‘হয় খাবার দেবে, না হলে ধরে জেলাখানায় পুরে দিক’

0

স্টাফ রিপোর্টার॥ ‘চাল-পানি খেয়ে রোজা আছি। ঘরে আর কোনো খাবার নেই। ছেলে ইজিবাইক চালায়, স্বামী দিনমজুর। সংসারে সাতজন। স্বামী-ছেলে গত এক মাস আট দিন কোনো কাজ করতে পারছে না। না খেয়ে ঘরে আটকে পড়ে আছি। দেখার কেউ নেই। হয় খাবার দেবে, না হলে ধরে জেলখানায় পুরে দিক।’ এই কথা যশোর সদরের নওয়াপাড়া ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের মমতাজ বেগমের। লকডাউনর মধ্যেও যশোর শহরতলীর এই এলাকার কয়েকশ’ নারী-পুরুষ গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন খাদ্যের দাবিতে। সেখানেই কথা হয় আরো কয়েকজনের সঙ্গে।
যশোর-ঢাকা মহাসড়কে অবস্থান নেওয়া জাহানারা বলছিলেন, ‘আমাদের এলাকার ঋষিপাড়ার লোকজন বার বার ত্রাণ পাচ্ছে। জনপ্রতিধিদের নজর আমাদের দিকে নেই। তাই খাবার পাচ্ছিনে। খাবার দেবে, তা না হলি রাস্তায় মরবো।’ সালাম বিশ্বাস নামে একজন বলেন, ‘হয় ত্রাণ দেবে, না হলে এই রাস্তায় জীবন দেবো।’ রহিমা বেগম নামে এক নারী বলেন, ‘না খেয়ে রোজা রেখেছি। আর পারছিনে। হয় ত্রাণ দেন না হলে বলেন, গুলি করে মেরে দিতে। আমাদের চোখের সামনে তিনবার-চারবার করে ত্রাণ পাচ্ছে অনেকে। আর আমরা না খেয়ে থাকছি। এ দৃশ্য দেখে বাঁচতে ইচ্ছে করে না।’ এলাকাবাসীর অভিযোগ সম্বন্ধে জানতে চাইলে স্থানীয় ইউপি মেম্বার রুহুল আমিন দাবি করেছেন, তার ওয়ার্ডে সাত হাজার ভোটার। মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ায় তিনি এক হাজার ৭০০ জনের তালিকা ইউনিয়ন পরিষদে জমা দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত সহায়তা পেয়েছেন মাত্র ২৪ জনের। বরাদ্দ অপর্যাপ্ত হওয়ায় তারা সামাল দিতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘‘রাত-দিন মানুষের জন্য কাজ করেও এখন ‘চোর’ গালি শুনতে হচ্ছে।’’ একই এলাকার বাসিন্দা আহম্মেদ আলী, মনির হোসেন, মিজানুর রহমান, জাকিরুজ্জামান জাকির, রুহুল আমিনদের অভিযোগ, চেয়ারম্যানের প্রিয় লোকদের বাড়ি বাড়ি রাতের বেলায় চালের বস্তা পৌঁছে দিতে দেখা য়ায়। কিন্তু গত এক মাস আটদিনেও এক কেজি চালও কেউ তাদের দেয়নি। গতকাল মঙ্গলবার সকালে বাহাদুরপুরে দুই স্থানে যশোর-মাগুরা সড়কের ওপর বসে পড়েন স্থানীয় অভুক্ত মানুষেরা। দুই স্পট মিলে শ’চারেক নারী-পুরুষ ও শিশু ছিলেন। সকাল আটটা থেকে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত রাস্তায়ই ছিলেন তারা। এসময় ব্যস্ত মহাসড়কটির দুই পাশে গাড়ির দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। পরে যশোর জেলা প্রশাসনের আরডিসি কেএম আবু নওশাদ, সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সৈয়দ জাকির হাসান, সেনাবাহিনী ও পুলিশ গিয়ে খাদ্য সহায়তার আশ্বাস দিলে রাস্তা ছাড়েন লোকেরা।
বিােভকারীদের মধ্যে জাহাঙ্গীর আলম, জানে আলম, কবিতা খাতুন, নাজমা বেগম ও সালমা বেগম অভিযোগ করেন, তারা এখনো পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি কোনো সহায়তা পাননি। বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, মুখ চিনে সরকারি ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ তিন-চারবারও ত্রাণ পেয়েছেন। যে কারণে বাধ্য হয়ে আজ তারা রাস্তায় নেমে এসেছেন। আব্দুর রহমান নামে একজন বলেন, ‘চেয়ারম্যান ঋষিপাড়ায় চারবার ত্রাণ দিয়েছে। অথচ আমাদের তালিকা নিলেও কোনো ত্রাণ দেয়নি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা মুখ চিনে চিনে ত্রাণ দিচ্ছে। তারা ত্রাণের চাল গরুকেও খাওয়াচ্ছে।’ আরডিসি কেএম আবু নওশাদ বলেন, ‘বিােভকারীদের কথা শুনে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। এলাকার কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তালিকা তৈরির। তালিকা ইউএনও সাহেবের কাছে পৌঁছালে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হবে।’ সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সৈয়দ জাকির হোসেন জানান, বিােভকারীদের বুঝিয়ে প্রতি গ্রাম থেকে দুইজন করে প্রতিনিধি নির্ধারণ করা হয়েছে। তাদের মাধ্যমে তালিকা করে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।