ভয়াবহ ঝুঁকি

0

গতকালের ৭৭ মুত্যুতে দেশে করোনায় প্রাণহানির সংখ্যা ১৪ হাজার ছাড়ালো। এর মধ্যে গত ১৫ দিনে মৃত্যু হয়েছে এক হাজার করোনা আক্রান্তের। বৃহস্পতিবার দেশে করোনাভাইরাসে ১০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছর মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর এটি এক দিনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। এর থেকে বেশি মৃত্যু হয়েছিল গত ১৯ এপ্রিল, সেদিন মারা যায় ১১২ জন। পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ২২। গত ৬৯ দিনের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ শনাক্তের হার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো দেশে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে কি না তা বোঝার একটি নির্দেশক হলো রোগী শনাক্তের হার। কোনো দেশে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্ত ৫ শতাংশের নিচে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ধরা যায়।
দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয় গত বছর ৮ মার্চ। তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সংক্রমণ। বছরের শেষদিকে এসে সংক্রমণ কমতে থাকে। চলতি বছর মার্চ থেকে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকায় ৫ এপ্রিল থেকে সাত দিনের জন্য গণপরিবহন চলাচলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। পরে তা আরও দুদিন বাড়ানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত আরও কঠোর বিধিনিষেধ দিয়ে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ শুরু হয়। পরে তা আরও বাড়িয়ে ১৫ জুলাই পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু দেশে এখন সংক্রমণ পরিস্থিতি এপ্রিলের মতো ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। ভারত সীমান্তবর্তী ১৫টি জেলায় রোগী দ্রুত বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ২২ জুন থেকে ঢাকাকে সারা দেশ থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ঘোষণা অনুযায়ী, ঢাকার আশপাশের চারটিসহ সাত জেলায় জরুরি সেবা ছাড়া সব ধরনের চলাচল ও কার্যক্রম ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। এ সাত জেলা হলো মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জ। এরপরও সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যা বেড়ে চলায় সারা দেশে কমপক্ষে ১৪ দিন সম্পূর্ণ ‘শাটডাউন’ করতে করোনাসংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি সুপারিশ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় দেশব্যাপী ‘শাটডাউনের’ যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় এনে যথাসম্ভব সর্বোচ্চ সুফল পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। কারণ মহামারী পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং ব্যাপক পরিসরে।
করোনার সংক্রমণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার সময়ই বিশেষজ্ঞরা সীমান্ত বন্ধসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, প্রথম দিকে সরকার বিষয়টি তেমন আমলে নেয়নি। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বেশকিছু নাগরিকের ভারতীয় করোনার ধরন ধরা পড়ার পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। এছাড়া ভারতফেরত নাগরিকদের ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রাখার সিদ্ধান্তও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। অনেকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন এড়িয়ে নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেছেন। যারা ইতিমধ্যে সংক্রমিত হয়েছেন, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি নতুন সংক্রমণ প্রতিরোধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। সীমান্তবর্তী এলাকায় যতটা সম্ভব বেশিসংখ্যক মানুষের করোনা পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে।
মহামারীর দ্বিতীয় আঘাতটি এসেছে দৃশ্যত দ্বিগুণ তীব্রতা ও শক্তি নিয়ে। এর বিরুদ্ধে সবাইকে সম্মিলিতভাবে দাঁড়াতে হবে; প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর হারও বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে, আইসিইউ সেবার প্রয়োজন হচ্ছে এমন রোগীর সংখ্যাও ইতিমধ্যে অনেক বেড়েছে এবং আরও বাড়ছে। সুতরাং কভিড চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এখন বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। বিশেষত অক্সিজেন প্রাপ্তির নিশ্চয়তা ও আইসিইউ সেবা ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে, যাতে কভিড রোগীদের মৃত্যুর হার যথাসম্ভব কম রাখা যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে সংক্রমণ বৃদ্ধি একটি বড় জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে সামনে চলে এসেছে, এটা সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলার জন্য সবার সম্মিলিত প্রয়াস একান্ত জরুরি। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জোর দিতে হবে টিকা প্রয়োগের বিষয়ে। বিশ্বে করোনা মোকাবিলায় এখন পর্যন্ত টিকা কর্মসূচিকেই সবচেয়ে কার্যকর বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাই বিশেষজ্ঞরা যেমনটা বলছেন, দেশের অন্তত ৭০-৭৫ ভাগ নাগরিককে দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে।
নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধির এ প্রবণতা রোধ করে মহামারী মোকাবিলার চলমান সব তৎপরতার সাফল্য নিশ্চিত করতে হলে আমাদের গত এক বছরের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে, সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে। গত বছর দীর্ঘ সাধারণ ছুটি, নানা মাত্রার ‘লকডাউন’ এবং ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করার যেটুকু প্রয়াস লক্ষ করা গিয়েছিল, দুঃখজনকভাবে এখন তা অনুপস্থিত। সবার দায়িত্বশীল আচরণই এখন কাম্য।