বেনাপোলে রাজস্ব আদায় কমেছে

0

মো. কামাল হোসেন, বেনাপোল ॥ দেশের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর বেনাপোলে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আদায় কমেছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এ সময়ে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ১৩ কোটি টাকা।

আমদানি-রফতানি বাণিজ্য কমে যাওয়া, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন ও বন্দরের অভ্যন্তরীণ নানা জটিলতাকে এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বেনাপোল কাস্টমস হাউজের জন্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ৪ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। কিন্তু এই সময়ে আদায় হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ১২০ দশমিক ৫ কোটি টাকা। ফলে ছয় মাসেই রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে প্রায় এক হাজার ১৩ কোটি টাকা।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার পতনের পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হওয়ায় আমদানি-রফতানি বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বেনাপোল বন্দরে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগে বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৫৫০টি পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করতো। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দৈনিক ৩০০ থেকে ৩৫০ ট্রাকে নেমে এসেছে। ট্রাক সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে আমদানির পরিমাণ ও রাজস্ব আদায়ও কমেছে।

বেনাপোল স্থলবন্দর সূত্রের তথ্য, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এ বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ১৫ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন পণ্য। অথচ আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট আমদানি হয়েছিল ১৮ লাখ ৬৩ হাজার ৪২০ মেট্রিক টন পণ্য। এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বাণিজ্যে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।

মাসভিত্তিক রাজস্ব পরিসংখ্যানেও ঘাটতির চিত্র স্পষ্ট। জুলাই মাসে লক্ষ্যমাত্রা ৫০৮ কোটি টাকা থাকলেও আদায় হয়েছে ৫৪৪ দশমিক ৪ কোটি টাকা। তবে পরের মাসগুলোতে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়। আগস্টে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৯৩ কোটি টাকা। আদায় হয় ৪৪৭ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে লক্ষ্যমাত্রা ৬০১ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয় ৫১৩ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা। অক্টোবরে ৬৪৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় মাত্র ৪৪৯ দশমিক ২৮ কোটি টাকা। নভেম্বরে ৭৫৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় ৫৬৪ দশমিক ৪১ কোটি টাকা। আর ডিসেম্বরে ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৬০০ দশমিক ৮১ কোটি টাকা।

কাস্টমস সূত্র জানায়, আগের তুলনায় উচ্চ শুল্কযোগ্য পণ্য যেমন শিল্প কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, যন্ত্রাংশ ও কেমিক্যাল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে কাস্টমস শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

তবে ব্যবসায়ীরা এই ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তাদের দাবি, শুধু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নয়, কাস্টমস ও বন্দরের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম, জটিলতা ও অতিরিক্ত শুল্কায়নের কারণেও আমদানিকারকরা বেনাপোল বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান স্বজন বলেন, কাস্টমসের নিচের স্তরের কিছু কর্মকর্তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষা করে পণ্যের অতিমূল্যায়ন করছেন। এর সঙ্গে বন্দরের নানা অনিয়ম যুক্ত হয়ে আমদানিকারকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে উচ্চ শুল্কযোগ্য পণ্য অন্য বন্দর দিয়ে আমদানি হচ্ছে। আর বেনাপোলের রাজস্ব কমছে।

বেনাপোল কাস্টমস হাউজের সহকারী কমিশনার মো. রাহাত হোসেন বলেন, আমরা শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা ও পণ্য খালাস দ্রুত করতে কাজ করছি। আশা করছি, অর্থবছরের শেষ দিকে রাজস্ব আদায়ে কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে।