ব্যবসায়ীসহ ৩ জনকে তুলে নিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগে তিন মামলা সাতক্ষীরার এমপি জগলুল, এসপি আনিস ও হাজী সুমনসহ ১৮ জনের নামে মামলা যশোরে

0

 

স্টাফ রিপোর্টার ॥ অপহরণ ও ক্রয়ফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগে  সোমবার যশোরের সাবেক পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অপসারিত কাউন্সিলর আলমগীর কবির সমুন ওরফে হাজী সুমন ও সাতক্ষীরার সাবেক সংসদ সদস্য এস এম জগলুল হায়দারসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে ৩টি মামলা হয়েছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামের মৃত আনছার মিয়ার ছেলে হাসান মিয়া, যশোর শহরের চাঁচড়া রায়পাড়ার তৈয়ব আলীর স্ত্রী রহিমন বেগম, একই এলাকার আজগর আলীর ছেলে মুরাদ হোসেন পনি মামলা তিনটি করেন। সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. গোলাম কিবরিয়া দুটি অভিযোগে এজাহার হিসেবে গ্রহণ করার জন্য কোতয়ালি থানার ওসি এবং অপর অভিযোগের তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সিআইডি যশোর জোনের বিশেষ পুলিশ সুপারকে আদেশ দিয়েছেন।
হাসান মিয়ার দায়ের করা মামলার আসামিরা হলেন, সাতক্ষীরা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম জগলুল হায়দার, শ্যামনগর উপজেলার নকিপুর গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জহুরুল হায়দার বাবু, যশোরের সাবেক পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, বাঘারপাড়ার খাজুরা পুলিশ ক্যাম্পের সাবেক এএসআই মাসুদুর রহমান, ডিবি পুলিশের সাবেক এসআই আবুল খায়ের মোল্লা, এসআই শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল মসফিকুজ্জামান, জহুরুল ইসলাম ও শফিকুল ইসলাম।
বাদী হাসান মিয়ার আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামান জানান, হাসান মিয়ার অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করার জন্য কোতয়ালি থানার ওসিকে আদেশ দিয়েছেন।
মামলায় হাসান মিয়া উল্লেখ করেছেন, তিনি শ্যামনগর বাজারে মেশিনারি ব্যবসার পাশাপাশি উপজেলা হাটবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১১ সালে তিনি উপজেলার ৩ নম্বর সদর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী ছিলেন। সেই সময় তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আসামি এস এম জগলুল হায়দার। ওই নির্বাচনে তারা দুই জনই পরাজিত হন। কিন্তু নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার কারণ হিসেবে এস এম জগলুল হায়দার হাসান মিয়ার প্রার্থীতাকে দায়ী করেন এবং তার ওপর ক্ষিপ্ত হন। এরপর ২০১৪ সালের বিনা ভোটের সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হিসেবে এস এম জগলুল হায়দার এমপি হন। এরপর থেকে তিনি তার ওপর নানাভাবে অত্যাচার এবং ১ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। ফলে ভয়ে হাসান মিয়া পরিবার পরিজন নিয়ে খুলনার হরিণটানা থানার জিরো পয়েন্টে বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস করতে থাকেন। আসামি যশোরের সাবেক পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান ও এএসআই মাসুদুর রহমানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো আসামি এস এম জগলুল হায়দার ও জহুরুল হায়দার বাবুর। এরই সূত্র ধরে পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান নির্দেশে এএসআই মাসুদুর রহমান গত ১৬ এপ্রিল রাতে খুলনার ডুমরিয়া বাজারের চৌরঙ্গীর মোড় থেকে হাসান মিয়াকে প্রাইভেটকারে তুলে যশোরের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। সেখানে হাসান মিয়াকে মারধর করা হয়। এ সময় পুলিশ সুপারসহ অন্য আসামিরা ক্রসফায়ারের হত্যা করার পরিকল্পনা করেন। তখন হাসান মিয়া তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানালে তারা তার কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। পরে হাসান মিয়া তার এক ভাইয়ের মাধ্যমে এএসআই মাসুদুর রহমানকে সাড়ে ১৩ লাখ টাকা প্রদান করেন। কিন্তু তাকে ছেড়ে না দিয়ে তার কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার দেখিয়ে কোতয়ালি থানায় মামলা করেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আবুল খায়ের মোল্লা ও এসআই শরিফুল ইসলম তার বিরুদ্ধে ওই মামলার ভিত্তিহীন চার্জশিট দাখিল করেন। পরে জামিনে মুক্তি পেলেও ওই সময় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করতে সাহস পাননি। বর্তমানে পরিবেশ অনুকুলে হওয়ায় তিনি আদালতে এই মামলা করেছেন।
এদিকে রহিমন বেগমের দায়ের করা মামলার আসামিরা হলেন, চাঁচড়া পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এসআই মো. মাসুদুর, কোতয়ালি থানার সাবেক ওসি রকিবুল হাসান ও কনস্টেবল খায়রুল।
বাদীর আইনজীবী এম এ গফুর জানান, রহিমন বেগমের অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সিআইডি পুলিশকে আদেশ দিয়েছেন আদালতের বিচারক।
রহিমন বেগম মামলায় উল্লেখ করেছেন, তার ছেলে সাব্বির দীর্ঘদিন ধরে চাঁচড়ায় মাছের পোনার ব্যবসা করে আসছেন। এ কারণে আসামিরা একজন সোর্সের মাধ্যমে সাব্বিরের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে রাজী না হওয়ায় আসামিরা তাকে হুমকি দেন। ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে বাড়ি ফেরেন। বিষয়টি জানতে পেরে আসামিরা বাড়িতে ঢুকে তাকে মারধর করেন। তারা এ সময় ফের তার কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকার করলে সাব্বিরকে জোর করে একটি মাইক্রোবাতে উঠিয়ে মালঞ্চী নামক স্থানে নিয়ে যান। সেখানে তার চোখে ও মুখে কালো কাপড় বেঁধে ক্রসফায়ারে হত্যার ভয় দেখান। ফলে ভয় পেয়ে যান সাব্বির। প্রাণ বাঁচাতে তিনি মোবাইল ফোন করে মা রহিমন বেগমকে টাকা নিয়ে আসতে বলেন। তখন রহিমন বেগম ৫ লাখ টাকা নিয়ে মালঞ্চীতে যান এবং আসামিদের হাতে দেন। কিন্তু আসামিরা সাব্বিরকে ছেড়ে না দিয়ে পরদিন দুটি পেন্ডিং মামলায় আটক দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করেন।
অপরদিকে মুরাদ হোসেন পনির দায়ের করা মামলার আসামিরা হলেন, চাঁচড়া পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এসআই জামাল হোসেন, সদর পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক টিএসআই রফিকুল ইসলাম, যশোর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হাজী সুমন, চাঁচড়া রায়পাড়ার মৃত ইয়াছিনের ছেলে সার্জেন্ট বাবু ও মৃত ভোমরের ছেলে খায়রুজ্জামান বাপ্পি।
মুরাদ হোসেন মনির মামলার আইনজীবী মো. আব্দুল্লাহ জানান, আদালতের বিচারক তার বাদীর অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করার জন্য কোতয়ালি থানার ওসিকে আদেশ দিয়েছেন।
মামলায় মুরাদ হোসেন পনির উল্লেখ করেছেন, বড় বাজারে তার কসমেটিক্সের দোকান রয়েছে। এছাড়া তিনি ইন্টারনেট ব্যবসার সাথে জড়িত। আসামি হাজী সুমনের সাথে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে তারই প্ররোচনা আসামি এসআই জামাল হোসেন ও টিএসআই রফিকুল ইসলাম ২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট রাত ১১টার দিকে অভিযোগ আছে বলে মুরাদ হোসেন পনিরকে বাড়ি থেকে ধরে থানায় নিয়ে যান। পরে তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস থানায় তার কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করেন এসআই জামাল হোসেন। দুই দিন পর ১ সেপ্টেম্বর সকালে ১২ লাখ টাকা সংগ্রহ করে আসামিদের হাতে তুলে দেন জান্নাতুল ফেরদৌস। এই টাকা নেওয়ার পর আসামিরা তার মুরাদ হোসেন পনিরকে ছেড়ে দেন।