সাবেক এমপি আফিল উদ্দিনের আশ্রয় প্রশ্রয়ের অভিযোগ শার্শার চারিদিকে আয়নাল বাহিনীর নির্মমতার ছাপ

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোরের শার্শা উপজেলার বাগডাঙ্গা গ্রামের আজিজুল হত্যার দায়ে ১৯৮১ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় শার্শার কন্যাদহের বাহিনী প্রধান আয়নাল হকের। ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় কারামুক্ত হয়ে আরবীয় পোশাকে জামায়াত বেশে ফেরেন এলাকায়। ১৯৯৬ সালে যোগ দেন আওয়ামী লীগে। সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে বিশস্ত আয়নাল হোসেন অল্প দিনেই হয়ে ওঠেন আফিল উদ্দিনের আস্থাভাজন। তাকে ব্যবহার করে ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন সাবেক সংসদ সদস্য আফিল উদ্দিন।

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে যশোরাঞ্চলে যে কয়জন সন্ত্রাসের গডফাদার মূর্তমান আতঙ্ক ছিল আয়নাল তার অন্যতম। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বাহিনী প্রধান আফিল উদ্দিনের আনুকূল্যে হয়েছেন নৌকা প্রতীকের ইউপি চেয়ারম্যান। জনপ্রতিনিধি হলেও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড থেকে কখনও বিরত থাকেননি। বরং বিরোধী রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের ধরে এনে সালিশ বিচারের নামে জরিমানা মারধর প্রতিনিয়ত করতেন। কেউ প্রতিবাদী হলেই তাকে করা হতো এলাকাছাড়া অথবা পৃথিবীছাড়া। জুলাই বিপ্লবের দুই মাস আগেও আয়নাল বাহিনীর নৃশংস হাতুড়িপেটায় প্রাণ দিতে হয় একই এলাকার সাইফুল ইসলাম মুকুল নামে এক যুবদল নেতাকে। ২৫ বছর আগে ঠিক একই কায়দায় জীবন দিতে হয় মুকুলের পিতা আব্দুল আজিজকে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের পর সন্ত্রাসী গডফাদার আয়নাল এলাকাছাড়া। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলেও তিনি পালিয়ে ছিলেন। সেবার লুকিয়ে ছিলেন যশোর শহরের চাঁচড়ায় অবস্থিত নাভারণ প্রিন্টিং প্রেসের রেস্ট হাউজে।

যশোর অঞ্চলের শীর্ষ সন্ত্রাসী আয়নাল হকের বাড়ি শার্শার কন্যাদহ গ্রামে। শার্শা- ১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দীনের অতি আস্থাভাজন আয়নাল উলাসী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যানও ছিলেন। ৮০’র দশক থেকে অপরাধ জগতে পা রাখলেও বিগত আওয়ামী লীগের ১৬ বছরেই ফ্রি স্টাইলে সন্ত্রাসী কর্মকা- করেছেন আয়নাল হোসেন।

চোরাচালান ব্যবসার মাধ্যমে সন্ত্রাসজগতে তার প্রবেশ। তার প্রতিপক্ষ কন্যাদহের মোজাম, আব্দুল আজিজ, কিতাব, নূর ইসলাম মেম্বার, বারপোতার বাক্কা, টেংরার আকবর, বাগডাঙ্গার আজিজুল, ঝিকরগাছার পানিসারার শামসুর রহমান খুন হন। স্থানীয়রা মনে করেন এসব হত্যাকা-ের মূল হোতা আয়নাল। তার নামে শুধু শার্শা থানায়ই হত্যা, অস্ত্র, বিস্ফোরক আইনে অন্তত ১৪টি মামলা রেকর্ড হয়। তবে আওয়ামী লীগের প্রভাবের কারণে এসব মামলার বিচার কাজ গত ১৬ বছরে আলোর মুখ দেখেনি।

২০১০ সালের ২৫ জানুয়ারি ভোরে র‍্যাব-৬ যশোর ক্যাম্পের তৎকালীন মেজর সরোয়ারের নেতৃত্বে একটি টিম তার বাড়ির বিচালি গাদা থেকে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে। সে সময়ে র‍্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্ত্রাসী আয়নাল পালিয়ে যায়। কিন্তু এরপর প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও আয়নালের টিকিটি স্পর্শ করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সে সময়ে অভিযোগ ওঠে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের প্রভাবের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আয়নালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

স্থানীয়রা জানান, আয়নাল শার্শার কন্যাদহের নূর ইসলাম (৬৫) মেম্বারকে হত্যার পর ঘরের জানালা দরজা খুলে তার বাড়ির উঠোনে গরু জবাই করে খেয়ে আলোচিত হন। ১৯৯৮ সালে রাতে বেনাপোলে বৃদ্ধ নূর ইসলাম মেম্বারকে হত্যা করা হয়। ভয়ে নূর ইসলামের পরিবার বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেলে আয়নাল তার বাড়ির মালামাল লুট করে নেয়। ঘরের জানালা দরজা খুলে তা জ্বালিয়ে নূর ইসলামের বাড়ির গরু জবাই করে তার উঠানে রান্না করেন। ১৯৯৫ সালে আকবরকে হত্যা করা হয় যশোর জজ আদালত প্রাঙ্গনে। মোজামকে শার্শার জামতলা বাজার থেকে ধরে নিয়ে গয়ড়া গ্রামে গুলি করে হত্যা করা হয় দিনের বেলা। বাক্কাকে দিনের বেলা কুপিয়ে হত্যা করা হয় গয়ড়া গ্রামে। আব্দুল আজিজকে গ্রামের স্কুলের মাঠে বিকেলে পিটিয়ে হত্যা করে আয়নাল ও তার বাহিনী। আর শামসুর রহমানকে কন্যাদহ গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে পুটখালীতে পিটিয়ে বস্তার মধ্যে ভরে ইছামতি নদীতে ফেলে দেয় আয়নাল ও তার লোকজন।

চলতি বছরের ২২ মে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আয়নালের নির্দেশে তার বাহিনীর লোকজন কন্যাদহের সাইফুল ইসলাম মুকুল নামে এক যুবদল নেতাকে মধ্যযুগীয় কায়দায় হাতুড়িপেটা করে আহত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরদিন ২৩ মে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। অভিযোগ রয়েছে এ ঘটনার ২৫ বছর আগে একই কায়দায় হত্যা করা হয় মুকুলের পিতা বিএনপি নেতা আব্দুল আজিজকে। কিন্তু কোনো হত্যাকা-রই বিচার হয়নি আওয়ামী লীগের প্রভাবের কারণে।

কন্যাদহের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বকুল বলেন, আয়নাল বাহিনীর হাতে এ এলাকার অসংখ্য মানুষ খুন হয়েছেন। পঙ্গুত্ববরণ করছেন অনেকে। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে তার অত্যাচারে এ এলাকার বিএনপি নেতাকর্মীরা যাযাবরের জীবনযাপন করেছেন।

শার্শা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু হাসান জহির বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলের গত ১৬ বছরে সবচেয়ে বেশি অত্যাচার হয়েছে শার্শা এলাকায়। সাবেক সংসদ সদস্য এসব অত্যাহার নির্যাতনের হোতা হলেও কর্মকা- পরিচালনা করতো আয়নাল বাহিনী। সর্বশেষ যুবদল নেতা সাইফুল ইসলাম মুকুলকেও তার নির্দেশনায় হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকা-ের দৃষ্টান্তমূললক শাস্তি দাবি করেন এই বিএনপি নেতা।