লোকসমাজ ডেস্ক ॥ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার টানা উত্তেজনায় কাঁপছে উপসাগরীয় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইরাক। দেশটির রাজধানী বাগদাদসহ গোটা দেশেই এখন পাল্টাপাল্টি হামলা আর বোমা আতঙ্ক। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশটির ১৮টি প্রদেশে ছড়িয়ে থাকা ২ লক্ষাধিক বাংলাদেশি চরম আতঙ্কে সময় পার করছেন। হামলায় আক্রান্ত হতে পারেন এমন ভয়ে তারা আতঙ্কিত। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাসস্থান এবং কর্মস্থল থেকে তাদের বের হতে নিষেধ করেছে বাগদাদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। দূতাবাসের তরফে এ সংক্রান্ত সতর্ক-বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে বাগদাদে মার্কিন রকেট হামলায় ইরানী স্পেশাল ফোর্স কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পরপরই।
অবশ্য বাংলাদেশ দূতাবাস ইরাক পরিস্থিতির উদ্বেগজনক যে রিপোর্ট ঢাকায় পাঠিয়েছে তাতে এখন পর্যন্ত কোন বাংলাদেশি হতাহতের তথ্য নেই। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরাক জুড়ে যে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে বাংলাদেশ দূতাবাস অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে গোটা বিষয়ের ওপর নজর রাখছে। ১৮টি প্রদেশে থাকা বাংলাদেশিদের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ চ্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। দূতাবাসে কোন ছুটি নেই, ৭দিনই ২৪ ঘণ্টা কনস্যুলার সার্ভিস খোলা থাকছে। বাগদাদে থাকা বাংলাদেশি কূটনীতিক ও স্টাফরা নিরাপদে থাকলেও তারা তাদের চলাফেরা সীমিত করেছেন। ডিপ্লোমেটিক প্রটেকশনে তারা বাসা টু মিশন যাতায়াত করছেন। এর বাইরে তাদেরও যাওয়া আসা বারণ রয়েছে। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতেও মিশনের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা রয়েছে জানিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাগদাদ ভিত্তিক অন্যান্য দেশের মিশনের সঙ্গে বাংলাদেশ মিশন নিয়মিতভাবে যোগাযোগ রাখছে এবং পরিস্থিতির আপডেট নেয়ার চেষ্টা করছে। ইরাকে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবু মাকসুদ মো. ফরহাদ গতকাল সন্ধ্যায় মানবজমিনকে বলেন, ইরানী জেনারেল নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতির বিস্তারিত জানিয়ে ঢাকায় মিশন তাৎক্ষণিক যে রিপোর্ট পাঠিয়েছে তার বাইরে তেমন কোন আপডেট নেই। তবে রাষ্ট্রদূত নিশ্চিত করেছেন কোন বাংলাদেশি হতাহতের ঘটনা নেই।
ওদিকে দূতাবাসের বরাতে রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, বাংলাদেশি আতঙ্কে থাকলেও কোন হতাহতের ঘটনা এখন পর্যন্ত নেই। শুক্রবার রাতে ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডসের অভিজাত বাহিনী কুদ’স ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানিসহ অন্তত ১০ জন মার্কিন রকেট হামলায় বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে নিহত হন। এরপর থেকে দফায় দফায় হামলা পাল্টা হামলা চলছে। গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৩টি বড় হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাতে বহু হতাহতের খবর এসেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির পর জেনারেল সোলাইমানিকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে মনে করা হতো। ওই হত্যার কঠোর প্রতিশোধ নেয়ার ইরানি ঘোষণায় গোটা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ওই হামলায় জেনারেল সোলাইমানি ছাড়াও ইরান সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়া নেতা আবু মাহদি আল-মুহান্দিসও নিহত বলে পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে। পেন্টাগনের তরফে হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছে। বলা হয়েছে- প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশনায় বিদেশে থাকে মার্কিন নাগরিকদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিতে মার্কিন সেনাবাহিনী ওই অভিযান চালিয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাস বলছে, ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিশেষত সরকার বিরোধী আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের সম্পৃক্ততা। আর এ কারণেই পাল্টা পাল্টি ওই অবস্থান। এটি দিনে দিনে অবণতির দিকে যাচ্ছে এ আশঙ্কায় বাংলাদেশিদের নিরাপদ রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আগাম সতর্কতা জারিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। দূতাবাসের তথ্য মতে, রাজধানী বাগদাদেই ১লাখ বাংলাদেশি রয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে বসরা। সেখানে ৩০ হাজারের মত বাংলাদেশির অবস্থান। কুর্দিস্থানে প্রায় ২০ হাজার, কারবালায় ১৫ হাজার এবং নাজাফ, কিরকুকসহ অন্যান্য শহর এবং প্র্রদেশে ছড়িয়ে আছেন আরও প্রায় ৪০ হাজারের মত বাংলাদেশি। ওদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা রাতে মানবজমিনকে জানিয়েছেন, ইরান পরিস্থিতির বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠিয়েছে তেহরানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। ঢাকায় থাকা ইরান দূতাবাসের তরফেও বাংলাদেশ সরকারকে পরিস্থিতির বিস্তারিত অবহিত করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এখনও এ ঘটনায় কোন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
ইরাকে ২ লাখ বাংলাদেশির বাইরে যাওয়া বারণ
বিতর্কিত ১২ কাউন্সিলরও ঢাকা সিটি নির্বাচনে
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ শুদ্ধি অভিযানে লাপাত্তা হয়ে যাওয়া বিতর্কিত ১২ কাউন্সিলর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন। ১২ কাউন্সিলরের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৭ জন আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে রয়েছেন ৫ জন। এসব কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনা, দখল, মাদক ব্যবসায় ইন্ধন, জুয়ার আসরে মদতদান, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। ওইসব কাউন্সিলরের কর্মকাণ্ডেসংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা অতিষ্ট হয়ে উঠেন। তাদের বিরুদ্ধে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে নালিশ জানিয়েও কোন লাভ হয়নি। শুদ্ধি অভিযানের সময় তারা দীর্ঘদিন আড়ালে থেকেছেন। কাউকে জন সমাগমে দেখা যায়নি। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর তারা আবার প্রকাশ্যে এসেছেন।
শুধু তাই নয়, আসন্ন ঢাকা সিটি করপোরেশনে তারা মনোনায়ন চেয়েছেন দলের কাছে। দলও তাদের ওপর আস্থা রেখেছেন। তারা মনোনায়ন পেয়েছেন। তাদের মনোনায়ন দেয়ার ফলে এলাকাবাসী হতাশ হয়েছেন। ওইসব এলাকায় বিদ্রোহী প্রার্থীরা তাদের পথ আটকে দিতে পারেন। এসব কাউন্সিলররা হচ্ছেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার আফসার উদ্দিন খান, ৫ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার আব্দুর রউফ নান্নু, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শামীম হাসান, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মুজিব সারোয়ার মাসুম, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের হারুনূর রশীদ, ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের সালেম মোল্লা ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের জাকির হোসেন।
এছাড়াও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হওয়া কাউন্সিলররা হচ্ছেন, ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আশ্রাফুজ্জামান ফরিদ, ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহমেদ রতন, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সিরাজুল ইসলাম ভাট্রি, ১০ নম্বর ওয়ার্ডে মারুফ আহমেদ মুনসুর ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের হাসিবুর রহমান মানিক। এইসব ওয়ার্ড কাউন্সিলররা শুদ্ধি অভিযানের সময় গাঢাকা দিয়েছিলেন। অফিস বাসায় তাদের পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের ফোন প্রায় সময় বন্ধ ছিল। তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের অবস্থান জানাতে পারেননি। এমনকি সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা তাদের কাছে সেবা গ্রহণের জন্য গেলে তারাও সাক্ষাৎ পাননি। তাদের কার্যালয়ের সচিবরা তাদের নামে বিভিন্ন ফাইলে সাক্ষর করছেন।
তবে এ বিষয়ে আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানান, ‘ যেসব কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তারা মনোনীত হবেন না।’ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আফসার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে উত্তরা মডেল টাউন, কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আব্দুর রউফ নান্নুর বিরুদ্ধে পল্লবীর পলাশনগর ও কাউলিয়া বাঁধ এলাকায় মাদক বাণিজ্য এবং জুয়ার আসর পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। শুদ্ধি অভিযানে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তার বাড়িতে একাধিকবার হানা দিলেও তাকে পায়নি। ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শামীম হাসানের বিরুদ্ধে তেজগাঁওয়ে চাঁদাবাজি ও রেলবস্তিতে মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মুজিব সারোয়ার মাসুমের বিরুদ্ধে উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় মাদক ব্যবসার ইন্ধন দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোলাচালানকারী চক্রের সঙ্গে তার যোগসাজসের অভিযোগ রয়েছে। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হারুনূর রশীদের বিরুদ্ধে মনিপুর এলাকায় একাধিক জুয়ার আসর পরিচালনা ও আবাসন ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা তোলার অভিযোগ আছে বলে জান গেছে। এছাড়াও ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সালেম মোল্লার বিরুদ্ধে ভাষানটেক বস্তিতে মাদক ব্যবসা পরিচালনা ও মিনি ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগ আছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। এছাড়াও ১৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে নর্দায় পরিবহন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজসে চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ আছে।
এদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে যে ৫ জন কাউন্সিলর মনোনীত হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও আছে বিস্তর অভিযোগ। ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আশ্রাফুজ্জামান ফরিদের বিরুদ্ধে সবুজবাগ ও মায়াকানন এলাকায় মাদক ব্যবসা ও মিনি ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। শুদ্ধি অভিযানের পর তিনি লাপাত্তা ছিলেন। ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহমেদ রতনের বিরুদ্ধে ফুলবাড়িয়া বাসস্টান্ডে চাঁদাবাজি ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওষুধ চুরির অভিযোগ আছে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ওই এলাকায় ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগ আছে দীর্ঘদিন ধরে। ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সিরাজুল ইসলাম ভাট্রির বিরুদ্ধে মুগদা রেল কলোনীতে ও আশপাশের এলাকায় জুয়ার আসরে মদত দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার মারুফ আহমেদ মুনসুর হচ্ছেন ক্যাসিনো সম্রাট নামে খ্যাত মমিনুল হক সাঈদের অন্যতম সহযোগী। মতিঝিলের ক্লাবে তার বিরুদ্ধে ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিকের বিরুদ্ধে লালবাগ টেম্পো স্টান্ড থেকে চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। শুদ্ধি অভিযানের পর তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
অস্থির তেলের বাজার
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ ইরাকে মার্কিন হামলায় ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহতের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তেলের দাম সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ব্যারেল প্রতি সর্বনিম্ন ৩ ডলার থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৭০ ডলার বাড়ে মূল্য। গতবছর সৌদি আরবের প্রধান তেল স্থাপনায় হামলার পর এটাই তেলের বাজারে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা। মার্কিন হামলার তীব্র প্রতিশোধ নেয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। এতে অস্থিরতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে দুইদেশের মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন। তেমনটা হলে তেলের বাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধস নামতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। কেবল তেলের বাজার নয়, অস্থিরতা দেখা দিয়েছে বিশ্বের প্রায় সকল শেয়ার বাজারগুলোয়। ইউরোপ-ভিত্তিক শেয়ার বাজার বিষয়ক সূচক প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান শুক্রবার স্টক্স ৬০০ জানিয়েছে, তাদের সূচকে বাজারমূল্য এক শতাংশ কমেছে। এতে লোকসান হয়েছে অবশ্য ০.৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে, ওয়াল স্ট্রিট শেয়ার বাজারে দরপতন হয়েছে ০.৮ শতাংশ।
সোলাইমানির হত্যার প্রতিশোধের দাবিতে বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় উঠেছে। এতে উদ্বেগে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে তেলের বাজারে বড় প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হরমুজ প্রণালী। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ৩০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়। ২১ কিলোমিটার প্রস্থের এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ইরানের কাছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধে এই প্রণালীতে অবরোধ জারি করলে বা বিদেশি জাহাজ যাতায়াত বন্ধ করে দিলে তেলের বাজারে অস্থিতিশীলতা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে বাজারে। কিন্তু এখান দিয়ে জাহাজ যাতায়াত করতে দেয়ার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে। আইনটিতে ইরানের স্বাক্ষরও রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে ইরান যেকোনো জাহাজকে যাতায়াতের অনুমতি দিতে বাধ্য। কিন্তু দেশটির পার্লামেন্ট আইনটির প্রতি সমর্থন জানায়নি। ফলে ইরান সরকার সেটা মানবে কি-না তা সন্দিহান।
এদিকে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ হলেও তেলের দামে বড় মাপের পরিবর্তন নাও আসতে পারে। ব্যাংক অব আমেরিকার এক পণ্য বিষয়ক কৌশলী জানান, ২০০৪ সাল আর বর্তমান সময়ের মধ্যে বহু ভিন্নতা রয়েছে। পরিবর্তন এসেছে তেলের বাজারে। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের ওপর তেলের জন্য সমপূর্ণ নির্ভরশীল নয়। তেলের বাজারে অস্থিরতা গত বছরও দেখা গেছে। হরমুজ প্রণালীতে সৌদি ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর বেড়েছিল তেলের দাম। সে সময় সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল তেলের দাম। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই স্থিতিশীল হয়ে যায়। পরবর্তীতে সৌদি আরবের প্রধান তেল স্থাপনাতেও হামলা হয়। এরপরও সাময়িকভাবে বাড়ে তেলের দাম। কিন্তু কখনোই উচ্চ পর্যায়ের কোনো প্রভাব পড়েনি।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তেল বাণিজ্যের প্রধান কার্টেল হচ্ছে ওপেক। ইরাক যুদ্ধের সময় সংস্থাটির তেলের বাজারে যে প্রভাব ছিল তা এখন অনেকটাই কমেছে। ব্যাংক অব আমেরিকার পণ্য বিষয়ক কৌশলী মাইকেল উইডমের বলেন, ওপেক যখনই তাদের উৎপাদন কমায় তখনই নতুন কোনো দেশ তেলের বাজারে তাদের জায়গা করে নেয়।
উড ম্যাকেনজির মার্কেটিং ও গবেষণা দলের প্রধান এলান গেল্ডার বলেন, একসময় ওপেক বিশ্বের অর্ধেক তেল উৎপাদন করতো। এখন সংস্থাটি এটি বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশেরও কম তেল উৎপাদন করে। ১৯৯০ সালের গাল্ফ যুদ্ধের সময় পশ্চিমা দেশগুলো দুই জায়গা থেকে তেল পেতো- ওপেক ও উত্তর সাগর। কিন্তু উত্তর সাগর থেকে তেল উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খুবই ব্যয়বহুল ছিল। বিশেষ করে বছর চল্লিশ আগে সেটি বেশ অননুমেয় ও কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু এখন উত্তর আমেরিকা থেকেই তেল উত্তোলন সম্ভব হচ্ছে। গেল্ডার বলেন, তৎকালীন সময়ে তেলের বাজার সবে স্থাপিত হচ্ছিল। বর্তমান বাজারে প্রতিযোগীর সংখ্যা বহু। এছাড়া, পাঁচ বছর আগের চেয়ে বর্তমানে তথ্য পাওয়া আরো সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।
পাচার অর্থের তথ্য সংগ্রহ: সুইজারল্যান্ড কানাডা মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন গোয়েন্দারা
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের তথ্য উঠে এলেও সুইস ব্যাংকসহ অন্যান্য যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছে সেসব দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সহজে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বাংলাদেশের অভিযুক্ত অর্থ পাচারকারীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে আর্থিক বা কর গোয়েন্দা কর্মকর্তা পাঠানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত ওয়ার্কিং কমিটি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আগামীকাল সোমবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে এ বিষয়ে সভা হওয়ার কথা রয়েছে।
সূত্র জানায়, সুইজারল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যেখানে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে- সেসব দেশ থেকে অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও সুপারিশ সংবলিত একটি প্রতিবেদন তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি। ওই কমিটির সমন্বয় সভায় সম্প্রতি পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে ডুয়াল ক্রিমিনালিটি, তথ্য সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রিতা ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ না করাসহ বিভিন্ন আইনি জটিলতা তুলে ধরা হয়। ওই সভায় এসব জটিলতা নিরসনে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনে স্বল্প সময়ের জন্য কর গোয়েন্দা পাঠানোর প্রস্তাব ওঠে আসে। বলা হয়, এসব কর গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাংলাদেশ মিশনে ২ থেকে ৩ মাসের জন্য কাজ করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেসব দেশের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি ছাড়া এসব বিষয়ে কেউ কোনো ধরনের তথ্য দিতে চায় না। রয়েছে আইনগত জটিলতাও। একটি অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে গেলে ওই বিষয়টি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে হয়। এজন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্র্থ পাচারের তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট আর্থিক বা কর গোয়েন্দাকে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাড গত নভেম্বরে যে রিপোর্ট দিয়েছে সে অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে যত টাকা কর আদায় হয়, তার প্রায় ৩৬ শতাংশের সমান বিদেশে পাচার হয়ে যায়। সংস্থাটি বলেছে, আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে সিংহভাগ অর্থ পাচার করা হচ্ছে। এর আগে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্র্যাটি (জিএফআই) গত বছরের জানুয়ারিতে যে রিপোর্ট প্রকাশ করে সেখানেও অর্থ পাচারের বিষয়ে বাংলাদেশের নাম ওপরের দিকে তালিকাভুক্ত হয়। বিশ্বের ১৪৮টি দেশের মধ্যে অর্থ পাচারের দিক থেকে ১৯তম স্থানে ছিল বাংলাদেশের নাম। জিএফআইর ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার বা সাড়ে ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থ পাচারের এই পরিমাণ বাড়ছে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ফাঁস হয় প্যারাডাইস পেপারসের ১ কোটি ৩৪ লাখ নথি। ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট (আইসিআইজে) ওই নথি তদন্ত করে। দেখা যায়, উত্তর আটলান্টিক সাগর তীরের ছোট্ট দেশ বারমুডায় নামমাত্র কর দিয়ে নামে-বেনামে কোম্পানি গঠন করে মূলধন পাচারের তালিকায় অন্যদের সঙ্গে কয়েকজন বাংলাদেশি প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর নামও ওঠে আসে। ওই সময় এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে তথ্য চেয়েও পায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে থেমে নেই রাষ্ট্রীয় দফতরগুলো। এদিকে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বা এর ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সাবেক উপপ্রধান ম. মাহফুজুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমার মনে হয় না বিদেশে কর গোয়েন্দা পাঠিয়ে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে কোনো কাজ হবে। এ ধরনের কোনো কর্মকর্তা গিয়ে তথ্য চাইলেও পাবে না। কারণ এটি খুবই জটিল প্রক্রিয়া। তিনি বলেন, দুই প্রক্রিয়ায় পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। প্রথমত, পাচারের ব্যাপারে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেতে হবে। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেশের আদালতে রাষ্ট্রপক্ষকে মামলা করতে হবে। স্থানীয় আদালতে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার পক্ষে রায় দিতে হবে। আদালতের এ রায়ের কপি অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে যে দেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে ওই দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকে অবহিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস অর্থ ফেরত দেওয়া যায় কিনা তা নিয়ে ওই দেশের আদালতে মামলা করবে। অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে আইনি জটিলতা না থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত থেকে পাচারকৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে রায় প্রদান করবে। এর পরই কেবল পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। উপরন্তু ওপরের প্রক্রিয়াটি কেবলমাত্র সরকারি টাকা বা দুর্নীতি করে টাকা পাচার করার ক্ষেত্রে কাজে লাগবে। এর বাইরে আমদানি-রপ্তানি বা মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে অর্থ পাচারের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এসব তথ্য কোনো ব্যাংক দেয় না, কোনো আইনও নেই। এক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহের কোনো সুযোগ থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চিঠি দিয়েই সেই তথ্য পেতে পারে।
ভয়ঙ্কর যুদ্ধের দামামা : ইরাকে মার্কিন দূতাবাস ও বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে রকেট হামলা
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ ইরাকে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ইরানের কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলাইমানির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ বেধে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বার্তা সংস্থাগুলো জানায়, ইরাকের রাজধানী বাগদাদের মার্কিন দূতাবাস ও বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে গতকাল রকেট হামলা চালানো হয়েছে। জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যার জেরে এ হামলা চালানো হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরাকের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস ও সালাহউদ্দিন প্রদেশের মার্কিন বিমানঘাঁটিতে একযোগে পাঁচটি রকেট হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় তৎক্ষণাৎ পাঁচজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসের কাছে দুটি রকেট ছোড়া হয়। এ ছাড়া বাগদাদের উত্তরে সালাহউদ্দিন প্রদেশে মার্কিন সেনাদের বালাদ বিমানঘাঁটিতে তিনটি রকেট ছোড়া হয়। একযোগে এসব রকেট ছোড়া হয়। কে বা কারা এসব হামলা চালিয়েছে রাত দেড়টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিস্তারিত জানা যায়নি।
এর আগে পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সকে লক্ষ্য করে মার্কিন বাহিনী ফের বিমান হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানায়। এতে অন্তত ৬ জন নিহত হয়েছেন বলে খবর প্রকাশ করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তবে পরে পেন্টাগন এ ঘটনা সত্য নয় উল্লেখ করে বিবৃতি দেয়। ইরাকের কর্মকর্তারাও এ ধরনের কোনো হামলার কথা অস্বীকার করেন।
জেনারেল কাসেম সোলাইমানি ও আল মুহানদিসের জানাজায় গতকাল লাখ লাখ মানুষ অংশ নেয়। জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের পরনে ছিল কালো পোশাক আর হাতে ছিল ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সের পতাকা। এ সময় তারা যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংস চেয়ে নানা ধরনের স্লোগান দেন। একটি স্লোগান ছিল ‘আমেরিকার মৃত্যু চাই।’ ইরানি জেনারেলকে হত্যা ঘটনায় জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সব পক্ষকে সর্বোচ্চ ধৈর্য ধরার আহ্বান জানালেও এই হত্যাকান্ডের নিন্দা জানাননি। মহাসচিব বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে আরেক যুদ্ধের ধকল সহ্য করার মতো অবস্থা বিশ্বের নেই। জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে এক টেলিফোনালাপে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ বলেন, ‘ইরানি শীর্ষ জেনারেলকে হত্যার যে কোনো পরিণতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী থাকতে হবে।’ মার্কিন সিনেটর টিম কেইন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য মার্কিন কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে আরও ৩ হাজার সেনা পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। ফলে এ অঞ্চলে যে কোনো মুহূর্তে ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চলমান উত্তেজনার জেরে নিজেদের এয়ারলাইনসগুলোকে ইরানের আকাশসীমা এড়িয়ে চলার নির্দেশনা দিয়েছে ভারত। নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে গত শুক্রবার বাহরাইনের গালফ এয়ার, ন্যাশনাল এয়ারলাইন, জর্ডানের রয়্যাল জর্ডানিয়ান এয়ারলাইনস বাগদাদে নিজেদের ফ্লাইট বাতিল করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি এই হত্যাকান্ডের কঠোর প্রতিশোধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, দেশের পশ্চিম আকাশে যুদ্ধবিমানের মহড়া চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশটির দুই বড় শহর নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেসে হামলার আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
গত বছর মে মাসে পরমাণু-সংক্রান্ত এক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে আসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে সংকট প্রকট হতে শুরু করে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়ে ইরান। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ ও স্থাপনায় বোমা হামলা, সরাসরি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনাও ঘটে। সম্প্রতি ইরাকে বেশ কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছিল। এক হামলায় নিহত হন এক মার্কিন বেসামরিক ঠিকাদার। এর প্রতিশোধ নিতেই যুক্তরাষ্ট্র কাতায়েব হিজবুল্লাহর ২৫ সেনাকে হত্যা করে। এর জের ধরে দুই দিন ধরে বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস ঘিরে বিক্ষোভ হয় এবং দূতাবাসের ওপর আক্রমণ হয়। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েই বাগদাদে সোলাইমানির গাড়িবহরে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। জেনারেল সোলাইমানি সিআইএ ও মোসাদের হিটলিস্টে বহু আগে থেকেই ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখেন জেনারেল সোলাইমানি। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেনের মতো দেশগুলোতে তেহরানপন্থি শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে পরাক্রমশালী করে তোলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের এই দ্বৈরথে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে, যার নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশেই ইরানের হাতে। ইরান এই রুট বন্ধ করে দিলে বড় ধরনের বিপাকে পড়বে গোটা বিশ্ব।
সোলাইমানির রাজত্ব শেষ হয়েছে- ট্রাম্প : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ শুরু করতে নয়, আরেকটি যুদ্ধ ঠেকাতেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করেছে। তিনি ফ্লোরিডার অবকাশযাপন কেন্দ্র মার-আ-লগোতে এক সংবাদ সম্মেলনে গতকাল বলেন, শুক্রবার বাগদাদ বিমানবন্দরে হামলায় সোলাইমানির ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব শেষ হয়েছে’।
জানাজা পড়াবেন খামেনি : তেহরানে লাশ নেওয়া হলে সোলাইমানির জানাজা পড়াবেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। বিকালে কাসেম সোলাইমানিসহ পাঁচজনের মৃতদেহ ইরানে পৌঁছার কথা। এসব মৃতদেহ মাশহাদে ইমাম রেজা (আ.)’র মাজারে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে কিছু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে রবিবার তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জানাজা হবে। সোলাইমানিকে মঙ্গলবার কেরমানে দাফন করা হবে।
জাতিসংঘকে ইরানের হুঁশিয়ারি : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাওয়াদ জারিফ বলেছেন, সোলাইমানিকে হত্যার যে কোনো পরিণতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী থাকতে হবে। শুক্রবার রাতে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে এক টেলিফোনালাপে এ কথা বলেন।
বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার পরামর্শ : ইরাকের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশের নাগরিকদের সতর্ক থাকতে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস। গতকাল ইরাকে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রধান মো. অহিদুজ্জামান লিটন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ইরাকের চলমান নিরাপদহীন অস্থিতিশীল পরিবেশের কথা বিবেচনা করে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরাকে বাংলাদেশি প্রবাসীদের বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত কর্মস্থল ও বাসস্থান ছাড়া যত্রতত্র যাতায়াত, সব সভা-সমাবেশ ও গোলযোগপূর্ণ পরিবেশ এড়িয়ে চলার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।’ এতে জানানো হয়, প্রবাসীদের কনস্যুলার সেবা প্রদানের জন্য সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা বাংলাদেশ দূতাবাস খোলা থাকবে।
ইদলিবে মিষ্টি বিতরণ : সোলাইমানি সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে যুদ্ধে আসাদ সরকারকে সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তার মৃত্যুতে সিরিয়ার ইদলিবের জনগণ উল্লসিত। তারা সোলাইমানির মৃত্যুতে মিষ্টি বিতরণ করে। ফুঁসছে ইরান : সোলাইমানিকে হারিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে ইরান। ‘উপযুক্ত সময়ে, যথাস্থানে’ এই হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানি সেনাবাহিনীর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হত্যার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ উসকে দিয়েছে ওয়াশিংটন। তাদের মতে, সোলাইমানিকে হারানোর পর ইরানি বাহিনীর সক্ষমতায় ভাটা পড়লেও যে কোনো উপায়ে বদলা নেওয়ার চেষ্টা করবে তেহরান। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি নীতির অন্যতম বিশ্লেষক চার্লস লিস্টার সিএনএনকে বলেছেন, এই হামলা কৌশলগত তাৎপর্য ও প্রায়োগিক দিক থেকে আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন বা আইএস প্রতিষ্ঠাতা আল বাগদাদির হত্যার চেয়েও আলাদা। তিনি বলেন, কয়েক মাস ধরেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি পরিস্থিতি বিরাজ করছে আর এই হত্যাকা- সেই উত্তেজনাকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেবে। ওয়াশিংটনের থিঙ্কট্যাঙ্ক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের পলিসি ডিরেক্টর বেন ফ্রাইডম্যান ওই হামলাকে ‘উল্লেখযোগ্য বেপরোয়া কর্মকা-’ আখ্যা দিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন বাহিনীর সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়।
ভুয়া ভিডিও পোস্ট করে বিপাকে ইমরান খান
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ বাংলাদেশের ভিডিওকে ভারতের আন্দোলনের দাবি করে বিপাকে পড়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। শুক্রবার রাত ৮টার দিকে নিজের টুইটারে ভিডিওটি আপলোড করেন তিনি। ওই ভিডিও সম্পর্কে তিনি মিথ্যা দাবি করেন যে, উত্তর প্রদেশে মুসলিমদের ওপর হামলা চালাচ্ছে ভারতীয় পুলিশ। কিন্তু পরে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ভিডিওটি ভারতের নয় বরং সেটা ছিলো বাংলাদেশের। মুহূর্তেই নেটিজেনদের ক্ষোভের মুখে পড়েন ইমরান খান। কমেন্টে তারা ভুয়া ভিডিও পোস্টের জন্য পাক প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করেন। ক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত ভিডিওটি মুছে ফেলতে বাধ্য হন ইমরান। এর আগে প্রায় দু ঘন্টা ভিডিওটি টুইটারে ছিলো। ততক্ষণে তার স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিতে।
ভিডিওতে দেখা যায়, নিরাপত্তা বাহিনীর পোশাক পরিহিত একটি দল লাঠিপেটা করছে। ভুয়া ভিডিও পোস্টের প্রতিবাদ জানিয়েছে উত্তর প্রদেশ পুলিশও। তারা বলেছে, এটা উত্তর প্রদেশ নয়, ২০১৩ সালে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার একটি ঘটনা এটা। যেসব বাহিনীর সদস্যদের সেখানে দেখা গেছে তাদের ইউনিফর্মে লেখা ছিলো র্যাপিড একশন ব্যাটেলিয়ন (র্যাব)। উত্তর প্রদেশ পুলিশ ইমরান খানের ভুল ধরিয়ে দিতে সঙ্গে কিছু লিংকও যুক্ত করে দেয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে জানা যায়, যেই ভিডিওটি ইমরান খান পোস্ট করেছিলেন সেটি আসলে ২০১৩ সালে ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের সময়ে। সেসময় সমাবেশ থেকে ঢাকার দোকানপাটে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। বিশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করতে তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে লাঠিপেটা করেছিলো। সেই ৭ বছর পূর্বের ঘটনারই একটি ফুটেজ নিয়ে তাকে উত্তর প্রদেশের ঘটনা বলে দাবি করেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। এ নিয়ে তাকে ভর্তসনা করেছেন ভারতীয় কর্মকর্তারাও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মুখপাত্র রাভিশ কুমার টুইটারে লিখেছেন, এটি ইমরান খানের পূর্বেকার অভ্যাস।
উদ্বেগ-নিন্দা রাশিয়া, ফ্রান্স জার্মানি ও চীনের
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ ইরানের কুদ্স ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যায় যেমন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন, তেমনি বিশ্বের বড় বড় শক্তিগুলোতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সোলাইমানিকে হত্যার নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, সিরিয়া, চীন ও ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল। তবে প্রতিক্রিয়া দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করেছে বৃটিশ সরকার। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই হত্যাকাণ্ড মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনাকে বৃদ্ধি করবে। জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যাকে একটি ‘অ্যাডভেঞ্চারিস্ট’ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে রাশিয়া। দেশটির রাষ্ট্র পরিচালিত বার্তা সংস্থা তাস’কে এ কথা বলেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কূটনীতিক। রাশিয়ার পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রধান যুক্তরাষ্ট্রের ওই বিমান হামলাকে একটি ভুল পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, এটা হামলাকারীদের বিরুদ্ধেই বুমেরাং হতে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ইউরোনিউজ।
এতে বলা হয়, শুক্রবার কোনস্টান্টিন কোসাচেভ তার ফেসবুকে লিখেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমাধানের শেষ আশাটুকুও ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেছেন, এখন ইরান তার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পদক্ষেপ দ্রুততর করতে পারে, যদিও এর আগে তাদের এমন পরিকল্পনা ছিল না। রাশিয়া ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টারের স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ অ্যান্ড এনালাইসিসের পরিচালক ভ্লাদিমির সন্তেকোভ বলেছেন, সোলাইমানিকে হত্যা একটি বড় ভুল। হতে পারে পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টারা পুরোপুরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবহিত করেন নি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে। এ বিষয়ে মার্কিনিরা কোনো স্ট্রাটেজিক অবস্থান নেয়নি। কিন্তু কৌশলগত দিক দিয়ে এটা একটা ভুল। এর ফলে ইরানে নতুন করে মার্কিন বিরোধিতা উসকে উঠবে। নির্বাচনী প্রচারণায় ইরানের সঙ্গে সমঝোতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তাতে আঘাত লাগবে। এর ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে তার অংশীদারদের সম্পর্কে টান ধরতে পারে।
ওদিকে হত্যাকাণ্ডের পর উভয় পক্ষকে শান্ত ও বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন। তারা এ ঘটনায় উচ্চ মাত্রায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেং শুয়াং ৩রা জানুয়ারি এমন কথা বলেন। এতে তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তির ব্যবহারের সব সময় বিরোধিতা করে চীন। উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পাওয়ার বিরুদ্ধে তারা সতর্ক করেছে। ইরানকে একঘরে করে দেয়া এবং তার অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রচেষ্টা তার বিরোধিতা করে আসছে যেসব দেশ, তার মধ্যে অন্যতম চীন। গত মাসে ভারত মহাসাগরে প্রথমবারের মতো ইরান ও রাশিয়ার নৌবাহিনীর সঙ্গে মহড়ায় যোগ দিয়েছে চীন।
হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানিয়েছে ফ্রান্স। দেশটির পররাষ্ট্র বিষয়ক উপমন্ত্রী আমেলি ডি মন্টচালিন বলেছেন, আমরা ঘুম থেকে উঠলাম আরো বিপজ্জনক এক পৃথিবীতে। সামরিক উত্তেজনা সব সময়ই বিপজ্জনক। এই উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পরে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। তিনি নতুন বিপজ্জনক উত্তেজনা এড়ানোর পক্ষে এবং সবাইকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন। বৃটিশ সরকার সতর্কতার সঙ্গে বলেছেন, আরো যুদ্ধ আমাদের কারো পক্ষে যাবে না। বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোমিনিক রাব বলেছেন, কাসেম সোলাইমানি নেতৃত্বাধীন ইরানের কুদস বাহিনী যে আগ্রাসী হুমকি হয়ে আছে, সে বিষয়টি সব সময়ই স্বীকার করে বৃটেন। তবে এই বিবৃতিতে ওই হত্যাকাণ্ডের পক্ষে বা বিপক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করা হয়নি। কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে জার্মানি। বলা হয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ভয়াবহ এক উত্তেজনাকর অবস্থায় উপনীত হয়েছে। এই সংঘাত শুধুমাত্র কূটনৈতিক উপায়েই সমাধান করা যেতে পারে। তবে ইরান এরই মধ্যে তেলবাহী ট্যাংকার ও সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় যে হামলা করেছে, সেদিকে ইঙ্গিত করে জার্মান সরকারের মুখপাত্র উলরিক ডেমার মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ওইসব ঘটনার মধ্যদিয়ে সামরিক উস্কানি দিয়েছিল ইরান। তারই জবাবে যুক্তরাষ্ট্র এমন হামলা চালিয়েছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল যেকোনো মূল্যে সব পক্ষকে উত্তেজনা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরাকের সহিংসতা থেকে পুরো অঞ্চলে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
হিসাব কষেই ঝুঁকি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র : এশিয়া টাইমস
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জাতীয় বীর হিসেবে খ্যাত কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা তিনি হিসাব কষেই নিয়েছেন। তার সামনে যেসব বিকল্প ছিল, সম্ভবত তিনি তার মধ্য থেকে সেরাটাই বেছে নিয়েছেন। এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এমনটা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ক্ষমতা পাওয়ার পর ট্রাম্পের হাতে তেমন বিকল্প ছিল না। বিশেষ করে তার পূর্বসূরি জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনই এজন্য দায়ী। ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে সরিয়ে তিনি পশ্চিম এশিয়ায় কয়েকশ’ বছর পুরনো সুন্নি-শিয়া ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছিলেন। সাদ্দামকে সরিয়ে তিনি ইরাকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন ইরানপন্থি শিয়া সরকারকে। সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনে বিশ্বাস ছিল বুশের। ফলে তার ওই সিদ্ধান্ত নব্য রক্ষণশীলরা ইতিবাচকভাবে নেয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ওই কারণেই এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পেয়ে যায় ইরান। ট্রাম্প অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন ইরানের ওপর। কিন্তু এতে যে ইরান দমে গেছে, তা নয়। সম্প্রতি, ইরাকে যখন ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের ওপর বিমান হামলা চালালো যুক্তরাষ্ট্র, তখন বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়ে উস্কানি দেয় ইরান। ইরানের উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে নমনীয় করা। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইটের বদলে পাটকেল মারতে পারতো। কিন্তু ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি আনুপাতিক পদক্ষেপের ধার ধারবেন না।
ইরানের মার্কিন দূতাবাস হামলা, আর যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সোলেমানির হত্যাকাণ্ড, দুই-ই খুব ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। মার্কিন দূতাবাসে মিলিশিয়া হামলায় সমর্থন দিয়ে লাল দাগ অতিক্রম করেছিল ইরান। ঠিক তেমনি জেনারেল সোলেমানিকে হত্যা করে ট্রাম্পও লাল দাগ অতিক্রম করেছেন। কোনো রাষ্ট্রই এ ধরনের সিদ্ধান্ত খেয়ালখুশি মতো নেয় না। ইরানের আঞ্চলিক কৌশল নির্ভর করে অনিয়মিত যুদ্ধ কৌশলের ওপর। ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননের শিয়া মিলিশিয়ারা এই যুদ্ধে লিপ্ত। এ ছাড়া দেশটির আছে কৌশলগত কিছু অস্ত্রও। যেমন, মধ্যমপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। সেপ্টেম্বরে ইরান নিজেদের কৌশলগত শক্তিমত্তার কিছুটা জানান দিয়েছিল। তখন মাটিঘেঁষা ক্রুজ মিসাইল ও স্বচালিত ড্রোন ব্যবহার করে সৌদি আরবে আরামকোর তেল স্থাপনায় হামলা চালাতে সক্ষম হয় দেশটি। ২০১৭ সালে ইরান ২০০০ কিলোমিটার পাল্লার খোরামশার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল। এটি স্পষ্ট নয় যে, এই অস্ত্র কতটা কার্যকর বা ইরানের হাতে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র কয়টি আছে। তবে এমনটা খুবই সম্ভব যে, দোহায় অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটির ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দেয়া বা পারস্য উপসাগরে অবস্থিত কোনো মার্কিন রণতরীর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করে আক্রমণ হানার মতো যথেষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের আছে। তবে পারস্য আসলে একটি ক্ষীয়মাণ শক্তি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ফ্রান্স যে অবস্থায় ছিল, ইরানও আজ সেই অবস্থায় আছে। ইরানে ৬৫ বছর বয়সী প্রত্যেক নাগরিকের বিপরীতে কাজ করার মতো নাগরিক আছে ৫ জন। কিন্তু ২০৫০ সাল নাগাদ এই অনুপাত পাল্টে যাবে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১ জন অবসরপ্রাপ্ত নাগরিকের বিপরীতে ১.৮ জন কর্মী থাকবে। ইরানের অর্থনীতি ধসে যাবে। দেশটির পেনশন সিস্টেম ইতিমধ্যেই দেউলিয়া হয়ে গেছে। আঞ্চলিক আধিপত্য ধরে রাখতে ইরানের একমাত্র আশা হলো মেসোপটোমিয়া ও লেভান্তজুড়ে শিয়া উপস্থিতি আরো বিস্তৃত করা। এক্ষেত্রে মাধ্যম হতে পারে লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো মিলিশিয়া, কিংবা সিরিয়ায় ৮০ হাজার সদস্যের মার্সেনারি মিলিশিয়ারা, যাদের বেশির ভাগই আফগান ও পাকিস্তানি শিয়া। নেপোলিয়নকে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী তালেরান্ড যেমনটা বলেছিলেন, ইরানের সমস্যা হলো যে, বেয়নেট দিয়ে আপনি যা ইচ্ছা তা করতে পারবেন না। শুধু পারবেন না বেয়নেটের ওপর বসে যেতে।
শিয়া বিশ্বে নিজের ভাবমূর্তি বজায় রাখতে হলে ইরানকে এখন অবশ্যই নিজের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। কিন্তু ইরাকে যদি যুক্তরাষ্ট্র আর সিরিয়াতে ইসরাইল সক্রিয় হয়, তাহলে ইরানের এই অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। গোলান উপত্যকার পাশ ঘেঁষে নিজেদের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তে ইরানি প্রক্সি বাহিনীর উপস্থিতি কিছুতেই মেনে নেবে না ইসরাইল। সিরিয়ায় ইরানি স্থাপনা ও উপস্থিতি লক্ষ্য করে হাজার হাজার বার বিমান হামলা চালিয়েছে দেশটি। রাশিয়া এই কেবল সম্প্রতিই একটু অনুযোগের সুরে বলেছে, হামলার তীব্রতা বেড়েছে। সুতরাং, ইরানি নেতাদের মন বোঝার চেষ্টা না করেও বলা যায় যে, সিরিয়ায় ইসরাইলি হামলার বিপরীতে নৈতিক বিজয় দেখাতে কিছু একটা করে দেখানো জরুরি হয়ে গিয়েছিল ইরানের জন্য। এ ছাড়া ঘরে অর্থনৈতিক দুর্দশা তো আছেই। নভেম্বরেই বিরাট সরকারবিরোধী প্রতিবাদ বেশ কঠোর হাতে দমন করেছে ইরান। হতাহতের সর্বোচ্চ সংখ্যা ১০০০। ৩০শে ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের ৫টি ঘাঁটিতে হামলা চালায়। এরপরই মূলত ইরান সিদ্ধান্ত নেয় যে, নিজেদের ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে হলে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিতে হবে। এরপরই মূলত ইরাকে শিয়া প্রক্সি গোষ্ঠী হামলা চালায় মার্কিন দূতাবাসে। ওই হামলার পর ট্রাম্পের হাতে বিকল্প ছিল খুব অল্প। ইরাক যুদ্ধে ৫ হাজার মার্কিন সেনা মারা গেছে। আহত হয়েছে ৫০ হাজার জন। ব্যয় হয়েছে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার। আর ওই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানি উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিপরীতে যে সাদ্দাম ছিলেন, তাকে হটিয়ে দেয়া হয়েছে। এভাবে মূলত ইরানের আঞ্চলিক আধিপত্যের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করে দেয় যুক্তরাষ্ট্রই।
ইরান চেয়েছিল মার্কিন দূতাবাসে হামলা হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপমানজনক হবে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা আঘাত হানা ব্যতীত উপায় ছিল না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেক্ষেত্রে বেশিই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। হত্যা করেছে ইরানের জাতীয় বীরকে। ট্রাম্প ইরানকে আরো বেশি অপমানিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন ট্রাম্পের সমালোচনা করা সহজ, কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামনে এর চেয়ে ভালো বিকল্প প্রস্তাব করা কঠিন। তিনি হয়তো ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের ওপর হামলা অব্যাহত রাখতে পারতেন। কিন্তু ওই হামলায় তেমন একটা কাজ হচ্ছিল না। এই সমীকরণে ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র কারও সামনেই ভালো বিকল্প নেই। ইরানকে অবশ্যই নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করে চলতে হবে, নয়তো দেশটির ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী ধসে পড়বে। কিন্তু কাশেম সোলেমানিকে হত্যার পর ইরান এখন কীভাবে নিজের ভাবমূর্তি ঠিক রাখবে? আমেরিকার মিত্র ইসরাইল বা সৌদি আরবের ওপর হামলা করা যেতে পারে, কিন্তু সেটি এখানে যথেষ্ট হবে না। কারণ, ওয়াশিংটন প্রকাশ্যেই হত্যা করেছে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতাকে। সুতরাং, পাল্টা আঘাত করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই।
সবচেয়ে ভয়াবহ সম্ভাব্যতা হলো, ইরান হয়তো মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালাতে পারে দোহায় অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে। সৌদি আরবে আরামকো স্থাপনায় সেপ্টেম্বরে ইরান যে হামলা চালিয়েছিল বলে বলা হয়, তাতেই মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্যাট্রিয়টের দুর্বলতা ফাঁস হয়ে যায়। প্রমাণ হয়ে যায় যে, ৬০ মিটারের চেয়ে নিচ দিয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে সক্ষম নয় প্যাট্রিয়ট। আর ইরানের আছে এমন নিচ দিয়ে আঘাত হানতে সক্ষম ক্রুজ মিসাইল। কিন্তু আমেরিকানরাও এই সমীকরণ বুঝতে পেরেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ, দোহায় অবস্থিত মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ দোহা থেকে সাময়িক সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় স্থানান্তর করা হয়। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকির কারণেই ওই পদক্ষেপ নেয় ইরান। কিন্ত ইরান যদি এখন দোহা ঘাঁটিতে সত্যিই হামলা চালায়, আমেরিকান প্রতিক্রিয়া হবে ভয়াবহ। মাত্র দুই ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা হামলা দিয়েই ইরানের সম্পূর্ণ অর্থনীতিকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। ইরানের ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা মেটায় এক ডজনেরও কম সংখ্যক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। মাত্র ৮টি পরিশোধনাগার থেকেই ইরানের খনিজ পদার্থের ৮০ ভাগ পরিশোধিত হয়। একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলাই একটি পরিশোধনাগার ধ্বংসে যথেষ্ট। তেমন কষ্ট না করেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের খার্গ বন্দর ধ্বংস করে দিতে পারে, যেখান থেকে ইরানের ৯০ শতাংশ জ্বালানি তেল রপ্তানি হয়। সুতরাং, কোনো ছোটোখাটো মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে টার্গেট করার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু আরো কোনো ছোট মার্কিন ঘাঁটি। এটি বেশ জটিল ইস্যু। সোলেমানি হত্যার উপযুক্ত প্রতিশোধ নিতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কঠোর আঘাত হানতে হবে ইরানকে, কিন্তু এমনভাবে করতে হবে যেন যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা আঘাত না হানে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আরেকটি বিবেচ্য হচ্ছে এ ধরনের সংঘাতের কারণে তেলের দাম ও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব পড়ার বিষয়টি। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানি অর্থনীতি ধ্বংসও করে দেয়, তবুও ইরানের কাছে যথেষ্ট সমরাস্ত্র থাকবে, যা দিয়ে পারস্য উপসাগরের বাণিজ্য পথ বন্ধ করে দেয়া যাবে। তা হলে বিশ্ব অর্থনীতি বেশ বাজে পরিস্থিতিতে পড়বে। একটি বিষয় স্পষ্ট যে, দূতাবাসে হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা আশা করেনি ইরান। ইরান যদি এমনটা আশঙ্কা করতো, জেনারেল সোলেমানি কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তিগতভাবে বাগদাদ বিমানবন্দরে থাকতেন না। ইরানকে এখন এমন এক প্রতিক্রিয়া ঠিক করতে হবে, যার পরিণতি হিসাব করা কঠিন হবে। আর বড় ধরনের সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। ইরান হয়তো নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সীমিত হামলা চালাতে পারে। ইরান যদি চুপ থাকে, তাহলে এই অঞ্চলে দেশটিকে যে সবাই সমীহ করে চলে, তা নষ্ট হয়ে যাবে। আর তখনই ট্রাম্প জুয়ায় জিতে যাবেন! আঘাত আসার আগেই আক্রমণ করে ফেলাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর।
অনেক সময় এটিই সবচেয়ে কম সহিংস পদক্ষেপ। বিশ্বে যতগুলো বড় ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয়েছে, সেগুলো এত রক্তাক্ত হতো না, যদি আরেকটু আগে শুরু হতো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রে এটি আরো প্রযোজ্য। জার্মানি যদি ১৯০৫ সালে প্রথম মরক্কো সংকট চলাকালেই ফ্রান্সের ওপর আক্রমণ করতো, তাহলে ফলাফল যেতো জার্মানির বিপক্ষে। কারণ, তখনও বৃটেন ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তি করেনি, রাশিয়াও নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু পরে যখন যুদ্ধে জড়ালো দুই পক্ষ, ফলস্বরূপ পশ্চিমা সভ্যতা প্রায় ধ্বংসের কিনারে পৌঁছে যায়। অথচ, তখনই জার্মান শাসক উইলহেমকে তার সমরবিদরা হামলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি ওই পরামর্শ অগ্রাহ্য করে শান্তি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেন। উইলহেমের জার্মানি নৈতিকভাবে উঁচু স্তরের ছিল তা নয়, কিন্তু যুদ্ধে খুব দ্রুত যদি একপক্ষ জিতে যায়, সেটি দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের চেয়ে ঢের উত্তম। ঠিক একইভাবে বলা যায়, বৃটেন ও ফ্রান্স যদি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য, অর্থাৎ হিটলারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ঠেকাতে ১৯৩৬ সালের পরপরই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করতো, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও অমন দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী হতো না। ১৯৩৬ সালে হিটলার যখন পুনরায় রাইনল্যান্ড দখলে নিলেন, তখনই প্রস্তুতি শুরু করা উচিত ছিল বৃটেন ও ফ্রান্সের। যত দেরি হয়েছে, ততই সমস্যা বেড়েছে। এ কারণেই বলা যায়, ট্রাম্প সমস্যাকে বাড়তে না দিয়ে আগেই এসপার-ওসপার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভবিষ্যতই বলে দেবে কাশেম সোলেমানিকে হত্যার পরিণতি কী বয়ে নিয়ে আনে। কিন্তু এমন সম্ভাবনা আছে যে, এটি ট্রাম্পের মাস্টারস্ট্রোক হিসেবেই প্রমাণিত হবে।
আরেকটি যুদ্ধ বহন করার সামর্থ্য নেই বিশ্বের- জাতিসংঘ মহাসচিব
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সৃষ্ট উত্তেজনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্থনিও গুতেরাঁ। তিনি বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে আরেকটি যুদ্ধ বহন করার সামর্থ্য নেই বিশ্বের। তাই তিনি সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। ওদিকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের ওই হামলার আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতিসংঘের নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ অ্যাগনেস ক্যালামার্ড। যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরাকের রাজধানী বাগদাদে বিমানবন্দরে নিহত হন ইরানের কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। এ ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইরান ভয়াবহ প্রতিশোধ নেয়ার হুমকি দিয়েছে। এর প্রেক্ষিতে শুক্রবার স্থানীয় সময় সকালে বিবৃতি দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
এদিন সকালে জাতিসংঘের ডেপুটি মুখপাত্র ফারহান হক ওই বিবৃতি ইস্যু করেন। এতে বলা হয়, জাতিসংঘ মহাসচিব অব্যাহতভাবে উত্তেজনা হ্রাসের পরামর্শ দিচ্ছেন। এটা এমন একটি সময় যখন নেতাদেরকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করতেই হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ইউএন নিউজ।
এতে আরো বলা হয়েছে, কাসেম সোলাইমানিকে বাগদাদ বিমানবন্দরের বাইরে টার্গেট করে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাকে হত্যা করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাকে হত্যার এ নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই হামলায় আরো যারা নিহত হয়েছেন তার মধ্যে রয়েছেন ইরাকের মিলিশিয়া নেতা আবু মাহদি আল মুহানদিস। আবু মাহদি আল মুহানদিসের গ্রুপ খতিব হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ আছে। এক সপ্তাহ আগে ইরাকে এক রকেট হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একজন বেসামরিক কন্ট্রাক্টর নিহত হন। এ জন্য খতিব হিজবুল্লাহকে দায়ী করা হয়।
জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার পর দেশে তিনদিনের শোক ঘোষণা করেছেন ইরানের সুপ্রিম নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার প্রতিশোধ নেয়া হবে। এমন অবস্থায় সবাইকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে শুক্রবার দুপুরে নিয়মিত ব্রিফিংয়ের সময় ফারহান হক বলেন, পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেছেন অ্যান্থনিও গুতেরাঁ। তবে কি কথা হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানান নি ফারহান হক। তিনি বলেন, ইরাক ও সেখানে জাতিসংঘের মিশনে অব্যাহতভাবে বিস্তৃত পর্যায়ে কাজ করে যাবে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে পুরো দেশে স্থিতিশীলতার পরামর্শ দেবে। এ সময়ে জাতিসংঘের পারসোনালদের মোতায়েন করার বিষয়ে রিপোর্টে কোনো পরিবর্তন নেই। জাতিসংঘ প্রধানের বার্তার জবাবে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি জেনিন হেনিস প্লেচার্ট বলেছেন, ওই অঞ্চলের নেতারা যদি বিরত না থাকেন, তাহলে এর ফল হবে বিধ্বংসী এক সহিংসতা। তিনি টুইটে লিখেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে ইরাক হলো বিভিন্ন শক্তির প্রতিযোগিতার একটি থিয়েটার। ইরাকিরা স্থিতিশীলতা ও শান্তির দাবিদার। অবশ্যই মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। ওদিকে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের এমন হামলার আন্তর্জাতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতিসংঘের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, খেয়ালখুশিমতো হত্যাকাণ্ড বিষয়ক নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ অ্যাগনেস ক্যালামার্ড। দৃঢ়তার সঙ্গে হস্তক্ষেপের জন্য তিনি জাতিসংঘকে তার আইনগত উপায় ও প্ল্যাটফরম ব্যবহারের অনুরোধ করেছেন। জাতিসংঘ ও এর নেতৃত্বের সামনে এখনই চাপ দেয়া ছাড়া আর কোনো সময় নেই।
কালীগঞ্জে গোপালপুর স্কুলে সেশন ফি না দিলে বিনা মূল্যের নতুন বই দেয়া হয়নি
কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) সংবাদদাতা ॥ বিনা মূল্যের বই নিতে দিতে হচ্ছে টাকা। সেশন ফি ও উন্নয়ন ফি‘র অজুহাতে বই উৎসবের দিনেও নতুন বইয়ের ঘ্রাণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। টাকা দিতে না পারায় বই না নিয়েই খালি হাতে ফিরতে হয়েছে তাদের। এ নিয়ে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার গোপালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের, প্রধান শিক্ষক সেশন ফি ও উন্নয়ন ফি ছাড়া দিচ্ছেন না নতুন বই। ওই টাকা জমা দিয়ে শ্রেণি শিক্ষকের কাছে স্লিপ জমা দেয়ার পর বই পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। যদিও বছরের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গোপালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইমন হোসেন জানায়, ২৫০ টাকা দিতে পারেনি বলে প্রধান শিক্ষক আমাদের বছরের নতুন বই দেয়নি। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপু শেখ জানায়, শিক্ষকদের সাথে যাদের ভালো সম্পর্ক শুধু তাদেরই বই দেয়া হয়েছে, আমাদের ২৫০ টাকা সেশন ফি ও উন্নয়ন ফি‘র টাকা জমা দিয়ে বই নিয়ে যেতে বলেছেন। ২৫০টাকার জায়গায় ২০০ টাকা দিলেও দুটি করে বই আটকে রেখেছেন প্রধান শিক্ষক- এমনটি জানালেন একাধিক শিক্ষার্থী।
গোপালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিার্থীর অভিভাবক আব্দুল আলিম বলেন, স্কুলের সামনে এসে দেখেন তার ছেলে সজিবের চোখ ছলছল করছে। ছেলে জানায় টাকা ছাড়া স্যার বই দিবে না। তিনি ¯প্রধান শিক্ষক চিত্তরঞ্জন পালকে বই না দেবার কারণ জানতে চাইলে বলেন সেশন ফি ও উন্নয়ন ফি‘র ২৫০ টাকা জমা দিয়ে বই নিয়ে যেতে হবে। একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেন, প্রতি বছর সেশন ফি ও স্কুলের উন্নয়ন ফি‘র নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২৫০ টাকা করে আদায় করছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। গোপালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চিত্তরঞ্জন পাল জানান, ‘বাৎসরিক সেশন ফি বাবদ টাকা নেয়া হচ্ছে । আর কাউকে টাকা ছাড়া বই দেয়া হয়নি সেটা আমার জানা নেই। বই বিতরণ করেছে শ্রেণি শিক্ষক, তারা এমনটি করতে পারেন।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে কালীগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মধুসূদন সাহা জানান, ‘আমি বিষয়টি জানতে পেরে ওই স্কুলের সভাপতি কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবহিত করেছি। আর এবিষয়ে কেউ যদি আমাকে লিখিত অভিযোগ দেয় তাহলে আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’ এ ব্যাপারে ওই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সূবর্ণা রানী সাহা জানান, ‘বই উৎসবের দিন এই অভিযোগটি আমার কানে আসার পর আমি মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছি বিষয়টি দেখার জন্য। পরবর্তীতে আমি প্রধান শিক্ষককে ডেকে বলি যে, আমি স্কুলের সভাপতি আমাকে না জানিযে কেনো এমনটি করলেন, সেশন ফি নেবার বৈধতা থাকলেও পরে নিতে পারতেন। আপনার এটা করা ঠিক হয়নি।’









