সময়কে বুঝতে পারেন।
ডাকসুর আর্কাইভে জিন্নাহর ছবি থাকবে কি না—এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ছবির পাশে ইতিহাসের পূর্ণ প্রেক্ষাপট থাকবে কি না।
জিন্নাহ থাকলে তাঁর ভাষানীতির ইতিহাসও থাকবে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত থাকলে তাঁর প্রস্তাবও থাকবে। ভাষা আন্দোলনের দলিল থাকবে, ২১ ফেব্রুয়ারির শহীদদের ইতিহাস থাকবে। এরপর আসবে ছয় দফা, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, ক্ষমতা হস্তান্তর সংকট এবং ১৯৭১ সালের সামরিক অভিযান।
থাকবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। থাকবে স্বাধীনতার পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দলিলও। রাজাকার, আলবদর ও আলশামসের ভূমিকা সম্পর্কিত নথিও সেখানে স্থান পাবে।
কারণ ইতিহাসকে পছন্দমতো বেছে নেওয়া যায় না।
বাংলাদেশের জন্ম কোনো একক ঘটনা, ব্যক্তি বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল নয়। এটি ভাষার অধিকার, রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন, গণতান্ত্রিক দাবি এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের দীর্ঘ পথচলার ফল।
পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাভাবিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকতে পারে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগও থাকতে পারে। কিন্তু এসবের কোনোটি ১৯৭১ সালের ইতিহাসকে অস্বীকার করার কারণ নয়।
রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া আর ইতিহাস ভুলে যাওয়া এক বিষয় নয়। বরং অতীত সম্পর্কে সৎ থাকা পরিণত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে।
ডাকসুর সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই শুধু ছবি ছেঁড়া বা ছবি পদদলিত করার ঘটনা নয়। এটি আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও তুলে ধরে—আমরা কি ইতিহাসকে আবেগ দিয়ে দেখব, নাকি দলিল দিয়ে বুঝব?
ছবি ছিঁড়ে ফেলা ইতিহাসের সমাধান নয়। আবার বিতর্কিত কোনো ব্যক্তির ছবি রেখে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা গোপন করাও ইতিহাসচর্চা নয়।
ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর হলো ইতিহাসের পূর্ণ দলিল।
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা—সবকিছু মিলিয়েই বাংলাদেশের ইতিহাস। সেই ইতিহাস কোনো দেয়ালে টাঙানো একটি ছবি দিয়ে লেখা হয়নি; লেখা হয়েছে মানুষের ভাষার অধিকার, রাজনৈতিক আন্দোলন, ভোট, রক্ত, যুদ্ধ এবং আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে।
তাই ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক হোক, প্রশ্ন উঠুক, নতুন প্রজন্ম পুরোনো দলিল পড়ুক। কিন্তু প্রমাণিত ঘটনাকে বাদ দিয়ে নতুন ইতিহাস নির্মাণের চেষ্টা যেন না হয়।
কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো প্রতীক নয়—সত্য, দলিল এবং স্মৃতি।





