বসুন্দিয়ায় যুবককে পিটিয়ে হত্যা আহত ৫, আটক ১

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ‘ডাকাত হানা দিয়েছে’ মসজিদের মাইকে এমন প্রচার চালিয়ে যশোরের একটি বাড়িতে ঢুকে পিটিয়ে এক যুবককে হত্যা এবং ৫ জনকে গুরুতর জখম করেছে একটি চক্র। গত বুধবার রাতে সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ইউনিয়নের গাইদগাছি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। যুবলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত মুরাদ হোসেন নামে এক যুবকের নেতৃত্বে পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পুলিশ এ ঘটনার সাথে জড়িত অভিযোগে শিমুল নামে এক ব্যক্তিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আটক করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বসুন্দিয়া ইউনিয়নের কেফায়েতনগর গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে জুলফিকার আলী স্ত্রীকে নিয়ে গাইদগাছি গ্রামে শ্বশুর একুব্বর গাজীর বাড়িতে থাকেন। কখনো তিনি রঙ মিস্ত্রি আবার কখনো তিনি কাঠ মিস্ত্রির কাজ করেন। সম্প্রতি পাশের বনগ্রাম সুপারীবাগান জামে মসজিদ থেকে একটি লোহার গ্রিল চুরি হয়। এ ঘটনার সাথে জুলফিকার আলী জড়িত এমন সন্দেহে তাকে গ্রিল ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন মসজিদ কমিটির সভাপতি শওকত আলী ও বনগ্রামের আজিজুর রহমান ওরফে আজ্জুলের ছেলে মুরাদ হোসেন। বনগ্রাম কাটাখাল মোড়ে মুরাদ হোসেনের ইলেক্ট্রিক ও হার্ডওয়্যার পণ্যের একটি দোকান রয়েছে। চাপ সৃষ্টির কারণে ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন জুলফিকার আলী।
গত বুধবার রাতে তিনি কেফায়েতনগর গ্রামের সোহরাব হোসেন বিশ্বাসের ছেলে কাঠ ব্যবসায়ী মাসুদ রানার (৩৫) বাড়িতে যান। তিনি এ সময় তাকে বাড়িতে যেতে সহায়তা করতে অনুরোধ করেন। এরপর মাসুদ রানা এবং তার কয়েকজন সঙ্গী জুলফিকার আলীকে নিয়ে গাইদগাছি গ্রামে যান তাকে শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে দিতে। এর কিছুক্ষণ পর পাশের বনগ্রাম সুপারীবাগান জামে মসজিদের মাইকে প্রচার করা হয়, গাইদগাছি গ্রামের একুব্বর গাজীর বাড়িতে ডাকাত হানা দিয়েছে। তবে প্রচারের আগেই মুরাদ হোসেনের নেতৃত্বে তার বেশ কয়েকজন সহযোগী কুড়াল ও কোদালের কাঠের আছাড়ি নিয়ে নিয়ে ওই বাড়িতে হামলা চালান।
মাসুদ রানার মা খাদিজা পারভীন জানান, রাতে জুলফিকার আলী তাদের বাড়িতে এসে খাওয়া দাওয়া করেন। এরপর জুলফিকার আলীকে সাথে নিয়ে কয়েকজন বন্ধুসহ বাড়ি থেকে বের হয়ে যান তার ছেলে মাসুদ রানা। পরে শুনেছেন রাতে জুলফিকার আলীর শ্বশুরবাড়িতে একদল লোক হামলা চালিয়েছিলো।
জুলফিকার আলীর শাশুড়ি শাহিদা বেগম ও স্ত্রী শারমিন খাতুন চায়না জানান, বনগ্রামের মুরাদ হোসেনের নেতৃত্বে বাবু ওরফে বাবুল, শিমুল, পিন্টুসহ বেশ কয়েকজন তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে জুলফিকার আলী এবং সঙ্গী মাসুদ রানাকে বেধড়ক মারধর শুরু করেন। হামলাকারীদের সকলের হাতে ছিলো কুড়াল ও কোদালের কাঠের আছাড়ি। বেধড়ক মারধরের কারণে সকলে গুরুতর জখম হলে একটি ভ্যান ডেকে তাদের উঠিয়ে নিয়ে যান মুরাদ হোসেন ও তার লোকজন । পরে শুনেছেন বনগ্রাম কাটাখাল মোড়ে যাওয়ার পর মারা যান মাসুদ রানা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মাসুদ রানার পরিবার বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। মাসুদ রানা প্রতিষ্ঠিত কাঠের ব্যবসায়ী। তিনি বনগ্রাম কাটাখাল মোড়ে গিয়ে বন্ধুদের সাথে নিয়মিত আড্ডা দিতেন। এতে তার ওপর ঈর্ষান্বিত ছিলেন যুবলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত মুরাদ হোসেন । তিনি যখন জানতে পারেন, জুলফিকার আলীর সাথে তার শ্বশুরবাড়িতে মাসুদ রানা কয়েকজন সঙ্গীসহ গিয়েছেন। এই সুযোগ নিয়ে তার পরিকল্পনায় ‘ডাকাত হানা দিয়েছে’ মসজিদের মাইকে এমন প্রচার চালিয়ে ওই বাড়িতে পরিকল্পিতভাবে হামলা করা হয়। কুড়াল ও কোদালের কাঠের নতুন আছাড়ি মুরাদ হোসেন তার দোকান থেকে সরবরাহ করেন।
সূত্র জানায়, গাইদগাছি গ্রামের ফিরোজ হোসেনের ভ্যানে করে জখম ৬ জনকে কাটাখাল মোড়ে নিয়ে যান মুরাদ হোসেন ও তার সঙ্গীরা। সেখানে শ্বাসরোধে মাসুদ রানাকে হত্যার পর তারা সেখান থেকে পালিয়ে যান। পরে স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। আহতরা হলেন জুলফিকার আলী, মনিরামপুর উপজেলার সুবলকাঠি গ্রামের মুনসুর আলীর ছেলে ইসরাফিল হোসেন, কড়েরাইল গ্রামের শামীম হোসেনের ছেলে সজীব, আলমগীর হোসেনের ছেলে সুমন হোসেন ও বারপাড়া গ্রামের বাবুল কাজীর ছেলে মইন উদ্দিন।
বসুন্দিয়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই কামরুজ্জামান জানান, সেখানে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। মারধরের শিকার কয়েকজনকে একটি ভ্যানে করে কাটাখাল মোড়ে নিয়ে গিয়েছিলো একটি পক্ষ। সেখানেও আহতদের আরেকদফা মারধর করা হয়। এ সময় একজন মারা যান।
কোতয়ালি থানা পুলিশের ওসি মো. তাজুল ইসলাম জানান, ওই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে শিমুল নামে এক যুবককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে বসুন্দিয়া ক্যাম্পের পুলিশ। তিনি আরও জানান, মাসুদ রানা হত্যার ঘটনায় এখনো পর্যন্ত নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।