দালাল অস্ট্রেলিয়ার পরিবর্তে নিয়ে গেছে কাঠমান্ডু!

বাঘারপাড়ায় ছেলের নিখোঁজের সংবাদ, দালালের হুমকি ও কিস্তির চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এক দম্পতি

0

বাঘারপাড়া (যশোর) সংবাদদাতা, লোকসমাজ : অভাবের সংসারে সচ্ছলতা আনতে শ্রমিক ভিসায় কলেজপড়ুয়া ছেলেকে অস্ট্রেলিয়া পাঠাতে চেয়েছিলেন ভ্যানচালক পিত আলমগীর হোসেন। জমি বিক্রি করে, এনজিও এবং সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে ১৫ লাখ টাকাও তুলে দিয়েছিলেন দালালের হাতে। দালালচক্রটি ছেলে সাকিব হোসেনকে (২১) অস্ট্রেলিয়ার পরিবর্তে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে নিয়ে গেছে।

সেখানে একটি হোটেলে রেখে সাকিবের পাসপোর্ট ও কাছে থাকা এক লাখ টাকা মূল্যের ডলার নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর তাকে জিম্মি করে আরও দেড় লাখ টাকা দাবি করা হয়। দাবি মেটাতে আলমগীর হোসেন আয়ের একমাত্র সম্বল ভ্যানটি ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। একটি সমিতি থেকে উচ্চ সুদে আরও এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি দালালকে দেন। এরপর থেকে তিনি ছেলের আর কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না।

সবকিছু হারিয়ে এখন নিঃস্ব যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার বাসুয়াড়ি ইউনিয়নের কিসমত মাহমুদপুর গ্রামের আলমগীর-সোনালী দম্পতি।
ছেলেকে ফিরে পেতে আলমগীর হোসেন মামলা করেছেন। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি যশোরের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলাটি করেন। আদালত বাঘারপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে মামলাটি এজাহার হিসেবে রেকর্ড করার নির্দেশ দেয়। সে অনুয়ায়ী মামলাটি এজাহার হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। মামলায় বাঘারপাড়া উপজেলার কিসমত মাহমুদপুর গ্রামের মোকলেস মোল্যার ছেলে তরিকুল ইসলাম (৪৫) ও নাজমুল হোসেনকে (৩৫) আসামি করা হয়েছে।
আলমগীর হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ১৪ শতক জমির এক পাশে দুই কক্ষের একটি টিনের ঘর। ঘরের বারান্দায় দুই পাশে ইটের দেয়ালের দুটি ছোট কক্ষ। ঘরের পূর্ব পাশে ছোট একটি রান্নাঘর।
আলমগীর হোসেন বলেন, তার ২২ শতক জমি ছিল। এর মধ্যে ১৪ শতক ভিটাবাড়ি ও আট শতক জমিতে লিচুর বাগান। তার ইঞ্জিনচালিত একটি ভ্যান ছিল। তিন ছেলে-মেয়ে। দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে সাকিব হোসেন বাঘারপাড়া উপজেলার ছাতিয়ানতলা ইউনাইটেড স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিল। ছোট মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। ভ্যান চালিয়ে তিনি ছেলেমেয়ের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ চালাতেন।
আলমগীর হোসেন বলেন, একই গ্রামের নাজমুল হোসেন দীর্ঘদিন বিদেশ ছিলেন। দুই বছর আগে তিনি দেশে ফিরে আসেন। নাজমুল ও তার বড় ভাই তরিকুল ইসলাম অস্ট্রেলিয়ার শ্রমিক পদে কিছু ভিসা পেয়েছেন বলে জানান। বেতন মাসে এক লাখ টাকা। তারা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়ে ছেলে সাকিব হোসেনকে অস্ট্রেলিয়ায় কোম্পানিতে শ্রমিক পদে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ১৫ লাখ টাকা নেন। ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে তড়িঘড়ি করে লিচুর বাগানসহ আট শতক জমি কম মূল্যে মাত্র ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করেন বলে জানান আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, প্রথমে দুই দালালকে তিন লাখ টাকা দেন। কয়েক দিন পর দুই দালাল জানান, সাকিব হোসেনের অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা মঞ্জুর হয়েছে। এরপর তারা আলমগীরকে অস্ট্রেলিয়া সরকারের ভিসা মঞ্জুরের ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে অবশিষ্ট ১২ লাখ টাকা দাবি করেন। আলমগীর পাঁচটি এনজিও থেকে ঋণ করে এবং গ্রাম্য সমিতি থেকে উচ্চ সুদে ১১ লাখ টাকা নেন। জমি বিক্রির এক লাখ টাকা ও ঋণের ১১ লাখ টাকা তাদের দেন। তিন মাসের মধ্যে সাকিবকে অস্ট্রেলিয়ার নিয়ে কোম্পানির চাকরিতে যোগদান করিয়ে দেওয়া কথা। টাকা নেওয়ার পর তারা সাকিবকে ঢাকার উত্তরায় নিয়ে মেডিক্যাল পরীক্ষা ও আঙুলের ছাপ নেন।
গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর দুই ভাই সাকিব হোসেনকে বাড়ি থেকে নিয়ে যান বলে জানান আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, ১৪ সেপ্টেম্বর নেপালের কাঠমান্ডুতে নিয়ে একটি হোটেলে রাখেন। এরপর তারা সাকিবের কাছে থাকা পাসপোর্ট ও এক লাখ টাকা মূল্যের ডলার নিয়ে নেন। কিন্তু ছেলের সঙ্গে মা-পিতার মাঝেমধ্যে ফোনে কথা হতো। সেখানে তারা সাকিবকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বাংলাদেশি দেড় লাখ টাকা দাবি করেন। তিনি ভ্যান বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা ও সমিতি থেকে সুদে এক লাখ টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঠান। এরপর তারা আরও টাকা আদায়ের জন্যে সাকিবকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকেন। সাকিব বিষয়টি তার মা-পিতাকে জানান।
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার কিসমত মাহমুদপুর গ্রামের তরিকুল ইসলাম ও নাজমুল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তাদের পাওয়া যায়নি। মামলা করার পর থেকে তারা পলাতক আছেন। এ সময় কল করলে তাদের দুজনের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
তরিকুল ইসলামের স্ত্রী রুনা বেগমকে বাড়িতে পাওয়া যায়। স্বামী তরিকুল ইসলাম ও দেবর নাজমুল হোসেন কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, নাজমুল এখানে থাকেন না। তিনি মালয়েশিয়া থাকতেন। দেশে ফিরে তিনি শ্বশুরবাড়ি থাকতেন। এখন কোথায় আছেন জানেন না।
এদিকে ছেলে নিখোঁজ অবস্থায় কিস্তির টাকার জন্যে পরিবারকে চাপ দিচ্ছে বিভিন্ন এনজিও। অন্যদিকে দালালের তরফে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাঘারপাড়া থানার উপপরিদর্শক গোবিন্দ কুমার মণ্ডল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মামলাটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। মামলার আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।