খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা

সৈয়দ আবদাল আহমদ
বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নন্দিত নেত্রী খালেদা জিয়া ভালো নেই। দেশের শীর্ষ এ রাজনীতিক বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে জীবনের চরম কষ্টের দিনগুলো পার করছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দেশে চিকিৎসা দেয়ার অবশিষ্ট আর বাকি নেই। তাকে সুস্থ করে তুলতে হলে এ মুহূর্তে বিদেশে নেয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তার গুরুতর জটিলতাগুলো সারাতে হলে বিদেশে আরো অ্যাডভান্স সেন্টারে চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, তাকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেয়া সম্ভব নয়। দীর্ঘ দিন থেকে বেগম খালেদা জিয়া ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। দু’বার তার হাঁটুতে অপারেশন হয়েছে। অপারেশন হয়েছে চোখে। শারীরিক অসুস্থ অবস্থাতেও তাকে আড়াই বছর জেলে থাকতে হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মিথ্যা মামলায় দীর্ঘ আড়াই বছর তিনি নির্জন কারাবাসে থাকায় অনেকগুলো ব্যাধি তার শরীরে বাসা বেঁধেছে। সেখানে চিকিৎসার কোনো সুযোগ ছিল না। চিকিৎসা না পেতে পেতে আজ বেগম খালেদা জিয়ার জটিলতাগুলো বেড়ে গেছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় গত ১৩ নভেম্বর তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়। এর আগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে একই হাসপাতালে তিনি ৫৩ দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। কোভিড-পরবর্তী জটিলতায় তার ফুসফুস, লিভার, হার্ট ও কিডনির অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেছে। বিশেষ করে তার লিভারের সমস্যা গুরুতর আকার ধারণ করেছে। বলতে গেলে খালেদা জিয়া এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছেন। মির্জা ফখরুল আরো বলেন, আমরা দেশ ও বিদেশের ডাক্তারদের সাথে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, বেগম জিয়ার যেসব জটিলতা আছে তা বিদেশের আরো অ্যাডভান্স সেন্টারে নিয়ে ট্রিটমেন্ট করাতে হবে। তা করা না হলে তাকে বাঁচানো যাবে না।
খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর বরাবর পাঁচবার আবেদন করা হয়েছে। সর্বশেষ আবেদনে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক কারণে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু সম্প্রতি স্কটল্যান্ডের জলবায়ু সম্মেলন থেকে ফিরে সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার ব্যাপারে তার কিছু করার নেই। তিনি পাল্টা বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে বাসায় থাকতে দিয়েছি, এটাই কি বেশি নয়?’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি সাজা স্থগিত করে বিশেষ ব্যবস্থায় খালেদা জিয়াকে বাসায় থাকার অনুমতি দিয়েছেন। এ সিদ্ধান্তে দেশবাসী খুশি হয়েছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার বর্তমান সমস্যা তো বাঁচা-মরার। তিনি তো জীবনসায়াহ্নে, মৃত্যুর প্রায় দ্বারপ্রান্তে। তার বয়স এখন ৭৬ বছর। তিনি একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা। তিনি দেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। তার স্বামী বীরোত্তম জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। দেশের সেনাপ্রধান ও জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি ছিলেন। একজন জাতীয় নেতা হিসেবে তিনি আপনারও রাজনৈতিক সহকর্মী। উন্নত চিকিৎসা পাওয়া তার অধিকার। তবুও আপনার সহানুভূতির জন্য পরিবার আপনার বরাবর দরখাস্ত করেছে। একটু সহানুভূতি কি তিনি পেতে পারেন না? মানবিক কারণে আপনি সদয় হন। বিএনপি উপায় খুঁজে না পেয়ে শনিবার নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে গণ-অনশন কর্মসূচি পালন করেছে। মহানগর ও দেশের সর্বত্র সভা-সমাবেশের কর্মসূচি দিয়েছে। এসব কর্মসূচি থেকে খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতির দাবি জানানো হচ্ছে। বিদেশে চিকিৎসায় বেগম জিয়া কতটা সুস্থ হবেন একমাত্র মহান আল্লাহই জানেন। কিন্তু শেষ চেষ্টার সুযোগটুকু আমরা কি করতে পারি না? তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি এ সুযোগটুকু করে দিন। আইন তো মানুষের জন্য। সরকারপ্রধান হিসেবে আপনি চাইলে আইন কোনো বাধাই হতে পারে না।
বাংলাদেশের জন্য খালেদা জিয়ার অসামান্য অবদান রয়েছে। তিনি একজন সাধারণ গৃহবধূ ছিলেন। স্বামী জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর দেশের মানুষের চাওয়াতেই রাজনীতিতে আসনে। তার রাজনীতিতে আসার প্রায় চার দশক হয়েছে। জনগণ তাকে ভালোবাসে। তিনিও দেশ ও জনগণকে ভালোবাসেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার আপসহীন নেতৃত্বের কারণে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারটি সংসদ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন জেলার ১৮টি সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচন করে সবগুলোতেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। তাই দেশের রাজনীতির এক অনন্য, সাহসী নাম খালেদা জিয়া। দেশের মানুষের কাছে তিনি ‘দেশনেত্রী’। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে গৃহবন্দী ছিলেন। নব্বইয়ের স্বৈরশাসন অবসানের পর ১৯৯১ সালে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। যমুনা সেতুর মতো বড় বড় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তিনি পরিচালনা করেছেন। আজ দেশে নারী জাগরণ হয়েছে। লাখ লাখ মেয়ে শিক্ষায় এগিয়ে এসেছে। এতে তার অবদান রয়েছে। মেয়েদের জন্য তিনিই প্রথম উপবৃত্তি চালু করেন। প্রথমে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত, পরে এসএসসি পর্যন্ত। দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে তার একটি পা গুরুতর অসুস্থ। দেশের জনসাধারণ আন্তরিকভাবে চায় তিনি সুস্থ হয়ে উঠুন। এ জন্যই খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা করা খুব জরুরি। তাই আসুন, দেশের জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় মহান আল্লাহর দরবারে সবাই দোয়া করি। নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির আসকারের মাধ্যমে মহান আল্লাহর কাছে তার জন্য দোয়া চাই। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার পক্ষ থেকে দোয়া মুমিনের জন্য বিশেষ উপহার। দোয়া করা ও দোয়া চাওয়া দু’টিই মহানবী সা:-এর সুন্নাত। মহানবী সা: বলেন, ‘আল্লাহর দৃষ্টিতে দোয়ার চেয়ে মহৎ কিছু নেই’ (সহিহ বুখারি-৫৩৯২)। একনিষ্ঠ মনে দোয়া করলে আল্লাহ তায়ালা তা কবুল করেন; কারণ মহান আল্লাহ পরম দয়ালু ও অতীব ক্ষমাশীল। পবিত্র কুরআনের সূরা মুমিনের ৬০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো।’ মানুষের তাকদিরে সাধারণত কোনো পরিবর্তন হয় না। কিন্তু দোয়ার বদৌলতে তাকদিরও পরিবর্তন হতে পারে; কারণ আমাদের নবীজী সা: বলেছেন, ‘দোয়ার বদৌলতে তাকদিরের কিছু অংশ বদলে যায়।’ (জামে আত-তিরমিজি-২১৩৯) রোগব্যাধি যত কঠিন হোক দোয়ার বরকতে মহান আল্লাহ চাইলে সুস্থ করে দিতে পারেন। দুই হাত তুলে সেই মুনাজাতই করি মহান প্রভুর কাছে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব

ভাগ