মানবতাবিরোধী অপরাধে ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড

0
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ পলাতক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। পাশাপাশি আসামিদের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।। ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত পলাতক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অন্য আসামিরা হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সাজাপ্রাপ্ত সাত আসামির সবাই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

আদালত ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খানের অর্জিত সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দিয়েছেন। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় এটি সপ্তম রায়। এর আগে গত বছরের ১৭ নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এ পর্যন্ত দুটি ট্রাইব্যুনালের সাত রায়ে ৬৮ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ২২ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ জনের মধ্যে ১৮ জন পলাতক এবং ৪ জন কারাগারে আছেন।

ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অপরাধ:

ওবায়দুল কাদের ।।ফাইল ছবি: সংগৃহীত

ট্রাইব্যুনালে উত্থাপিত আনুষ্ঠানিক অভিযোগে ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে তিনটি কাউন্টে সুনির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। প্রথম কাউন্টে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই সাদ্দাম হোসেনকে ফোনে ‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন’ বলে আন্দোলন দমনের সরাসরি নির্দেশ দেন তিনি। ১৪ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার উসকানিমূলক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে অপরাধে সমর্থন দেন। ১৫ জুলাই ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে মন্তব্য করে সারা দেশে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাতে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেন, যার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশে অন্তত ৩০০ শিক্ষার্থী আহত হন।

এ ছাড়া ১৬ জুলাই আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে ইন্টারনেট মন্থর করার নির্দেশ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে ফোন করে সব এলাকা দখলের নির্দেশ দেন কাদের। যার পরিপ্রক্ষিতে চট্টগ্রামে ওয়াসিম, শান্ত ও ফারুক এবং রংপুরে আবু সাঈদসহ ছয়জন নিহত হন।

দ্বিতীয় কাউন্টে বলা হয়, ১৭ ও ১৮ জুলাই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দলীয় নেতা-কর্মীদের রাজপথে নেমে প্রতিরোধের নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের। ১৯ জুলাই গণভবনে ১৪ দলের বৈঠক শেষে ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেন তিনি। শেখ হাসিনার সঙ্গে কথোপকথনে সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করে দায় আন্দোলনকারীদের ওপর চাপানোর ষড়যন্ত্র করেন। তাঁর এসব নির্দেশের পর ১৮ জুলাই থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য আন্দোলনকারী নিহত হন।

তৃতীয় কাউন্টে ৩ আগস্ট পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলন রুখে দেওয়ার নির্দেশ দিলে ৪ ও ৫ আগস্ট ঢাকা, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও রাজশাহীতে একাধিক আন্দোলনকারী নিহত হন। পুরো আন্দোলন জুড়ে তাঁর নির্দেশে ১,৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজার মানুষ আহত হন।

বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে অপরাধের বিবরণ:

আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ।। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

বাহাউদ্দিন নাছিমের বিষয়ে অভিযোগে বলা হয়, ১৫ জুলাই ওবায়দুল কাদেরের রাজাকারের জবাব দেওয়ার উসকানিমূলক বক্তব্যের সময় তিনি উপস্থিত থেকে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন। তাঁর প্ররোচনায় তাঁর নির্বাচনী এলাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদারীপুরে ব্যাপক হামলা চলে। নিজের জেলা মাদারীপুরে সাবেক মেয়র খালিদ হোসেনের মাধ্যমে আন্দোলন দমনে সার্বক্ষণিক তদারকি করেন তিনি, যেখানে ১৮ ও ১৯ জুলাই হত্যা ও জখমের ঘটনা ঘটে।

৪ আগস্ট কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে আন্দোলনকারীদের জামায়াত-শিবির, যুদ্ধাপরাধী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে উসকানি দেন। এর পরদিন পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল, গুলিস্তান, বাংলামোটর ও চাঁনখারপুল এলাকায় ১৩ জনকে হত্যা করা হয়।

মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে অপরাধের বিবরণ:

মোহাম্মদ আলী আরাফাত ।। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিষয়ে বলা হয়, ১৩ জুলাই তেজগাঁওয়ে এবং ১৪ জুলাই গণভবনে তিনি উসকানিমূলক বক্তব্যের সমর্থন ও প্ররোচনা দেন। ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশ করে হামলার নির্দেশ দেন তিনি। ১৯ জুলাই আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে ৫ বছরের অস্ত্র-গুলি মজুত থাকার হুমকি দেন। তাঁর নির্বাচনী এলাকা মহাখালীতে হামলায় ছয়জন নিহত হন, যা তিনি সার্বিক তত্ত্বাবধান করেছিলেন।

আন্দোলন দমনে সরকারের সহিংস আচরণ ঢাকতে ১৮ জুলাই বাংলা ভিশন, দেশ টিভি, চ্যানেল ২৪ ও এনটিভি এবং ২২ জুলাই বাংলা ভিশন ও চ্যানেল ২৪-এর সম্প্রচার ৩০ মিনিটের জন্য বন্ধ করে দেন তিনি। ৪ আগস্টও তিনি সংসদ ভবন এলাকায় প্রেস ব্রিফিংয়ে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে তা দমনের নির্দেশ দেন।

পরশ ও মাইনুলের বিরুদ্ধে অপরাধের বিবরণ:

মাইনুল হোসেন খান ও শেখ ফজলে শামস পরশ ।। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের নির্দেশে যুবলীগের নেতা-কর্মীরা অস্ত্রহাতে চট্টগ্রাম, মহাখালী, লক্ষ্মীপুর ও রাজশাহীতে গুলি চালিয়ে একাধিক আন্দোলনকারীকে হত্যা করে। ১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সর্বোচ্চ সতর্কতার নামে মরণকামড় দেওয়ার উসকানি দেন তিনি।

যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান ১২ জুলাই সিলেটে আন্দোলনকারীদের কটাক্ষ করে যুবলীগকে প্রস্তুতের নির্দেশ দেন। ১৯ জুলাই তিনি নিজে অস্ত্র হাতে নিয়ে মিরপুরে মহড়া দেন এবং তাঁর উপস্থিতিতে গুলিবর্ষণ করে আসিফ ইকবালসহ ২৬ জনকে হত্যা করা হয়। ৪ ও ৫ আগস্টও তাঁর তত্ত্বাবধানে একাধিক শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়।

সাদ্দাম ও ইনানের বিরুদ্ধে অপরাধের বিবরণ:

সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান ।। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ১১ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে আন্দোলনকারীদের হুমকি দেন। ওবায়দুল কাদেরের ‘মারো না কেন’ নির্দেশনা বাস্তবায়নে সাদ্দাম ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান অর্থ গ্রহণ ও পরিকল্পনা করেন। ১৫ জুলাই তাদের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বহিরাগত যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর পৈশাচিক হামলা চালায়।

১৬ জুলাই ইনানের উপস্থিতিতে সাদ্দাম শিক্ষার্থীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর সারা দেশে সহিংসতায় ৬ জন মারা যান এবং পরের দিনগুলোতে নির্বিচার গুলিতে শত শত শিক্ষার্থী শহীদ হন। সাদ্দাম ও ইনানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ও তদারকিতে ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা দেশজুড়ে হত্যাযজ্ঞ চালায়।