এটি একটি করুণ অধ্যায়

লোকসমাজ ডেস্ক॥ আমি আমার ডেস্কে বসতেই আমার এডমিনিস্ট্রেটিভ সহকারী আমাকে এসে বললেন, ‘বস্‌ আপনার জন্য বাইরে আরেকজন মা অপেক্ষা করছেন।’ আমি হলওয়ে দিয়ে হেঁটে গিয়ে লবিতে তাকে শুভেচ্ছা জানাই। আমি চাকরি করছি মাত্র কয়েক সপ্তাহ, কিন্তু এটাই প্রথম নয় যে, আমি এমনভাবে হাঁটছি। এটাই প্রথম নয় কোন নারী আমার কাছে এসেছে এবং বলছে- ‘আমি কমালার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমি শুধুমাত্র কমালার সঙ্গেই কথা বলবো।’
আমি নিশ্চিতভাবেই জানি তিনি কেন সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি খুন হওয়া এক সন্তানের মা। তিনি আমার কাছে এসে আমার বাহুতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে বিধ্বস্ত দেখতে পাচ্ছিলাম। তিনি ছিলেন শোকে কাতর। তারপরও তিনি যে আমার কাছে এসেছেন এটি তার শক্তির প্রমাণ। তিনি এখানে এসেছেন তার সন্তানের জন্য। যাকে তিনি হারিয়েছেন। তার সন্তানকে এক যুবক রাস্তায় গুলি করে হত্যা করেছে। মাসখানেক আগে তার সন্তান খুন হয়েছে। কিন্তু এখনও তার খুনি মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি যখন অফিসে দায়িত্বগ্রহণ করি তখন সেখানে বিচার হয়নি এমন সত্তরটিরও বেশি মামলায় খুনের অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়নি। সান ফ্রান্সিসকো পুলিশ বিভাগে এমন তথ্যই জেনেছি। নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই আমি এমন অনেক মায়ের দেখা পেয়েছি। তারা বেশির ভাগই কৃষ্ণাঙ্গ অথবা ল্যাটিন অধ্যুষিত অপরাধপ্রবণ এলাকার প্রতিবেশী। তারা প্রত্যেকেই তাদের সন্তানদের গভীরভাবে ভালোবাসেন। তারা একসঙ্গে ঐক্যবব্ধ হয়ে একটি দল গঠন করে নাম দেন খুনের শিকার শিশুদের মা। এটা একইসঙ্গে ছিল তাদেরকে আইনি সহায়তা ও মানসিক সহায়তা দেয়ার জন্য। তারা একে-অপরের সঙ্গে যুক্ত হয় তাদের সন্তানদের ন্যায় বিচারের জন্য। তারা জানেন না আমি তাদের সহায়তা করতে পারবো কিনা কিন্তু তারা এটা জানেন আমি তাদের কথা শুনবো। এটা আমি আক্ষরিক অর্থেই বলছি। তাদের কষ্ট দেখবো, তাদের ক্ষোভের কথা শুনবো এবং তাদের ভেতরের রক্ষক্ষরণ অনুভব করবো। প্রথম এবং শেষ কথা হচ্ছে- তাদেরকে আমি মায়ের মতোই ভালোবাসবো।
এটা একটি করুণ অধ্যায়। মানুষ যখন শুনে যে, তার সন্তান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে বা যুদ্ধে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে তখন সকলেই সহানুভূতি নিয়ে এগিয়ে আসে এবং উদ্বেগ প্রকাশ করে। কিন্তু যখন একজন মা তার সন্তানকে হারায় পথে সন্ত্রাসের জন্য তখন মানুষের প্রতিক্রিয়া থাকে ভিন্নরকম। স্বভাবতই তখন সকলের কাছ থেকে ধিক্কার শুনতে পাওয়া যায়। যদিও এটি অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। একজন মানুষের সন্তান হারানোর কথা বলছি না, বলছি পরিসংখ্যানের কথা। যদিও বা তার সন্তানের মৃত্যু তার নিজের জীবনে বড় একটি ঘটনা। কিন্তু মানুষের কাছে তার এই কষ্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, এতো কষ্টের নয় এবং সহমর্মিতা প্রাপ্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি আমার অফিসে ফিরে তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলতে চাইলাম। সে বললো তার সন্তানকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। কেউ সহযোগিতা নিয়ে এগিয়েও আসেনি। তিনি বর্ণনা করলেন- যেদিন তিনি করোনারের অফিসে মরদেহ শনাক্ত করতে গিয়েছিলেন সেদিনের কথা। আমি কোনোভাবেই আমার সন্তানের মরদেহেরে দৃশ্য মাথা থেকে সরাতে পারছি না। তার নিথর দেহ হিম অবস্থায় রাস্তায় পড়েছিল। তিনি খুনের অপরাধ শনাক্তে যুক্ত পুলিশ ইন্সপেক্টরকে তা জানান। তিনি সন্দেহভাজনের নামও উল্লেখ করেন কিন্তু তার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। যেন কিছুই ঘটেনি। যেন কিছুই ঘটার ছিল না এবং ঐ নারী বুঝতে পারছিলেন কেন এমনটা ঘটছে। তিনি আমার হাত জড়িয়ে ধরেন এবং সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকালেন এবং বললেন, আমার সন্তান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আবার বললেন, আমার সন্তান এখনও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরে আমি বললাম, আপনার সন্তান আমার কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। সবার কাছেই তার জীবনের দাম থাকা উচিত।
আমি আমার টিমের সকলকে বলি যত দ্রুত সম্ভব খুনের অপরাধ বিষয়ক পুলিশ ইন্সপেক্টরকে আমার কনফারেন্স রুমে আসতে বলার জন্য। আমি জানতে চাই এ ধরনের ঘটনায় কী হচ্ছে? সেই কর্মকর্তা প্রত্যাশিত কিছুই বলতে পারেননি। আমি জানি না এটা ব্যতিক্রম কিনা আমি সকলকে নিয়ে বৈঠকের জন্য তলব করি। আমি একের পর এক করে সকলের কাছে জানতে চাই খুনের ঘটনাগুলোর সবশেষ অবস্থা আর আমরা এই পরিবারগুলোর জন্যই বা কি করতে পারি। আমি এই কথাগুলো নির্দিষ্ট করে বলি এবং পুলিশ ইন্সপেক্টরকে আরও কঠোর থেকে কঠোর হওয়ার জন্য চাপ দিই। আমি পরে জানতে পারি তারা তা প্রত্যাশা করছিল। সংশ্লিষ্টরা নড়েচেড়ে বসলো। আগে কী হয়েছিল জানি না কিন্তু এখন এটিই করণীয়। এবং যেভাবেই হোক এটিকে বাস্তবায়ন করতে হবে। তারা আমার কথাকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। এক মাসের মধ্যেই পুলিশ বিভাগ সাক্ষ্যদের সহায়তা দিতে প্রচারণা শুরু করে। এরমধ্যেই জট লেগে থাকা খুনের ঘটনার প্রায় ২৫ ভাগ সমাধান করা সম্ভব হয়। সবগুলো ঘটনার সমাধান করা যায়নি তবে আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছিলাম কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সবগুলো অভিযোগকেই যতদূর সম্ভব এগিয়ে নেয়া যায়। অনেকেই অবাক হয়েছিল আমার নিরলস চেষ্টা দেখে। আমি জানতাম অনেকেই প্রশ্ন করত আমি কে? একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী কীভাবে আরও কয়েকজন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে এলো। কোনো সন্দেহ নেই আমাদের যে বিচারব্যবস্থা তা ছিল দুর্বল। এবং এর মৌলিক দিকগুলোই ছিল ভঙ্গুর। আমাদেরকে এ নিয়েই লড়াই করতে হবে। আমরা মায়ের কষ্টকে অবহেলা করতে পারি না, শিশু মৃত্যুর ঘটনাকে হেলা করতে পারি না যেখানে খুনিরা নিরাপদে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি গুরুত্বপূর্ণ অপরাধীদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি। আমি অদৃশ্যসব অপরাধ নিয়ে কাজ করছিলাম। যত ধরনের অপরাধ সম্ভব আমি সব ধরনের মামলা নিয়েই কাজ করছিলাম। এর মধ্যে ছিল একজন পুরুষ যে তার প্রেমিকার সঙ্গে ঝগড়ার সময় চামড়া তুলে ফেলে। আমি এমন সব অপরাধীর সঙ্গে কাজ করেছি যারা ছিল ভিন্ন ধরনের এবং বর্ণনাতীত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। আমি হত্যার স্থানগুলোতে যেতাম এবং যারা অপরাধী ছিল তাদের বিরুদ্ধে রায় জিতেছিলাম। আমি যাবজ্জীবন প্রাপ্ত ঠাণ্ডা মাথার এক খুনির সঙ্গে আদালতে মুখোমুখি হয়েছিলাম। এ ধরনের মামলায় অপরাধীর সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিতে কখনও আমি পিছপা হয়নি। ২০০৪ সালে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের সঙ্গে যৌনতার অভিযোগে জন নামে একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে আমি বিল পাস করেছিলাম। আমি বিশ্বাস করি অপ্রাপ্ত বয়স্কদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক এক ধরনের যৌন নির্যাতন হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া উচিত।
কমালা হ্যারিসের অটোবায়োগ্রাফি‘দ্য ট্রুথ উই হোল্ড’ বই থেকে

ভাগ