বৈশাখের প্রথম ঝড়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বজ্রপাতে ৪ জন নিহত, ফসলের ক্ষতি 

শিলাবৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

0
বৈশাখী ঝড়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ক্ষতি

লোকসমাজ ডেস্ক॥ বৈশাখের তিন দিনের মাথায় বৃহস্পতিবার দুপুরে কালবৈশাখীর ঝড়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলায় বজ্রপাতে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
একই সঙ্গে শিলাবৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জে ঝড়ে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও ট্রান্সফরমার ভেঙে গাছের ওপর পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। মশ্বিমনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আনসার দেওয়ান জানান, এতে এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ে এবং জনসাধারণের চলাচল ব্যাহত হয়। এছাড়া ঝাঁপা বাঁওড়ের ওপর ভাসমান সেতুর বাঁধন ছিঁড়ে যাওয়ায় দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে মাঠের আধাপাকা ও কাঁচা বোরো ধান মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। ঝাঁপা ইউনিয়নের দোদাড়িয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ জানান, তার দুই বিঘা জমির ফুলকপি ও বাঁধাকপি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
এদিকে মনিরামপুর উপজেলার শাহপুর গ্রামে মাঠ থেকে ফেরার পথে বজ্রপাতে লুৎফর সরদার (৭২) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি মৃত বাবর আলী সরদারের ছেলে। স্থানীয়রা জানান, দুপুর আড়াইটার দিকে ঝড়-বৃষ্টির সময় বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। তার স্ত্রী অল্প দূরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। মনিরামপুর থানার ওসি রজিউল্লাহ খান জানান, এ ঘটনায় কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

যশোরের চৌগাছায় বজ্রপাতে দ্বিখণ্ডিত গাছ
চৌগাছা উপজেলার আড়কান্দি গ্রামে বজ্রপাতে একটি বিশাল কড়ই গাছ মগডাল থেকে গোড়া পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। গাছটির বিভিন্ন অংশ ছিটকে দূরে পড়ে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর ও দামুড়হুদা উপজেলায় পৃথক বজ্রপাতে এক কিশোরসহ দুজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন—জীবননগরের ঘোষনগর গ্রামের রাসেল হোসেন (২৫) এবং দামুড়হুদার পারকৃষ্ণপুর গ্রামের আজিমুদ্দিন (১৫)। তারা মাঠে কাজ ও খাবার নিয়ে যাওয়ার সময় বজ্রপাতে মারা যান।
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বাথানগাছি গ্রামে বৃষ্টির মধ্যে বাড়ির কাজ করার সময় বজ্রপাতে রোজিনা খাতুন (৩২) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। ‎রোজিনা খাতুন বাথানগাছি গ্রামের মিজানুর রহমানের স্ত্রী।
‎প্রতিবেশী আব্দুর রহমান জানান, বৃষ্টির মধ্যে গৃহস্থালির কাজ করছিলেন রোজিনা খাতুন। ওই সময় আকস্মিক বজ্রপাত তিনি গুরুতর আহত হন। স্বজনরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
‎মহেশপুর থানার ওসি মেহেদী হাসান জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে বজ্রপাতে রোজিনা নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। অভিযোগ না থাকায় মৃতদেহ দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মহেশপুরে বজ্রপাতে গৃহবধূর মৃত্যু যশোরের মনিরামপুর উপজেলারর বিভিন্ন অঞ্চলের মাঠে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সবজি ক্ষেত বিশেষ করে মাচা জাতীয় সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া কলা, পেঁেপ ক্ষেতের পাশাপাশি আম এবং কাঁঠালসহ মৌসুমী ফলের ক্ষতি হয়েছে। ঝাঁপা বাঁওড়ের ওপর নির্মিত ভাসমান সেতু ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়। যে কারণ মানুষ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া মশ্বিমনগর ইউনিয়নের পারখাজুরা এলাকায় ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙে বৈদুত্যিক খুঁটি ভেঙে পড়েছে। ঝড়ে বিপুল সংখ্যক গাছপালা উপড়ে পড়ে এবং অনেক ঘরের টিনের চাল উড়ে যায়। গাছ ভেঙে বিদ্যুতের খুঁটির ওপর পড়ায় বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। মনিরামপুরের কোমলপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল লতিফ মোড়ল বলেন, বৃষ্টি রোবো ধানের আশীর্বাদ হলেও ক্ষতির সম্ভাবনাও অনেক বেশি। ঝড়ো হওয়ায় ধান গাছ নুয়ে পড়েছে। আবার ধানের শীষ অনেক আগেই বেরিয়েছে। শিলাবৃষ্টিতে ধানে চিটা পড়ার সম্ভবনা অনেক বেশি থাকে।
যশোর বিমান বাহিনীর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ঘাঁটি নিয়ন্ত্রিত আবহওয়া অফিস সূত্রে জানা যায় বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ১৬ মিলিমিটার। বেলা ১ টা ১৫ মিনিটে ঝড়ো হাওয়ার গতি বেগ ছিল ঘন্টায় ১৬ নটিক্যাল মাইল। যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার হাদিউজ্জামান বলেন, ১৬টি বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়েছে। অসংখ্য জায়গায় গাছ পড়ে তার ছিঁড়ে গেছে। রাতের মধ্যে পুরোপুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শেখ আব্দুল কাদের বলেন, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। আহত ও নিহতের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ চলছে।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, ঝড়ের ক্ষয় ক্ষতি নিরপণ করা হয়নি কাজ চলছে। তবে মৌসুমের এই বৃষ্টি সার্বিক দিয়ে ফসলের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। বিশেষ করে ধানের জন্য খুবই প্রযোজন ছিল। সবজির জন্য অনেক দরকার ছিল। শিলাবৃষ্টি হয়েছে তবে এতে ফসলের খুব বেশি ক্ষতি হবে না। তবে কলা এবং পেপে গাছের কিছু ক্ষতি হয়েছে। তবে সার্বিক দিক বিবেচনায় ফসলের খুব বেশি ক্ষতি হবে না।
যশোরের কেশবপুর উপজেলায় ঝড়ের আঘাতে ইরি-বোরো আবাদ, ফলদ ও বনজ গাছের ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে পড়ে ৯ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনকে যশোরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২০ হেক্টর জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া আম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলজ গাছেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ লাইনের তার ছিঁড়ে ও গাছ পড়ে পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয়।