যশোর চুকনগর আঞ্চলিক মহাসড়ক: ২৫ লাখ টাকার গাছ চুরির দাবিতে রহস্য, কাটার অনুমতি পাচ্ছে না জেলা পরিষদ

0

তহীদ মনি ॥ যশোর-চুকনগর আঞ্চলিক মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ গাছ অপসারণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জেলা পরিষদের দু’রকম তথ্য। প্রথম তথ্যের তুলনায় দ্বিতীয় তথ্যের মূল্য ব্যবধান অন্তত ২৫ লাখ টাকা। চুরির কথা বলে গাছের সংখ্যা ও মূল্য কম দেখানো হয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়ায় স্থানীয় সরকার বিভাগের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয় গাছ কাটার অনুমোদন দিচ্ছে না। করছে তদন্ত। এ কারণে মহাসড়কটির উন্নয়ন কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।
যশোর জেলা পরিষদ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের সূত্র মতে, যশোর-চুকনগর আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়নের কাজ শুরু হয় ২০২০ সালের জুন মাসে। ৩৮ কিলোমিটার এ মহাসড়কটির উন্নয়নে প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সময়মতো শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ দেড় বছর বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। সড়কটির উন্নয়নে প্রধান বাধা ছিল দু’পাশের গাছ। জেলা পরিষদের দাবি অনুযায়ী গাছগুলির মালিক তারা। সে জন্যে গাছ কাটার অনুমোদন চেয়ে জেলা পরিষদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দু’বার দু’রকম তথ্য দিয়েছে। শেষ তথ্যে চুরির কথা বলে গাছের সংখ্যা ১৪৫টি কম দেখানো হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আগের চেয়ে মূল্যও কম দেখানো হয়েছে। যার ব্যবধান ২৫ লাখ টাকা। এ নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। ফলে সড়ক উন্নয়নে গাছ কাটা অতি জরুরি হলেও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন মিলছে না।
সূত্র মতে, প্রথম দফায় গাছের সংখ্যা দেখানো হয় ৪৬৪টি এবং মূল্য দেখানো হয় ১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এ হিসেব অনুযায়ী যশোর জেলা পরিষদ গাছ বিক্রির জন্যে দরপত্র আহ্বান করে। সে টেন্ডারে কোনো ক্রেতা অংশ না নেওয়ায় তা বাতিল হয়ে যায়। পুনরায় দরপত্র আহ্বানের অনুমোদনের জন্যে আবেদন করা হয়। সেখানে গাছের সংখ্যা ও মূল্য কম দেখানো হয়। জেলা পরিষদের দাবি, বন বিভাগকে সাথে নিয়ে তারা জরিপ করে। এ সময় জানতে পারে কেশবপুর থেকে চুকনগর পর্যন্ত ৬০টি গাছ জেলা পরিষদের নয়। এতদিনে রাস্তার উন্নয়ন কাজ শুরু হওয়ায় উন্নয়ন কাজে নিয়োজিত ঠিকাদাররা এস্কেভেটর দিয়ে গাছ উপড়ানো শুরু করে। তাদের মতে, গাছ উপড়ে রাস্তার পাশে রাখায় এ সময় ৬১টি গাছ চুরি হয়ে যায়। জরিপের সময় বনবিভাগ ৪৪টি গাছ নিজেদের দাবি করে। ফলে, চুরি যাওয়া অন্যের অংশের ও বনবিভাগের দাবিকৃত গাছ বাদ রেখে গাছের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১৮ টি। বনবিভাগ, জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসকের যৌথ কমিটি গাছগুলোর মূল্য নির্ধারণ করে। এ গাছের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। মূল্য নির্ধারণ শেষে নিয়মানুসারে ফাইলটি জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের দফতরে পাঠানো হয়। সেখান থেকে অনুমোদন পেলেই পুনঃটেন্ডার আহ্বান করতে পারবে জেলা পরিষদ। দেড় মাস হয়ে গেলেও ফাইলটি অনুমোদিত হয়নি।
একটি সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের মে মাসে কুয়াদা বাজারের একটি স’মিল থেকে জেলা পরিষদের বিপুল পরিমাণ কাঠ উদ্ধার হয়। এর সাথে জেলা পরিষদের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর জড়িত থাকার ইঙ্গিত পায় জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ। রহস্যজনক কারণে তাদেরকে আসামি না করে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে মামলা করা হয়। বারবারই কাঠ, গাছ চুরির সাথে জেলা পরিষদের লোকজন জড়িত থাকার গুঞ্জন থাকলেও কখনো তাদের শনাক্ত বা ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে সর্বশেষ চুরির গাছ ও কাঠ প্রথমে রূপদিয়া, বসুন্দিয়া অঞ্চলে রাখা হয়। পরে তা সাতক্ষীরার অজ্ঞাত স’মিলে পাঠানো হয়। এসব আলোচনা ও গুঞ্জনের পরও গাছ চুরির ক্লু এখানো উদ্ঘাটন হয়নি। অথচ, আগের ও পরের হিসেবে ব্যবধান অন্তত ২৫ লাখ টাকা। এতো টাকার গাছ কীভবে চুরি হলো তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ফলে, সড়কটি উন্নয়নে গাছ কাটা অতি জরুরি হয়ে পড়লেও কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিচ্ছে না। স্থানীয় সরকার বিভাগের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, যশোর জেলা পরিষদ আগে গাছের সংখ্যা যা দেখিয়েছিল পরবর্তী ফাইলে সে সংখ্যা কম দেখিয়েছে। এর কারণ অনুসন্ধান ছাড়া অনুমোদন দেওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, জেলা পরিষদ ইচ্ছে মতো একেক ফাইলে একেক রকম গাছের সংখ্যা দেখাবে, এটা যৌক্তিক হতে পারে না। এ জন্যে খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)কে তদন্তভার দেওয়া হয়েছে। তার প্রতিবেদনের ওপর অনুমোদন নির্ভর করছে। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল বলেন, এ ব্যাপারে কোতয়ালি, মনিরামপুর ও কেশবপুর থানায় ১৩টি মামলা হয়েছে। তবে, অদ্যাবধি গাছ উদ্ধার এবং চোর আটক হয়নি।